টিডিএন বাংলা: বেশ কয়েক বছর থেকে বঙ্গ রাজনীতিতে একটি ‘দুর্বোধ্য’ শব্দের প্রচলন হয়েছে আর সেটা হচ্ছে-তোষণ। এর সঙ্গে মুসলিম জুড়ে দিয়ে বলা হচ্ছে মুসলিম তোষণ। কিন্তু মুসলিম তোষণ কিভাবে হচ্ছে, এতো তোষণের পরেও কেন মুসলিমরা শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কর্মস্থান থেকে বঞ্চিত, সেই প্রশ্ন কেউ করে না। প্রায় সব রাজনৈতিক দল স্বীকার করেন, ভারতবর্ষ সহ পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা বঞ্চিত। সাচার কমিটি, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের মতো সরকারি রিপোর্টেও সেই বঞ্চনার ছবি উঠে এসেছে। একাধিক সংস্থার সমীক্ষা বলছে, মুসলিমদের উন্নয়ন হয়নি। তাহলে কে কাকে কিভাবে তোষণ করছে? শুধুই কি ইফতারে বা মুসলিমদের অনুষ্ঠানে মুনাজাত, মাথায় ওড়না বা টুপি পরা তোষণ? এই তোষণে কি কোনও জাতির আর্থিক প্রবৃদ্ধি হয়? নাকি ভোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় মেরুকরণের রাজনীতি আরও দৃঢ় করতেই মুসলিম তোষণের মিথ্যা গল্প বলা হয়? সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরেই সংখ্যালঘু বঞ্চনা নিয়ে আন্দোলন করছেন। তিনি জানান,’রাজ্যেতো হিন্দু তোষণের প্রতিযোগিতা চলছে। সরকারি তহবিল থেকে ৩৭ হাজার পুজো কমিটিকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান থেকে শুরু করে দীঘায় দেশের সবথেকে বড় জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা, পুরোহিত ভাতা সব কিছুই তো চলছে।’
আসলে এই তোষণের গল্পটা এত দুর্বোধ্য যে,বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে ধরা দেয়। এদেশে জনসংখ্যা অনুপাতে চাকরির পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় মুসলিম ও দলিতরা কী অবস্থায় আছে। এই রাজনৈতিক তোষণ নিয়ে আজকাল পত্রিকায় সম্পাদকীয় পাতায় একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে লেখক লিখেছেন,’কেউ যদি আমাকে বলে, তুমি গোটা কয় দুর্বোধ্য শব্দের তালিকা তৈরি করো; তা করতে হলে, কোন শব্দটিকে এক নম্বরে রাখবে? জবাব দেবে এই বলে যে, শব্দটি হল ‘তোষণ’। সংসারে যতগুলি গোলমেলে শব্দ আছে, তার মধ্যে এটি আজকের দিনে সবচেয়ে গোলমেলে এবং প্রহেলিকাময় হয়ে উঠেছে বিজেপি নামের রাজনৈতিক দলটির সৌজন্যে। ওই দলের বড় নেতারাও ‘তোষণ’ শব্দটির আগে ‘মুসলমান’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে একটি ক্ষুরধার রাজনৈতিক পরিভাষা তৈরি করে নিয়ে যত্রতত্র আউড়ে বেড়ায়। ‘তোষণ’ মানে তুষ্ট করা। যেমন সংসদ বাংলা অভিধান ঘাঁটলে দেখা যাবে ওই অভিধানে ‘তোষণ’ শব্দটির অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ শব্দটি ওই অভিধানে নেই। তবে শব্দটির একটি বিশেষণ দেওয়া হয়েছে, আর তা হচ্ছে ‘তোষিত’। এবং ‘তোষিত’ শব্দটির অর্থ দেওয়া হয়েছে— ‘তুষ্ট করা হয়েছে এমন’।‌’
বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রচার করেন,বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম তোষণ করছেন। দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিনহা সহ অনেকেই এই অভিযোগ করেন। কিন্তু ২০ আগস্ট ২০২০ বিজেপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা শিক্ষায়-চেতনায় পিছিয়ে, তাই তাঁদের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতাও বেশি। ‘ তিনি জানান,মুসলিমদের শুধু ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের কোনও উন্নয়ন করা হয়নি।
ওইদিন ফেসবুক লাইভে তিনি স্পষ্টতই বলেন, ‘বাংলায় সিপিএম ও তৃণমূল ৪৪ বছর ধরে শুধুই মুসলিমদের তোষণ করে চলেছে, তা সত্বেও মুসলিমরা এত পিছিয়ে রয়েছে!’ কেন মুসলিমদের এত বছরেও কোনও উন্নতি হল না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মমতা বা বাম আমলে মুসলিম তোষণ হলে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উন্নয়ন হয়নি বলে দিলীপ ঘোষ নিজেই মানছেন। তাহলে এটা আবার কী তোষণ যেখানে মুসলিমরা বঞ্চিত থাকে? নাকি পুরোটা লোক দেখানো রাজনীতি? একটা সংখ্যালঘু,বঞ্চিত সমাজকে নিয়ে এই মিথ্যা রাজনৈতিক লড়াই না করে উন্নয়ন করলেই ভালো হত। কিন্তু কা কস‍্য পরিবেদনা।
এ প্রসঙ্গে জমিয়তে আহলে হাদিসের রাজ্য সম্পাদক আলমগীর সরদার বলেন,’বিজেপির উত্থানের মূলে ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংস। ধ্বংসের মধ্য দিয়েই তাদের উত্থান। আর হিন্দু- মুসলিম বিভেদ তৈরি করাই বিজেপির মূল এজেন্ডা, আর তাতেই তারা সফল। আজও তারা মূল এজেন্ডা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি,এটা অত্যান্ত দুঃখজনক। তবে তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। তবে এটা সত্য যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিমদের নিয়ে যত ঢাক ঢোল পিটিয়েছেন, পরিসংখ্যান তার বিপরীত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে ক্ষমতা দখলের সময় সাচার কমিটির রিপোর্ট যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। মুসলিমরা যথেষ্ট আশা রেখেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে, তবে মুসলিমরা হতাশ। বরঞ্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযের মুসলিম তোষণ নয়, সরকারের কিছু ভুল নীতির কারণে বিজেপির উত্থান ঘটেছে।’