মুহাম্মদ নূরুদ্দীন,টিডিএন বাংলা: অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ইংরেজদের অত্যাচারের প্রতিবাদে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ১১ ই মে ১৮৫৭ বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে বহু ইংরেজকে হত্যা করে। তারা লাল কেল্লা দখল করে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে। আসলে বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্ন। ইংরেজরা তাকে নামমাত্র টিকিয়ে রাখলেও তাঁর হাতে কোন ক্ষমতা ছিল না। বিপ্লবীরা গভীর রাতে লালকেল্লায় ২১ বার তোপধ্বনি দিয়ে ৮২ বছরের বৃদ্ধ সম্রাটকে তাদের নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। বৃদ্ধ বয়স, দুর্বল শরীর তারপরও শেষ সুযোগ পেয়ে সিংহের মত গর্জে উঠলেন বাহাদুর শাহ জাফর। তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দ্রুত যুদ্ধের পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেললেন। তিনি সন্ধান করলেন এক গতিশীল নেতৃত্বের। ইংরেজদের মোকাবেলায় সকলকে সাথে নিয়ে কাজ করার জন্য ভারতীয় রাজাদের কনফেডারেশন এর প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। সিংহাসন ত্যাগ করে সেই কনফেডারেশন এর হাতে যৌথ নেতৃত্ব তুলে দিতে চান। সমগ্র দেশীয় রাজন্যবর্গকে চিঠি দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান বাহাদুর শাহ জাফর। সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর ৮২ বছর বয়সেও বিপ্লবীদের আবেদন গ্রহণ করে নেতৃত্ব দিতে রাজি হওয়ায় সারা দেশজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।একজন দায়িত্বশীল নেতার মত তিনি তার বাড়ির আসবাবপত্র পর্যন্ত বিক্রয় করে সৈন্যদের ছয় মাসের বেতনের ব্যবস্থা করেন। তিনি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিপ্লবে সহযোগিতা করার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন। সাধারণ মানুষ ও সৈন্যবাহিনী তার পাশে থাকলেও বণিক শ্রেণি তাঁর আহবানে সাড়া দেয়নি। রামজীবন, শ্রী জ্যোতি প্রসাদ এর মত ব্যবসায়ীরা ইংরেজদের বিপুল পরিমাণে আর্থিক সাহায্য করে কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে আর্থিক সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে তেমন কাউকে পাওয়া গেল না। বাদশা টাকা ছাপার জন্য টাকশাল খুললেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইংরেজরা দিকে দিকে নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহীদের হত্যা করতে থাকে। রসদ এর অভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। একে একে এই বিদ্রোহ দমন করতে করতে ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়। বাহাদুর শাহ উপায়ন্তর না দেখে লালকেল্লা ছেড়ে তার পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন। এখান থেকেই তাকে সপরিবারে গ্রেপ্তার করা হয়। দুর্গে বন্দী হলেন বৃদ্ধ রাজা ও তার সহধর্মিণী বেগম জিনাত মহল।
বাহাদুর শাহের দুই পুত্রসহ রাজপরিবারের ২৯ জন শিশু ও বালক-বালিকাকে ইংরেজ সেনাপতি মিস্টার হুডসন গরুর গাড়ি থেকে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করে ২৯ জনের কাটা মাথা বাদশাহের সামনে উপঢৌকন দেয়া হয়। অসহায় সম্রাট শিশুর মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তাঁকে প্রকাশ্যে জনপদে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়।
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি বিচারের প্রহসনে বাদশাহ ও তার স্ত্রীকে যাবত জীবন নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের শেষ দিনগুলি চিকিৎসাহীন অবস্থায় কাটে তাঁর । ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর শুক্রবার এই মহান দেশপ্রেমিক দুনিয়ার মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি দেন।
সংকীর্ণমনা ইতিহাস বাহাদুর শাহকে স্মরণ রাখতে চায় না। কিন্তু নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দেশকে ইংরেজ মুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহের ত্যাগ-ও কুরবানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। সেখান থেকেই নেতাজি গর্জে উঠেছিলেনঃ ‘দিল্লি চলো’। ১৯৮৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী রাষ্ট্রীয় সফরে শেষ মুঘল সম্রাটের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।