সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে ভয়ঙ্কর বর্বরতার আস্ফালন

মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: আজ ২৬ শে জানুয়ারি। আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র দিবস। ইংরেজিতে যাকে আমরা রিপাবলিক ডে বলে জানি। রিপাবলিক ডে অর্থাৎ সাধারণের দিন কীভাবে প্রজাতন্ত্র দিবসে পরিণত হল তা নিয়ে বিতর্ক তো আছেই। কিন্তু ১৯২৯ সালে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যখন আংশিক স্বাধীনতার পরিবর্তে পূর্ণ স্বরাজের দাবি উত্থাপন করেন তখন কংগ্রেসের সভাপতি জওহরলাল নেহেরু সেই দাবির প্রতি সমর্থন জানান। উৎসাহিত কর্মীরা রাভি নদীর তীরে পতাকা উত্তোলন করে। স্বাধীনতার পতাকা। এই দিনকে রিপাবলিক ডে হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ এটা ভারতের মুক্তির সূচনা। মুক্ত-স্বাধীন সার্বভৌম দেশের গোড়াপত্তন। তাই ভারতবাসীর কাছে প্রজাতন্ত্র দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীনতার অর্থ কী বুঝেছিলেন? সেটা কী শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল? তা কি ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির আহ্বান? না তা নয়। নেতাজি বুঝতেন স্বাধীনতা মানে ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি, অশিক্ষা কুসংস্কার থেকে মুক্তি, রাজনৈতিক পরাধিনতা থেকে মুক্তি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবস শর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।

কিন্তু আজ ৭২ তম প্রজাতন্ত্র দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে অবলোকন করতে হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর বর্বরতার চিত্র। গোটা দেশকে স্বাধীনতার পরিবর্তে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সংকীর্ণতা কুসংস্কার এবং অজ্ঞতার অতল তলে তলিয়ে যেতে আমরা দেখছি। আমরা দেখেছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যায় উন্নত হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সাধারণ মানুষ অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাই কেমিস্ট্রি বিদ্য়ায় ডক্টরেট ডিগ্রিধারী অধ্যাপক ও তার স্ত্রী গণিতশাস্ত্রে মাস্টার ডিগ্রী করা সত্ত্বেও যখন তাদের দুই উচ্চশিক্ষিতা কন্যাকে তান্ত্রিক বিশ্বাসে হত্যা করেন তখন চমকে উঠতে হয়। রবিবার রাতে অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলার শিবনগর গ্রামের ভয়ংকর ঘটনা আমাদেরকে অবলোকন করতে হয়। উচ্চশিক্ষিতা স্বামী-স্ত্রী মিলে তাদের কন্যা, ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস অফিসার
আলেক্ষা ( ২৭) এবং সংগীতশিল্পে পারদর্শী দিব্যা (২২) কে হত্যা করে। তাদের বিশ্বাস এই হত্যাকাণ্ড তাদের কন্যাদেরকে নবজীবন দান করবে। তাই তারা পুলিশ প্রশাসনকে হুমকি দিয়ে কাছে আসতে দিতে চায় না। ধর্মের নামে কুসংস্কার কতটা গ্রাস করলে তবে এ ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে পারে?

এর কদিন আগে কলকাতায় মহিলা অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত খাবারের কোন ধর্ম হয় না মন্তব্য করায় তাকে নিয়ে যে খিস্তিখেউড় শুরু হয়েছে তাও এক অন্ধ জগতের ছবি তুলে ধরে। দেবলিনা বলেছিলেন আমি নিরামিষাশী কিন্তু আমি পাঠাও রান্না করতে পারি বিফ রান্না করতে পারি ।যার যা পছন্দ সেটা সে খেতে পারে। খাবারের কোন ধর্ম হয় না। এই কথাতেই খেপে গিয়েছে বাংলার  কিছু গোবৎস। তারা দেবলীনাকে প্রাণের হুমকি দিয়েছেন বরং তার থেকে আরো বড় আক্রমণ করে হুমকি দেয়া হয়েছে গণধর্ষণের। ধর্মীয় উন্মাদনা সংকীর্ণতা ও বর্বরতা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষের রুচি এতো নিচে নামতে পারে তা ভাবতে অবাক লাগে। যে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা নিতে কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে নেতাজি স্মরণ অনুষ্ঠান করা হয়েছিল সেখানে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দেওয়া এবং মমতা ব্যানার্জির প্রতিবাদ নিয়ে বিতর্ক বিক্ষোভ চলছেই। কোন ধর্ম নিরপেক্ষ সরকারের সরকারি অনুষ্ঠানে এভাবে একটি রাজনৈতিক স্লোগানকে ব্যবহার করা যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। কিন্তু যে সুস্থ সংস্কৃতি, যে সৌজন্যবোধের পরিবেশ একটা সমাজকে উন্নত সভ্যতার দিকে নিয়ে যেতে পারে তার থেকে আমরা দিনের-পর-দিন অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। রবীন্দ্র নেতাজী স্বাধীনতার যে অর্থ বুঝেছিলেন তা বুঝতে মনে হয় আমরা ব্যর্থ হয়েছি ।তাই আজ আমরা ধীরে ধীরে পরাধীনতার করাল গ্রাসে আক্রান্ত হচ্ছি ।সাধারণতন্ত্র দিবসে আমরা শুনব অনেক কুচকাওয়াজের ধবনী। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ। শুভেচ্ছা জানাবো একে অপরকে। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র দিবসে যে লক্ষ লক্ষ কৃষক তাদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাছে প্রজাতন্ত্র দিবসের কী অর্থ থাকতে পারে? একটা স্বাধীন দেশে তাদেরকে কর্পোরেট সংস্থার হাতে বন্দি করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে অন্নদাতা কৃষকরা। তারা আর কিছু চায়না স্বাধীন স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বাঁচতে চায় মাত্র। একটি স্বাধীন দেশ কি প্রজাদের এতোটুকু স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না? প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্ন চিহ্ন দগদগে ঘা হয়ে থাকবে।