মুহাম্মদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত অপরাধী গ্যাংস্টার বিকাশ দুবে কে এনকাউন্টারে হত্যা করার পর গোটা দেশজুড়ে নানান আলোচনা শুরু হয়েছে। এই এনকাউন্টার সত্য কিনা, এরমধ্যে কতটা পরিকল্পিত ছক আছে, এনকাউন্টার এর পেছনে অন্য কোনো লক্ষ্য আছে কিনা, রাজনৈতিক নেতা বা আরো অনেক বড় ব্যক্তিত্বের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কে আড়াল করার চেষ্টা কিনা এরূপ অসংখ্য কথা আলোচনা হচ্ছে। প্রতিটি আলোচনার পিছনে যুক্তি আছে, আছে বাস্তবতাও। আসলে দু’একটি ঘটনা আমাদেরকে নাড়া দিয়ে যায় ঠিকই আমরা তখন মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসি। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কলম ঘষে ঘষে লিখতে শুরু করেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তুলকালাম তর্ক-বিতর্ক চলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সমস্যার মূল অনেক গভীরে। সমুদ্রের গভীরে থাকা ডুবন্ত হিমবাহের মতো মাঝে মাঝে যখন একটু মাথা উঁচু করে আমরা তখন তা দেখতে পাই। আর তা নিয়ে ভাবতে বসি। বাকি সময়টা আবার যেমন চলছে তেমন চলতে থাকে। আমাদের দেশে কিছু পুলিশ-অপরাধী-রাজনৈতিক নেতার অশুভ বন্ধন খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ভারতের প্রতিটি রাজ্যে এ চিত্র প্রায় এক রকম। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোথাও মাত্রা একটু বেশি কোথাও একটু কম। প্রশ্ন উঠতে পারে এখানে আবার নেতার কথা আসছে কেন?
হঠাৎ পাড়ায় পুলিশ এসে কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে বিচলিত মানুষ প্রথম কোথায় ছোটে ? এক কথায় উত্তর- পাড়ার নেতার কাছে। নেতার কাছে কেন? কেন অন্য কোথাও নয়? হওয়া তো উচিত ছিল প্রথম পুলিশের কাছ থেকে জানতে চাওয়া যে তার অপরাধ কী? আর তারপর আইনের দ্বারস্থ হয়ে যা করণীয় তা করার ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের অভিমুখ অন্যদিকে। তারা প্রথমে ছোটে নেতার কাছে।
নেতাদেরকেও ‘যথার্থ'(?) নেতা হয়ে উঠতে গেলে এক হাতে রাখতে হয় পুলিশ আর একহাতে রাখতে হয় গুন্ডা। পুলিশ আর গুন্ডার মেলবন্ধন না হলে নাকি নেতা হওয়া যায় না! যুবকদের দিয়ে অপরাধ করানো,পুলিসকে দিয়ে গ্রেপ্তার করানো আবার ত্রাতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হওয়া রাজনীতির কৌশল। আমরা দৈনন্দিন জীবনে অহরহ তা টেরও পাই।
দিনরাত রাহাজানি করে ঘুরে বেড়ানো অনেক অপরাধীকে পুলিশ ধরতেই পারে না। অথচ এনআরসি, এনপিআর, সিএএ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন হওয়ার পর থেকে লাগাতার গ্রেপ্তার করা হচ্ছে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক কর্মীদের। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার সমালোচনা করলেই অপরাধী। নানান মিথ্যা মামলায় তার নাম জুড়ে দেওয়া হয়। আজ কারাগারের কক্ষে নির্মমতার শিকার মানবদরদী ডাক্তার কাফিল খান, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, যুব নেতা সার্জিল উসমানী। এছাড়া মানবাধিকার কর্মী গৌতম নাভলাখা, অধ্যাপক সোমা সেন, দলিত লেখক আনন্দ টেলটুম্বে, আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজও জেলে। তাদের অপরাধ কী? তারা সরকারের ঘোষিত নীতির সমালোচনা করেছে মাত্র। সরকারের সমালোচনা করলেই যদি জেলে যেতে হয় তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ কী দাঁড়ায়? মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোথায়? আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কোথায়? আর মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এইসব বিষয়গুলি বাদ দিলে জঙ্গল রাজ এর সাথে বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তফাৎ থাকে কোথায়?
পুলিশ নেতা ক্রিমিনাল যোগের কথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। নেতার ছেলে ধর্ষণ করে খুন করলেও তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে ভয় পায়! পাছে তার চাকরি নিয়ে না টানাটানি শুরু হয়। অপরদিকে মাফিয়া জগতের গ্যাংস্টাররা রীতিমত রাজত্ব খুলে বসে থাকে। বিকাশের মতো ব্যক্তিরা একদিনে এই জায়গায় পৌঁছায় নি, ৪,৫ বিঘা জমির মালিক ছাপোষা কৃষকের সন্তান শত শত কোটি টাকার মালিক এমনিতে হয়ে যায় না। আর এটা তার একার পক্ষে করা সম্ভবও নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে আরো অনেকেই। সেই অনেককেই আড়াল করতেই হয়তো তাকে এনকাউন্টার এর নামে খতম করতে হয়েছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৮ এর মধ্যে ৮৩৫ টি বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু ঘটেছে। যদিও বাস্তব রিপোর্ট তার থেকে অনেক বেশি। হিউম্যান রাইটস কমিশন এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই সময় ১৬৩৬টি বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু ঘটেছে।
এনকাউন্টারের নামে খতম করা আধুনিক কৌশলে পরিণত হয়েছে। ২০০৪ সালের ইশরাত জাহান হত্যা মামলা থেকে শুরু করে ২০০৫ এর সোহরাব উদ্দিন হত্যা,২০০৬ তুলশীরাম প্রজাপতি ও রাম নারায়ন গুপ্তকে হত্যা, ২০০৮ এ বাটলা হাউস এনকাউন্টার, ২৯১৫ তে ৫ সিমি সদস্যকে গুলি করে হত্যা, ২০১৮তে বিবেক তেওয়ারিকে হত্যা এবং ২০১৯ এর তেলেঙ্গানা এনকাউন্টার। প্রতিটি ঘটনার পিছনে অসংখ্য প্রশ্ন থেকে গেছে। তারপরও একই ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। আসলে পুলিশ এবং প্রশাসনের লক্ষ্য যদি মূল অপরাধীদের খুঁজে বের করা হতো তাহলে হাতে পাওয়া অপরাধীদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা তারা আপ্রানভাবে করতেন। কেননা, অপরাধের চাঁই খুঁজতে গেলে তার শাকরেদদের দরকার। এরা তখন গুরুত্বপূর্ণ সোর্স। এই সোর্স কোন ভাবে হাতছাড়া হয়ে গেলে বা নিহত হলে বা মারা গেলে তদন্ত অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। প্রকৃত সত্যে পৌঁছানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা দেখছি এখানে হাতে পাওয়া অপরাধীদেরকে নিকেশ করে ফেলার কৌশল। তাদেরকে জীবিত বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা যতটা লক্ষ্য করা না যায়, তার থেকে বেশি বিভিন্ন বাহানায় তাদেরকে নিকেশ করার চেষ্টা করা হয়।
এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো মজবুত ভাবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোন রাস্তা নেই। গণতন্ত্রের অনিবার্য শর্ত শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে হবে। এই তিনটি বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে হবে যথাযথ স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে।
আমাদের দেশে দিনের পর দিন এই তিন বিভাগের স্বাতন্ত্র মুছে যেতে বসেছে। এটাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। আমেরিকায় একজন পুলিশ কর্মী সেদেশের সর্বাধিনায়ক প্রেসিডেন্টের মুখের উপরে কথা বলতে পারেন। তাকে বলতে পারেন, ঠিক করে কথা বলতে পারলে বলুন নইলে চুপ করে যান। কিন্তু আমাদের দেশের কোন পুলিশের কী এ সাহস হবে যে কোন চুনো পুঁটি নেতার বিরুদ্ধে তারা কথা বলবেন? না তা বলতে পারেন না। এটাই হচ্ছে দেশের সংকট!
(লেখক প্রবীন সাংবাদিক,বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা)