মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: করোনার আবহে ঈদ বছর ঘুরে আবার ফিরে এলো ঈদুল আজহার চাঁদ। আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখে হয় ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। সবকিছুর মতো এবার ঈদের আবহকেও করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে। ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে মিলন। ঈদ মানে একে অপরের সঙ্গে প্রেম প্রীতি ভালোবাসায় হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু এ বছরের ঈদে সেই মিলন আনন্দ আর কোলাকুলির অবকাশ থাকবে না। করোনা ভাইরাসের ব্যাপক প্রভাবের কারণে আমাদেরকে দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে যাতে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে মহা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে না পারে। সেই কারণে যত সতর্কতার সঙ্গে সম্ভব আমাদেরকে ঈদুল আযহার নামায ও কুরবানীর আয়োজন করতে হবে। কোলাকুলি করা, মেলামেশা করা, একসঙ্গে জড়ো হয়ে আনন্দ করা, ব্যাপকভাবে পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া এসব গুলি করার অবকাশ আর এবছর নেই। তাই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, সাবধান থাকতে হবে। করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবো এবং শারীরিক দূরত্বও বজায় রাখবো ঠিকই, কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই ঈদের চেতনাই হলো মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন জোরদার করা। সামাজিক দূরত্বের নামে আমরা যেন মানসিক দূরত্বে জড়িয়ে না পড়ি। অশুভ শক্তি আমাদেরকে যেন অমানুষ করে না ফেলে। সেজন্য আমাদেরকে সবসময় সচেতন থাকতে হবে।
ভোগ নয়, ত্যাগই কুরবানীর শিক্ষা।
ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিক ধর্ম নয়, কর্মনির্ভর ধর্ম। যার কর্ম শুদ্ধ নয়, তার ধর্মও শুদ্ধ নয়। ঈমান পাকাপোক্ত হয় সৎকর্মের মাধ্যমে। সৎকর্মে যারা আজীবন নিবিষ্ট থাকে তারাই সৃষ্টির সেরা। প্রবৃত্তির দাস কখনও আল্লাহর দাসে পরিণত হতে পারে না। ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত হয়ে মানবতার সেবা এমনভাবে করতে হবে যেভাবে আল্লাহ্ আমাদের অনুগ্রহ করেন। শেখ সাদী (র.) বলেন, ‘
‘তব তসবিহ এবং সিজদা দেখে খোদ এলাহী ভুলবে না,
মানবসেবার কুঞ্জি ছাড়া স্বর্গ দুয়ার খুলবে না।’
আনন্দ নয় আত্ম শুদ্ধি,
ঈদ মুসলমানদের একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতিরই একটা অংশ। ঈদের আনন্দ অন্তর থেকে উপলদ্ধি করতে পারেন একমাত্র মুসলমানরাই। ঈদুল আযহায় আল্লাহ্তায়ালার প্রতি হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার যে আনন্দ তার স্মরনে ঈদুল আযহা কুরবানী বা ত্যাগের ঈদ। কুরবানী মানে শুধু পশু জবাই নয় মনের পশু জবাই করার দিন। চার হাজার বছর এর বেশি আগে হযরত ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহ্তায়ালার নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস অর্থাৎ প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানী করতে উদ্যত হন। কিন্তু মহান আল্লাহ্-তায়ালার অপার কুদরত ও মহিমায় হযরত ইসমাইল (আ.) এর পরিবর্তে দুম্বা কুরবানী হয়ে যায়। সেই থেকেই চালু হয় কুরবানীতে পশু জবাই করার বিধান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সেই ত্যাগের মহিমা স্মরণ করে মুসলমানরা ঈদুল আযহার দিনে আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করে পশু কুরবানী করেন। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। ঈদের পরের দুই দিনও পশুকুরবানী করা যায়। কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্যে, আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে এক ভাগ এবং গরিব মানুষদের মধ্যে একভাগ বণ্টন করে দেয়া উত্তম।
কুরবানী হলো পশুর সঙ্গে মনের পশুত্বকেও হত্যা করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে অনেকে অনেক মানসিকতায় কুরবানী করেন। কেউ কেউ লোক লজ্জায় নিজে কুরবানী না দিলে সন্তানরা গোশত পাবে কোথায়, আশপাশের অনেকেই কুরবানী দিচ্ছে আমি না দেই কীভাবে- এ ধরনের মানসিকতা থেকেও কুরবানী করেন। এ ধরনের কুরবানী আল্লাহ তায়ালার দরবারে নাও পৌঁছাতে পারে। তাছাড়া অনেক বিত্ত বৈভবের মালিকগণকে কত দামের কুরবানি করবেন সে প্রতিযোগিতায় শামিল হতে দেখা যায়। তাদের কাছে কুরবানী লৌকিকতা হয়ে গেছে। লক্ষাধিক টাকায় পশু কিনে বাসার গেটের সামনে বেঁধে রেখে নিজ এলাকায় খ্যাতি অর্জনই অনেকের কুরবানী উদ্দেশ্য বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়। এ ধরনের কুরবানী দ্বারা আত্মত্যাগ হয় না। ঈদুল আযহার দিনে পশু কুরবানীর মাধ্যমে প্রকৃত ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হোক আমাদের জীবন। তা না হলে সামর্থ্যবান মুসলমানদের কুরবানি কোনো সার্থকতা বয়ে আনবে না। কুরবানীর তাৎপর্য হলো আল্লাহর আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন। কুরবানী শুধুমাত্র একটি ইবাদতই নয়, বরং কুরবানীর মধ্যে রয়েছে ত্যাগ, উৎসর্গ ও আনুগত্যের এক মহান দৃষ্টান্ত।