মুহাম্মদ নুরুদ্দীন,টিডিএন বাংলা: কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাস সমাজের কোন অংশকে যদি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আঘাত হেনে থাকে তাহলে তা হবে শৈশব। করোনা ভাইরাসের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে শিশুদের মন। স্কুল কলেজ বন্ধ। প্রাইভেট টিউশনিতে অংশগ্রহণ করতে পারছে না বেশিরভাগ শিশু। গৃহের অভ্যন্তরে বন্দিদশায় তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক অন্যরকম মানসিক যন্ত্রনা। বিদ্যালয় শুধু শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্র নয়। সেটা তাদের মানসিক প্রসান্তি অর্জনের লীলাক্ষেত্রও বটে। শিশু ও তরুণ-তরুণীর জন্য স্কুল হচ্ছে সুযোগের সেরা মাধ্যম, আত্মরক্ষার ঢালও। সহিংসতা, নিপীড়ন ও অন্যান্য কঠিন পরিস্থিতি থেকে শিশুদের রক্ষা করে শ্রেণীকক্ষ।
করোনা ভাইরাসের আঘাতে বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়েছে শ্রেণিকক্ষের পাঠ। শিশুরা এখন গৃহবন্দী। বাড়ির পরিবেশে দিনরাত আবদ্ধ থাকতে থাকতে তারা অনেকটাই খিটমিটে হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এই লকডাউনের আঘাতে যখন বাড়ির অভিভাবকরা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারেন না। অর্থনৈতিক চিন্তা, কাজের চিন্তা, এক জায়গায় দিনরাত আবদ্ধ থাকে থাকে বন্দিদশা। সেই সময় তারাও যে শিশু-কিশোরদের প্রতি উদার ব্যবহার সবসময় করতে পারবেন সব সময় তা নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের আমদানি। যে সকল পিতা মাতা ছেলেদের লেখাপড়া নষ্ট হবে বলে সন্তানের হাতে কোনোভাবেই এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন তুলে দিতে রাজি ছিলেন না তারা এখন শিশুদের হাতে দুটি কারণে মোবাইল তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রথমত, যখন স্কুল থেকে অনলাইন পাঠের কথা বলা হচ্ছে তখন সময়ে অভিভাবকরা চিন্তায় পড়ছেন। সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তারা শিক্ষার এই চাহিদা পূরণ করার জন্য সন্তানের হাতে এন্ড্রয়েড ফোন তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা পিছিয়ে পড়লে যে আর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে না এই ভাবনা অভিভাবকদেরকে পিড়িত করে। দ্বিতীয়তঃ দিনরাত ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে থাকতে হলে কিছু একটা নিয়ে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতিতে এন্ড্রয়েড ফোনের থেকে বড় সাথী আর কেউ নেই। শিশু এবং কিশোর এই সুযোগে সাংঘাতিকভাবে আজ আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইল ফোনের উপর। জানিনা এই আসক্তি তাদের ভবিষ্যৎ কে কোন দিকে নিয়ে যাবে? চোখ শরীর মন মানসিকতার উপরে এর যে প্রভাব পড়বে তার থেকে শৈশব কীভাবে মুক্ত হবে তা ভাবলে আঁতকে উঠতে হয়।
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে লকডাউন এর এই সময়ে পারিবারিক অশান্তি বেড়ে যাচ্ছে। যে সকল অভিভাবক নিজেদের কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তান-সন্ততিদের প্রতি সময় দিতে পারেননি লকডাউন এর সুযোগে তারা ভেবেছেন এইবার শিশুদের প্রতি একটু সময় দেওয়া যাবে। স্বাভাবিকভাবেই তারা দিনরাত পড়ার মধ্যে আটকে রাখতে চাচ্ছে সন্তানদের। অপরদিকে আবদ্ধ পরিবেশে পড়াশোনার উপযুক্ত মানসিক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না সন্তানরা। বেশিরভাগ অভিভাবকের সেটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা অবশ্য কম তাই পারিবারিক জীবনে তৈরি হচ্ছে দারুন জটিলতা। এই বিপদ থেকে শৈশব কে রক্ষা করার অন্যতম রাস্তা স্কুল কলেজ খুলে দেওয়া স্কুল-কলেজ খুলে দিয়ে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে শিশুমনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাবে তা হয়তো কখনো পূরণ করা সম্ভব হবে না।
যুক্তরাজ্যের দাতব্য প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা ভাইরাস মহামারির পরে প্রায় এক কোটি শিশু আর স্কুলে ফিরে যেতে পারবে না। শিক্ষা তহবিল কাটছাঁট ও দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কারণে এই বিরাট সংখ্যক শিশু স্কুল থেকে ঝরে যাবে। যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেভ দ্য চিলড্রেনের ওই বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে গত এপ্রিলের প্রথম থেকে স্কুল বন্ধ রয়েছে, এতে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে।
এমন পরিস্থিতি গরিব শিশুদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর স্কুল খুলে দিলেও লাখ লাখ শিশু আর শ্রেণীকক্ষে ফিরে যেতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ঠেকাতে সরকারগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগাদা দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনা মহামারি সেই অগ্রযাত্রাকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে বলে সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমনকি আগের অর্জনকেও এই মহামারি ম্লান করে দিতে পারে বলে শংকা প্রকাশ করা হয়েছে। সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, দরিদ্র দেশের দরিদ্র শিশুরাই রয়েছে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। করোনার আগেও ওরা ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এখন ঝুঁকিটা হয়তো আরও বেড়ে গেছে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান সভ্যতার শাসকরাই মূলত এই ঝুঁকি সৃষ্টি করে রেখেছেন।
শৈশবকে এই সংকট থেকে রক্ষা করা এবং তাদের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া সরকারি উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। করোনা ভাইরাসের মত মহামারী ঠেকিয়ে দিতে লকডাউন হয়তো একটা বিকল্প । কিন্তু এটা একমাত্র বিকল্প নাও হতে পারে। মানুষের জীবনযাত্রার সার্বিক গতি রোধ করে দিয়ে মাসের পর মাস কীভাবে জীবন চলতে পারে? আমাদের দেশে সরকারের তো নির্দিষ্ট কয়েকটি ফরমান জারি করা ছাড়া আর কোন দায়িত্ব আছে বলে মনে হয়নি। তারা কখনো জনতা কারফিউ, কখনো মোমবাতি জ্বালানো কখনো, পুষ্প বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। যে দেশে শিশুরা খেতে পায় না, যে দেশে কোটি কোটি মানুষের মাথার উপরে ছাদ নেই, যে দেশে বেকারত্বের জ্বালায় যুবসমাজ দিশেহারা সে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি নির্মাণ করা, মন্দির নির্মাণ করা এবং জাতির সামনে এটাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে তুলে ধরাটা যে কত বড় ধোকা তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। রাজনীতির তুরুপের তাস করা হয়েছে যে রাম কে, যার নামে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখিয়ে মসনদ দখল করেছে নরেন্দ্র মোদি ও তার দল সেই রামের আদর্শই কি এই কর্মযজ্ঞ কে সমর্থন করে?
ভারতের সরকার এখন মূর্তির উচ্চতা তৈরীর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি তৈরি হবে ভগবান রামচন্দ্রের। যার উচ্চতা ৮২৩ ফুট। যেন মূর্তির উচ্চতা দিয়ে ভগবান রামচন্দ্রের উচ্চতাকে উর্ধ্বে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। ইতিপূর্বে সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের ৫৯৭ ফুট মূর্তি তৈরি করে বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। চীনের গৌতম বুদ্ধের মূর্তি এ পর্যন্ত ছিল বিশ্বের উচ্চতম মূর্তি যার উচ্চতা চার ফুট। প্রায় তার দ্বিগুণ মূর্তি তৈরি করে এবং সোনা-রূপা অলঙ্কার দিয়ে মন্দির তৈরি করে মানুষের আবেগকে কাছে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে রাজনীতির স্বার্থে ,গদির স্বার্থে ,ক্ষমতার স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে যে আবেগের পরিমণ্ডল তৈরি করা হয়েছে তা রোধ করে সাধ্য কার!