মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: ”আমার আর কোন সম্বল নেই আমি তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করি যে আমার ফসল টা নষ্ট করবেন না। কিন্তু তারা আমার ফসল নষ্ট করে দিল। গতবছর ও এমনি করে তারা আমার সব ফসল নষ্ট করে দিয়েছিল। আমি দেনার দায়ে জর্জরিত। আমার ছয় সন্তান। তাদেরকে আমি কী খাওয়াবো? মধ্যপ্রদেশের গুনা জেলার হাসপাতালে শুয়ে ক্ষতবিক্ষত রাজকুমার এই কথাগুলি বললেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিককে। চৌদ্দই জুলাই তার উপর পুলিশের বর্বর হামলার পরিণতিতে আহত হয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। ক্ষেতের সোয়াবিন চোখের সামনে নষ্ট করতে দেখে ধৈর্য ধরতে পারেনি রাজকুমার ও তার স্ত্রী। তারা কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। পুলিশ যখন জানতে পেরে তাদেরকে লাঠিপেটা করতে করতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখন রাজকুমারের ভাই শিশুপাল তাদেরকে বাধা দেয়। তার উপর ও তাদের মা গীতা দেবীর উপরেও পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছয় জন পুলিশকে সাসপেন্ড করেছে মধ্যপ্রদেশ সরকার এবং ডিস্ট্রিক কালেক্টর ও সুপারকে বদলি করা হয়েছে।
পিতামাতাকে অচৈতন্য অবস্থায় যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন ক্রন্দনরত তাদের ছয় সন্তানের ভিডিও দৃশ্য ভাইরাল হয় গোটা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাজকুমারদের জমির এক কোনে ছিল তাদের ছোট্ট বাড়ি। এই জমিতে সয়াবিন চাষ করে তাদের দিন চলত। গাপ্পু পারি নামে স্থানীয় এক নেতার কাছ থেকে তারা লিজ নিয়েছিল এই জমি। লক্ষাধিক টাকা ধার দেনা করে তারা সেই জমিতে সয়াবিন চাষ করেছিল। এই ফসল ঘরে তুলতে না পারলে দেনার দায়ে তাদের সর্বস্বান্ত হতে হত। তাই চোখের সামনে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হতে দেখে তারা আর সহ্য করতে পারেনি।
পুলিসের উচিত ছিল স্রব প্রথম কিট নাশকে অজ্ঞ্যান হয়ে পড়া দুই ব্যাক্তিকে দ্রুত চিকিতসার ব্যবস্তা করা। এ দেশে দলিতদের এতটুকু আআশা করা টাও যে পাপ । তাই তাদেরকে পা ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে শুরু করে পুলিশ। অন্য ভাইয়েরা একটু ভাল ভাবে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবী করলে তাদের উপরও পড়ে পুলিসের নির্মম লাঠি।
পুলিশের এই নির্মম নির্যাতন এর প্রতিবাদ করেছে অনেকেই । কংগ্রেস সংসদীয় দল ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল সরেজমিনে দেখে এসেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে যে পুলিশ অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করেছে।
একটি অসহায় পরিবারের উপর এই নির্যাতন যতটা হৃদয়বিদারক তার পেছনের ইতিহাস তার থেকে কম হৃদয়বিদারক নয়। রাজকুমার এই জমি জবর দখল করেনি। গাপ্পু পারি নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে তারা লিজ নেয় কয়েক বছর আগে। এই জমি চাষযোগ্য ছিলনা । পাহাড়ের পাথর,নুড়ি আর অনুর্বর জমি কোনভাবেই চাষের অনুকূল ছিলনা। দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে এই জমিগুলি তারা চাষ যোগ্য করে তোলে। গোয়ালিয়রের ডিভিশনাল কমিশনার এন বি ওঝা জানান এখানে সরকারি কলেজ তৈরি হওয়ার জন্য এজমি প্রয়োজন। অতি শীঘ্রই জমি অধিগ্রহণ করে দিতে না পারলে কলেজ অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। তাই তাদেরকে ফসল ভর্তি জমির ফসল বুলডোজার দিয়ে নষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অবশ্য জমির মালিক এ নিয়ে মামলা লড়ছে দীর্ঘদিন। তিনি দাবি করেছেন প্রায় আট হেক্টর জমি তারা বংশপরম্পরায় ভোগ করে আসছে । এই জমি অনাবাদি ছিল । তারা তা আবাদ করে এবং দীর্ঘদিন থেকে তার উপর বসবাস করছে ও সেইসঙ্গে সেখানে চাষবাস করছে।
প্রশ্ন হলো গোটা দেশজুড়ে যখন করোনার ছোবল। লকডাউন এর ভয়াবহতা। জীবন-জীবিকা অর্জন করা মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। সেই সময় রাতারাতি জমি অধিগ্রহণ না করলে কি প্রশাসনের চলতো না? হয়তো জমি নিয়ে বিবাদ আছে, হয়তো সেখানে কলেজ তৈরি করা খুবই দরকার। তাই বলে মাঠের ফসল ঘরে তোলার সময় টুকুও দেয়া হবে না? আর যদি তা করতে হয় তাহলে কি আর কোন উপায় ছিল না? কেনো ক্ষতিগ্রস্ত চাষীকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। যে দেশে বিদেশি পুঁজিপতিদের লাল কার্পেট দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়, যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক যারা তাদের ঋণ মুকুব করে দেয়া হয, যে দেশে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে লোক সাগর পাড়ে চলে যায়। সে দেশে একজন গরিব চাষির প্রতি এতোটুকু সহানুভূতি দেখানো হবে না কেন। তারা দলিত বলে? তারা অচ্ছুত বলে ?তারা কি প্রশাসনের কাছে, সরকারের কাছে, মানুষের কাছে , সমাজের কাছে এতোটুকু সুবিচার পেতে পারে না?

(লেখক প্রবীন সাংবাদিক,বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা)