মুহাম্মদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: লকডাউন চলছে সারা দেশে। কতদিন তা দীর্ঘায়িত হবে তা বলা মুশকিল। ১৬ মার্চ ২০২০ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লক ডাউন ঘোষিত হয়। তার পর থেকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পড়াশোনা শিকেয়। গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত পরীক্ষা বাতিল। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ এই স্থবিরতা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন সরকার। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষাকে সমন্বয় করা যায় তা নিয়ে নানান পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে। শিক্ষা বিভাগ ইতিমধ্যে উচ্চমাধ্যমিকের বাকি পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেছে এবং যে পরীক্ষাগুলি হয়েছে তার প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে কীভাবে ছাত্রদের মূল্যায়ন করা হবে সে বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকেও একের পর এক নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে।
সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই নবম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে শতকরা ৩০ শতাংশ সিলেবাস সংকোচন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এটা জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে সাময়িক কর্মসূচি এটা কোন স্থায়ী সিলেবাস নয়। চারটি ক্লাসের ১৯০ টি বিষয়ে এই সংকোচন করা হয়েছে। কিন্তু বিতর্ক উঠেছে বিশেষ কয়েকটি বিষয় নিয়ে। বিশেষ করে দশম শ্রেণি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে লিঙ্গ ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি বৈচিত্রের প্রসঙ্গ। একাদশ শ্রেণি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে নাগরিকত্ব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি বিষয়গুলি। আর দ্বাদশ শ্রেণি থেকে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈদেশিক নীতি, সামাজিক আন্দোলন, আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি বিষয়কে কাটছাঁট করা হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে পরিকল্পিত উন্নয়ন বা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কাটছাঁট করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য এই সকল বিষয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত। জরুরি পরিস্থিতিতে সিলেবাস সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন কথা বলার ছিল না। কিন্তু দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে বোর্ড যে কাটছাট করেছে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সঙ্গত কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। তিনি কেন্দ্রের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী রমেশ প্রক্রিয়াকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন তার প্রতিবাদের কথা। তিনি বলেছেন ‘আমি স্তম্ভিত’। প্রতিবাদ করেছেন রাজ্যসভার সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, আন্দ্রে বেতেই, আশিস নন্দী, অভিজিৎ পাঠক, প্রশান্ত রায়, রজতকান্ত রায় এর মতো প্রবীণ অধ্যাপকগন সহ দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনিশ শিশদিয়া, এল জে ডি নেতা শারদ যাদব প্রমুখ।
কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী আর পি নিশঙ্ক অনেকটা জবাবদিহির সুরেই বলেছেন, এ নিয়ে এত বিতর্কের প্রয়োজন নেই। এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিরোধীরা সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজেন। বিশেষজ্ঞ মহলের বক্তব্য, সিলেবাস সংক্রান্ত বিষয় সংযোজন বা বিয়োজন শিক্ষকদের দ্বারাই করা উচিত। এ বিষয়ে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটলে তা স্বাস্থ্যকর হয়না।
কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীর কথা যথার্থ ধরে নিলে এবং তাঁদের সরকারের কার্যকলাপের তার তেমন মিল না থাকলে উদ্বেগের কোন কারণ ছিলনা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত এবং তাদের যে মনোভাব তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সিলেবাসের যে পরিবর্তন তা নিয়ে আলোচনা করলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ থাকে।
প্রথমত সিলেবাস থেকে ভারতীয় সংবিধানের যে মৌলিক চরিত্র ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ সেই অংশটাকে আঘাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। দশম শ্রেণির সিলেবাসে উল্লেখিত লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ ভারতীয় সংবিধানের ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ আদর্শকে ফুটিয়ে তোলে। বিজেপি এই ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ কে মানতে চায় না। সিলেবাস সংকোচনের মধ্য দিয়ে তারা তাদের সেই মনোভাবই প্রকাশ করল। তারা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে বিশ্বাস করে না। তাই ছেঁটে দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে। এমনকি নাগরিকত্ব, নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য ইত্যাদি বিষয়গুলোকেও তারা উপেক্ষা করতে চেয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট। সংবিধানের প্রস্তাবনায় তা উল্লেখও করা হয়েছে। সিলেবাস সংকোচন করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাটাকে বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে এই সরকার বুঝাতে চায় তাদের মনোভাব কী?
দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন আমাদের বিদেশনীতি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক আন্দোলন, আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি কাটছাঁট করার অর্থ কী? বিশেষ করে আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা আগামী প্রজন্মের জন্য একান্ত জরুরি। বিশাল এই দেশে বাস করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি উপজাতি, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ। তাদের সমস্যা কী, তাদের চাহিদা কী, তা না জানলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অধ্যায় অন্ধকারে থেকে যাবে। আসলে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার তার একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবই প্রকাশ করতে চেয়েছে। কোন সামাজিক আন্দোলন কোন জাতি ও উপজাতিদের দাবি দাওয়াকে গুরুত্ব না দেয়াই সরকারের দৃষ্টিকোণ। আর ঠিক এই জায়গাতেই সাধারণ নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
উদ্বিগ্ন হওয়ার আরো একটি অন্যতম কারণ হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে ‘পরিকল্পিত উন্নয়ন’ অধ্যায়কে বাদ দেওয়া। আসলে কেন্দ্রের এই সরকার আসার পর থেকে একের পর এক যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাতে কোন সুসংগঠিত সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার ছাপ লক্ষ্য করা যায়নি। তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে অনেক। সেই জন্যই কি রাষ্ট্র কল্পনা নামক জিনিসটাকে ভয় পেতে শুরু করেছেন? ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সর্বপ্রথম সুদূর প্রসারী উন্নয়নের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের কর্মসূচি গ্রহণ হয়। সরকার যায়, সরকার আসে কিন্তু উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনার যে রোড ম্যাপ হয় তা রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। এদেশে আছে শক্তপোক্ত পরিকল্পনা কমিশন। সরকার কী সবকিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে চায়? উদ্দেশ্যহীন, পরিকল্পনাহীন কার্যকলাপ তো বিশৃংখলার নামান্তর। আমরা বছরের পর বছর সেই বিশৃঙ্খলাই দেখে এসেছি। নোট বাতিল থেকে শুরু করে জিএসটি তারপর এনআরসি আর ক্যা। এরপর আমরা দেখেছি সারা দেশজুড়ে পরিকল্পনাহীন লক ডাউন এর কথা। আসলে সাময়িক সিলেবাস পরিবর্তন যতটা না গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সিলেবাস সংকোচনের মাধ্যমে সরকারের যে মনোভাব প্রকাশিত হচ্ছে সেটি । কেন্দ্রীয় সরকারের এই মনোভাবে নাগরিক সমাজের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
(লেখক প্রবীন সাংবাদিক,বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা।)