মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে সারা দেশজুড়ে আকস্মিকভাবে ঘোষণা করা হয় লকডাউন। যার ফল জনজীবনে যে কীভাবে পোহাতে হচ্ছে তা বাস্তবে টের পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে যে সকল নাগরিকরা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা ব্যক্তিগত কোনো কাজে গিয়ে আটকে পড়েছেন তাদের এখন নাভিশ্বাস অবস্থা।
নদীয়া জেলার আরংঘাটার হসেনপুর গ্রামের গোলাম সারওয়ার বিশ্বাস ও তার স্ত্রী আশানুর বেগম বর্তমানে এই সংকটে জর্জরিত। গোলাম সরোয়ার বিশ্বাস ভারতীয় রেলের এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তার আত্মীয়-স্বজন থাকেন বাংলাদেশ। স্ত্রী আশানুর বেগম অসুস্থ বোনকে দেখার জন্য বাংলাদেশ যায়। ফেরার আগেই লকডাউন। আজ নয়, কাল নয়, এ সপ্তাহ নয় তো আর আগামী সপ্তাহ, এ মাস নয়তো আগামী মাস, খুলি খুলি করে বর্ডার আর খোলে না।
গোলাম সারওয়ার সব মহলে যোগাযোগ করে চলেছেন। ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। তাদের কাছে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে আবেদন করেছেন। কোন সুরাহা হয়নি। অবশেষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হস্তক্ষেপ চেয়েও আবেদন করেছেন যাতে তার স্ত্রীকে তিনি দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। আবেদনের পর আবেদন ফাইলবন্দি হয়ে থাকে। আর নিয়মের যাঁতাকলে এদিক থেকে ওদিকে, আর ওদিক থেকে এদিকে ঠেলে দেওয়া চলতে থাকে।
গোলাম সারওয়ার জানান, তিনি শুধু একা নন, এরকম অনেক পরিবার বাংলাদেশে গিয়ে আটকে পড়েছেন। অনেকে আবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন। যারা গরিব মানুষ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দিনের পর দিন পড়ে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে তারা মুখ রক্ষার খাতিরে আত্মীয়র বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। নিরুপায় হয়ে বর্ডার এর আশপাশে ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মালদা জেলার ইংলিশ বাজারের ব্যাঙ্ক ম্যানেজার জাকির হোসেন আটকে পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট অঞ্চলে। কেন্দ্রীয় সরকার বন্দে ভারত মিশন এর মাধ্যমে বিদেশে আটকে পড়া ভারতীয়দেরকে দেশে আনার ব্যবস্থা করে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্যের নাগরিকরা সে সুযোগে উপকৃত হতে পারলেও বাংলা সব বিষয়ের মতো এখানেও বঞ্চিত থাকে। কেন্দ্র দোষারোপ করে রাজ্য সরকারের দিকে আর রাজ্য সরকারের দায় এটা কেন্দ্রের বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া। তৎপরতার অভাবে আজ ভুগতে হচ্ছে শতশত বাঙালীকে।
একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মেহেদিপুর বর্ডার থেকে লকডাউনের আগে প্রায় ৫০০ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ প্রবেশ করে। লকডাউনের ফলে তাদের কেউ ফিরতে পারেনি। গোলাম সারোয়ারের মুখে ফুটে ওঠে এক অসহায়ের আর্তি। তিনি জানান, তার স্ত্রী যথেষ্ট অসুস্থ। মৃগীরোগী। নিয়মিত তাকে কয়েকটি ওষুধ খেতে হয়। যে ওষুধগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। তার ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। এই অবস্থায় যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের বিপদ হতে পারে। স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই। কিন্তু কী করবেন তিনি? কোথায় যাবেন এখন এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। পরিকল্পনাহীন লকডাউনের জন্য দেশের মানুষ কেন বিদেশে আটকে থাকবে? জবাব কিন্তু মিলছে না।