মুহাম্মদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: করোনা ভাইরাস বিশ্বজুড়ে আকার নিয়েছে অতি মারির। এই অতিমারিকে সামাল দিতে হলে সরকারকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হত। বিপদের সময় যেমন মাথা ঠান্ডা রেখে দৃষ্টিকে প্রশস্ত রেখে এগিয়ে যেতে না পারলে বিপদের মোকাবেলা করা যায় না। এক্ষেত্রেও তাই । আমরা দেখছি বিশ্বের যে সকল দেশ খুবই সতর্কতার সঙ্গে এই অতিমারীর মোকাবেলা করছে তারা অনেকটাই সফল। কিন্তু যারা এই অতিইমারিতেও লাগাতার রাজনীতি করে চলেছে, নিজেদের দিশাহীন পরিকল্পনাহীন অদক্ষতা কে ঢাকতে যারা নাটক করে চলেছে দিনের পর দিন সেই সকল দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস অবস্থা। আমাদের দেশের বর্তমান সরকার কাজের থেকে নাটক করার ব্যাপারে ইতিমধ্যেই পারদর্শিতা অর্জন করেছে। চমক দেখানো ও কাজের কাজ না করে অভিনয় করায় সরকার সু পটু ।
ডি মনিটাইজেশন বা পাঁচশত বা হাজার টাকার নোট রাতারাতি বাতিল করার মধ্যে যে নাটকীয়তা ছিল তা দেশবাসী পরবর্তীকালে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে। তারপরও মানুষ ভেবেছিল এটা দুর্ঘটনা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার একের পর এক সেই ধরনের দুর্ঘটনাই ঘটিয়ে চলেছেন। যার সরাসরি ফল ভোগ করতে হচ্ছে সাধারন জনগণকে। এরফলে নাভিশ্বাস উঠছে হতদরিদ্র মানুষের জীবনে। যে দেশের ত্রিশ কোটির উপর মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে, যে দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ জনগণ অভুক্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। যে দেশে কোটি কোটি মানুষ মাথার উপর কোন ছাদ ছাড়াই জীবন যাপন করে। সেই দেশে অর্থনৈতিক তুঘলকীপনা যে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে তা আজ সাধারন মানুষ উপলব্ধি করছে।
গোটা বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বহুদিন থেকেই ছিল। কোন কোন দেশের সরকার পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে করোনা মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। আমাদের দেশের একটি রাজ্য কেরালা। যেখানে সরকার নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে কীভাবে গরীব মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে, কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রেখে করোনাভাইরাস এর মোকাবেলা করতে হবে, টিকা বা প্রতিষেধক না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিকল্প চিকিৎসা করে মানুষকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে হবে তার নিখুঁত পরিকল্পনা করে। যার ফলে আজ আন্তর্জাতিক দরবারে ভারতের কেরালা রাজ্য পুরস্কৃত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের জাতীয় সরকার? তার কোনো কিছুতেই কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। রাতারাতি যেমন নোট বাতিল ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তেমনি করোনা মোকাবেলাতেও তিনি সেই নাটকীয়তার আশ্রয় নিলেন। কখনো থালা বাজালেন, কখনো মোমবাতি জ্বালালেন, কখনো ডাক্তারদের উপর পুষ্পবৃষ্টি ধর্ষণ করলেন। কিন্তু রোগ মুকাবিলা আর সাধারণ মানুষের দুর্গতি ঘোচানোর কি পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছেন?
পরিকল্পনাহীন লক ডাউন যে কত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ আমাদের দেশের পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা। অবর্ণনীয় যন্ত্রনা নিয়ে, দিনের পর দিন না খেয়ে শত শত কিলোমিটার পায়ে হেঁটে, প্রচণ্ড গরমে বাড়ি ফেরার প্রয়াস এবং পথেই পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যু মিছিল আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে পরিকল্পনাহীন লকডাউনের পরিনতি কি ভয়ংকর হতে পারে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার নিরবিকার। নিজের রাজ্যের বাইরে থেকে যারা অন্যত্র কাজ করতে যায় তাদের কথা বিবেচনা করা এবং তাদের দুর্দশার দূর করার চেষ্টা করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ। রেল থেকে শুরু করে আন্তঃরাজ্য পরিবহন কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অথচ শ্রমিকদের পুরো দায়ভার চাপানো হল রাজ্য সরকারের উপর। ফলেযা হওয়ার তাই হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকার জন ধন যোজনায় ৫০০ টাকা করে দিয়েই খালাস। ৫০০ টাকায় একটি পরিবারের কত দিন চলতে পারে তার হিসাব রাখার কি কোনো প্রয়োজন নেই? অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে অর্থমন্ত্রী নির্মলা শীতলা মাইয়া মধ্যবিত্তদের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করলেন। আর্থিক সংকটের সময় কেন্দ্রীয় সরকারের সুদের বিনিময়ে ঋণ দেওয়ার প্রকল্প নাকি জনসেবা? যখন মানুষ কাজ হারাচ্ছে বেকার হয়ে পড়ছে অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ছে ব্যবসা বন্ধ উপার্জনের কোন সুযোগ খোলা নেই তখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সে করবে কী? ঋণ নিলে সুদের যে বোঝা তার ঘাড়ের উপরে চাপবে তা কে বহন করবে? এসব কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধু ঋণ দেওয়ার ঘোষণা করাটাই কী কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর কাজ?
লক ডাউন এর সময় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যে কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করতে পারছে। একের পর এক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের পুঁজি ক্ষয়ে যেতে যেতে এখন শেষের অবস্থা। হকার, মুটে, মজুর, দৈনিক উপার্জনে যাদের দিন চলে তাদের অভুক্ত অবস্থায় আর কতদিন চলতে পারে?
এ তো গেল দূর্দশার একপিঠ। অন্য পিঠে আছে ডাক্তারদের শোষণ। সামান্য কাশি হলে, সর্দি জ্বর হলে ওত পেতে বসে আছে ডাক্তার ও রোগ পরীক্ষা কেন্দ্র গুলি। কথায় কথায় পরীক্ষা? আর করোনা হওয়ার ভয়। মানুষ জীবনের সব কিছু উৎসর্গ করেও নিজের প্রাণ বাঁচাতে চায়। যার ফলে ঘটি বাটি বিক্রি করে, সুদের টাকার দ্বারস্থ হয়েও পরিজনদের চিকিৎসা করাতে বাধ্য হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে যে দুর্দশা সে কথা মাথায় রেখে সাধারণ মানুষকে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের দিকে। আর সেখানে ডাক্তার তো নয় ডাকাতের ভিড়। কোনভাবেই করোনা পজিটিভের রিপোর্ট রোগীর হাতে ধরাতে পারলেই আর চিন্তা নেই। সঙ্গে সঙ্গে রোগীর পরিবারের হাতে আসতে থাকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিল। সরকারি হাসপাতালে সিট নেই। বেসরকারি হাসপাতালে কসাইয়ের ভিড়। কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ?
একদিকে উপার্জনের পথ বন্ধ। আবার অন্যদিকে এ ধরনের দুর্ভোগে। দুর্বিসহ পরিবেশ। মানুষের এই চরম সংকটে সরকারের যে ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল সরকার তা নিতে ব্যর্থ। রাজনীতি ভুলে অবিলম্বে সরকার আন্তরিক নাহলে মহা বিপর্যয়ের মহা বিপর্যয়ের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হবেনা।
(লেখক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের প্রণেতা)