মুহাম্মদ নুরুদ্দীন,টিডিএন বাংলা: মাওলানা শরীয়ত উল্লাহ মৃত্যুবরণ করলে তার সুযোগ্য পুত্র মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদ (১৮১৯-১৮৬২) আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শরীয়ত উল্লাহর আন্দোলন শেষের দিকে ইংরেজ ও জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে সরব হলেও মূলত ধর্মীয় সংস্কার ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু পুত্র মহসীন উদ্দীন আহমেদ পিতার দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর বুঝলেন চাষীদের উপর ইংরেজদের অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি দেখলেন বাংলার জমিদাররাও ইংরেজদের মোসাহেবি করতে ব্যস্ত। চাষিদের রক্ষা করার পরিবর্তে বেশি খাজনা আদায় করতে তারাও গরীব মানুষের উপর সমান অত্যাচার চালাচ্ছে। মহসীন উদ্দীন আহমেদ অত্যাচারী জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে হিন্দু- মুসলমান প্রজাদের ঐক্যবদ্ধ করতে লাগলেন। তিনি মুসলিম প্রজাদের বোঝালেন অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের নির্দেশ। সুতরাং নীলকুঠি আর জমিদারদের অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্ত করা একান্ত কর্তব্য। ইংরেজরা এই আন্দোলনকে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার রঙ দিতে চেয়েছিল কিন্তু অত্যন্ত সুকৌশলে মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের গরিব মানুষকে একত্রিত করতে সক্ষম হন।
মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদ ইংরেজদের অত্যাচার অবিচার থেকে বাংলার গরিব মানুষদের রক্ষা করার জন্য মজবুত সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি মুসলিমদের যাকাত ফিতরা ও দানের টাকায় বায়তুলমাল বা সাধারন কোষাগার গড়ে তোলেন। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সব মানুষের বিপদে আপদে এই অর্থ ব্যয় করা হতো এর ফলে এই আন্দোলন দ্রুত গরিব মানুষদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
মাওলানা পৃথক বিচার ব্যবস্থা শুরু করেন। তিনি ইংরেজদের আদালতে বিচার প্রার্থী না হয়ে স্বদেশী আদালতে বিচার প্রার্থী হওয়ার আবেদন জানান। এভাবে তিনি ইংরেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক বিকল্প চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলেন।
মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ইংরেজ নীলকর ও জমিদারদের যোগসাজশে মুসলমানদের উপর ধর্মীয় কর চাপানো হল। মুসলমানরা গরু কুরবানী করতে পারবে না। আর দাড়ি রাখলে তাদেরকে অতিরিক্ত কর দিতে হবে। এই অত্যাচারের প্রতিবাদে ফরিদপুরের জমিদারের বিরুদ্ধে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবীরা গর্জে ওঠেন।
ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে লিখেছেন প্রাথমিকভাবে সফল না হলেও এই কৃষক আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। কৃষক ঐক্যে ভাঙন ধরছে বুঝতে পেরেই কাশিমপুরের নীলকুঠি প্রধান ডানলপ সাহেব মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদ এর বাড়ি আক্রমণ করে চারজন প্রহরীকে হত্যা করে লুটপাট চালায়। মাওলানা এর প্রতিশোধ নিতে ১৮৪৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ডানলপ সাহেবের কুঠি আক্রমণ করে।
আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ঘটনায় মাওলানা মহসীন উদ্দীন আহমেদ বুঝতে পারেন ইংরেজরা ভারতীয় সৈন্যদের দিয়েই ভারতীয়দের দমন করছে। সৈন্যদেরকে সজাগ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে না পারলে স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব নয়। মাওলানা মহসীন উদ্দীন সারা ভারতে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাংলার কৃষকদের এই আন্দোলন ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পট তৈরি করেছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। বিপদ বুঝতে পেরে ইংরেজরা ১৮৪৭ সালে তাকে গ্রেফতার করে। ১৮৬২ সালের ২৪ অক্টোবর ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে তার মৃত্যু হয়