মুহাম্মদ নুরুদ্দীন,টিডিএন বাংলা: পলাশী ও বক্সারের পরাজয় ইংরেজদের জন্য ভারতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। হায়দার আলী ও টিপু সুলতান সর্বশক্তি দিয়েও ইংরেজদের বিজয় রথকে প্রতিহত করতে পারেননি। এই সময় ভারতের মুসলিমদের মধ্যে প্রবল আত্মপর্যালোচনা হতে থাকে। ইংরেজদের হাতে তাদের একের পর এক পরাজয়ের কারন বিশ্লেষণ হতে থাকে। মুসলিম ঊলামা সমাজ দায়ী করতে থাকেন মুসলিম সুলতানদের বিলাসবহুল জীবন যাত্রাকে। রাজকার্য পরিচালনা করার সময় সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মুসলিম শাসকরা শেষদিকে সচেতনতা হারিয়ে ফেলে। জনগণের নৈতিক বাঁধন ঢিলে হয়ে যায়। কুসংস্কার ও রসম রেওয়াজের ফাঁদে আটকে পড়ে তারাও।
এই আত্ম দংশনের যন্ত্রণা থেকে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে একদল সংস্কারবাদী বিপ্লবী। এই বিপ্লবীদের সামনের সারিতে ছিলেন আহমদ শহীদ বেরলভী। টিপু সুলতান যখন “শীর দেগা নেহি দেগা আমামা” অর্থাৎ “প্রাণ দিয়ে দেবো তবু আত্মসমর্পণ করব না” বলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রাম করছেন আহমদ শহীদ তখন ১৩ বছরের তরুণ। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ শে নভেম্বর তার জন্ম। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী চার বছর বয়সে তিনি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তার তেমন আগ্রহ ছিল না। আহমদ শহীদ তৎকালীন ভারতের শ্রেষ্ঠ আলেম দিল্লির হযরত শাহ অলিউল্লাহর ছাত্র ছিলেন। তিনি শিক্ষকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইংরেজ বিতাড়নের পাশাপাশি ভারতের সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি নিয়মিত শরীর চর্চা, সাঁতার কাটা ও অস্ত্র চালনার অভ্যাস করেন। সমাজ সংস্কারে তাঁর এমন আগ্রহ ছিল যে তরুণ বয়সেই তিনি বিভিন্ন গ্রামে সফর করতেন। মানুষদেরকে একত্রে জড়ো করে তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিতেন। এলাকায় এলাকায় বিবাদ মিমাংসা করার জন্য তার ডাক পড়তে লাগলো। ২৪ বছর বয়সে তিনি আমির খান পিণ্ডারির সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ করেন ও সৈনিকের প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীকালে আমির খান ইংরেজদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করলে সৈয়দ আহমদ ওই বাহিনী ত্যাগ করে চলে আসেন।
সৈয়দ আহমদ প্রথম দিকে প্রচারকার্যে মনসংযোগ করেন। ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদী’ নাম দিয়ে তিনি মানুষদেরকে শপথ গ্রহণ করার আহ্বান জানান। তিনি একটি সুশৃংখল মজবুত সংগঠন গড়ে তোলেন। অনেকে বলেন ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি বিকল্প সরকারও গঠন করেছিলেন। সেই সময়ে তরিকায়ে মুহাম্মাদীর সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের মন্ত্র সকলকে মুগ্ধ করেছিল। সৈয়দ আহমদ প্রচলিত ধ্যান ধারণার বিপরীতে চলতে পছন্দ করতেন। তখন হজ যাত্রা করা খুব ঝুঁকির কাজ বলে মনে করা হতো। অথচ সৈয়দ আহমদ পরিবারের সদস্যসহ বিপুল শিশ্য বাহিনী নিয়ে হজযাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হজের উদ্দেশ্যে ১৮২১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে কলকাতায় আসেন। এখানে নির্বাসিত টিপু সুলতানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর ১০ টি জাহাজ ভাড়া করে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হন। হজের সময় তিনি সৌদি আরবে সংঘটিত আব্দুল ওহাব নজদীর আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হন। সেখানে বাংলার বিপ্লবী হাজী শরীয়তউল্লাহ ও মীর নিসার আলীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
১৮২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ই জানুয়ারি সৈয়দ আহমদ হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে তিনি তাঁর প্রিয় গ্রাম আত্মীয় স্বজন ও পরিবার পরিজনদের ছেড়ে বিভিন্ন দেশ পরিক্রমা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে তিন হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে পাহাড় পর্বত মরুভূমি ভেদ করে তিনি পেশোয়ার হয়ে চর সদ্দ নামক জায়গায় পৌছান। সীমান্ত প্রদেশে তিনি একটি কুসংস্কারমুক্ত স্বাধীন শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। ইতিমধ্যেই চতুর ইংরেজরা সৈয়দ আহমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে।
তারা শিখ ও মারাঠাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে মুসলমানদের শক্তিশালী হতে দিলে তারা আবার মারাঠা ও শিখদের উপর হামলা করবে। অপরদিকে ইংরেজরা সৈয়দ আহমদ ও তার বাহিনীকে লুটেরা ও দস্যু দল বলে প্রচার চালায়।
ইংরেজদের উৎখাত করার জন্য যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অচিরেই তা ভারতীয়দের আভ্যন্তরীণ ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে পরিণত হয়। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আহমদ যখন দীর্ঘ সফরের পর তার মুষ্টিমেয় সাথী নিয়ে বালাকোট নামক ময়দানে অবস্থান করছিলেন সেই সময় শিখদের একটি সুসজ্জিত দল শের সিং এর নেতৃত্বে বালাকোটের দিকে রওনা হন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ৬মে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত যুদ্ধে আহমদ শহীদ বেরলভী নিহত হন ও তার সঙ্গী সাথীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
সৈয়দ আহমদ বেরলভী সম্পর্কে ঐতিহাসিক রতন লাহীড়ী তাঁর “ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস” গ্রন্থে লিখেছেন,
“যার জীবনস্মৃতি প্রেরণা যুগিয়েছিল যুগে যুগে এই দেশের মহা বিপ্লবীদের, যার পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আওতার বাইরে থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে আক্রমণ করা, স্বাধীন সরকার গঠন করা, আবার সেই সঙ্গে দেশের মধ্যে থেকেও সাম্রাজ্যবাদকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করা, পথ দেখিয়েছিল পরবর্তীকালে মহেন্দ্র প্রতাপ, বরকতউল্লাহ, এম এন রায়, রাসবিহারী বসু , এমনকি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেও। কে এই মহাবিপ্লবী? যার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছিল? ১৮৫৭ সালের মহা বিদ্রোহে বরণ করেছিল দ্বীপান্তর, সশ্রম কারাদণ্ড, কঠোর যন্ত্রণাময় মৃত্যুকে। কে তিনি?
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর তার দালালদের লেখা ইতিহাসে তাঁর নাম উল্লেখ থাকলেও তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু লেখা থাকা স্বাভাবিক নয়। আর আজ স্কুল কলেজে যে ইতিহাস পড়ানো হয় সেসব ওই সাম্রাজ্যবাদীদের প্রাচীন ইতিহাসের আধুনিক সংস্করণ মাত্র। তাই কী করে তারা জানবে এই মহাপুরুষের নাম? এই মহান বিপ্লবীর নাম হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ বেরলভী।