বিজেপি ওয়াইসিকে চায় না, কেননা বিজেপির ওয়াইসিকে দরকার নেই

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: বিজেপির লক্ষ্য হলো মুসলমানদের অকিঞ্চিত্কর করে তোলা এবং ওয়াইসি সেই পরিকল্পনা রূপায়ণের পথে এক বড় বাঁধা।

আমাদের প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে বিজেপি ভোটে জেতার জন্য সবকিছু করতে পারে তবুও, বিজেপি একটি কাজ করে না, বিশেষত নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের বিজেপি তা হলো এরা খুব কমই মুসলমানদের টিকিট দেয়। এর জন্য কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত আসন বিজেপি কে হারাতেও হয়। তাই ভোটে জেতাই যদি বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য হতো তাহলে এরা সানন্দে বেশি বেশি করে মুসলিম প্রার্থীদের টিকিট দিতো।
মুসলিম প্রার্থীদের কে প্রতিনিধিত্ব দিলে, রাজস্থান, দিল্লী , কর্ণাটক এবং মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভবত বিজেপি জয়ী হতে পারতো। বিজেপির এই একচেটিয়া জয়জয়কারের বাজারে, এমন বহু মুসলিম খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা বিজেপির হয়ে ভোটে প্রার্থী হতে চান। বেশিরভাগ সম্প্রদায়ের মতো, মুসলমানরাও ক্ষমতাসীন পার্টির সাথে থাকতে চাইবে।
কিন্তু বিজেপি মুসলিমদের আকাঙ্ক্ষাকে সেইভাবে পাত্তা দেয়নি, তার কারণ ভোট জেতার থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিজেপির কাছে রয়েছে এবং তার অন্যতম হলো তাদের আইডোলজি। ২০১৪ এর সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পর এটা আগের থেকে অনেক পরিষ্কার যে বিজেপি মুসলিমদের তুচ্ছ করতে করতে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চায় যেখানে তাদের উপস্থিতির আর টের পাওয়া যাবে না। তাদের মতে , মুসুলমানদের কে চুপ করে ঘরে বসে থাকতে হবে। মুসুলমানদের কে বিধায়ক, এমপি, মন্ত্রী বা নেতা হওয়া যাবে না। মুসুলমান না কথা বলবে – না তাদের কথা শোনা হবে।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে দু’একটি রাস্তায় যানবাহন আটকে দেওয়ার ঘটনা কি এতটাই বড় ছিল যে তার জন্য দিল্লিতে দাঙ্গা হতে হবে ? পূর্ব দিল্লির কোনো একটি রাস্তা আটকে দেওয়ার ফলে তৈরি হওয়া যাত্রীদের সমস্যা কি নাগরিকত্ব আইন এর ফলে তৈরি হওয়া সমস্যার থেকেও বড় ছিল ? এটা প্রমান করে যে বিজেপির কাছে মুসলিম রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ঠিক কতটা অগ্রহণযোগ্য।
বিজেপি ওয়াইসি কে চায় না,
“বিজেপি চায় আসাদউদ্দিন ওয়াইসি রাজনীতি করুক” এটা বললে রসিকতা করা হবে। বিজেপি মুসলিম দাড়ি বা টুপি চায় না। আমি যেটা বুঝেছি সেটা হলো বিজেপি চায় না একজন মুসলিম সংসদে থাকুক – তার কারণ, কেন মুসলমানরা কোনো ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ সংসদে উপস্থিত থাকবে ?
বিহারের রাজনীতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রেজারি বেঞ্চে কোনো মুসলিম বিধায়ক নেই। বিহারের জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ সম্প্রদায়ের মানুষ – প্রত্যেক ৬ টি মানুষের মধ্যে একটি মানুষ যে সম্প্রদায়ের, তাদেরকে বিজেপি একটিও টিকিট দেয়নি। এরাই ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা মুসলিমদের শক্তির করিডোরগুলি থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে চায়। আপনারা কি মনে করেন যে তারা বিহারের বিধানসভায় সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন(এআইএমআইএম) এর পাঁচ বিধায়ককে দেখে খুব আনন্দিত ?
মীমের পাঁচ আসনে জয় অনেকের মধ্যে সেই পুরোনো দুঃশ্চিন্তা কে বাড়িয়েছে তা হলো বিজেপি চায় ওয়াইসির উত্থান হোক বা বিজেপি চায় মুসলিমরা একটি মুসলিম পার্টিকেই ভোট দিক ঠিক যেভাবে এরা চেয়ে এসেছে যে সব হিন্দুরা শুধুমাত্র একটি হিন্দু পার্টিকেই ভোট দিক।
কিন্তু এটি বিজেপি-র এজেন্ডার ভুল ব্যাখ্যা। বরঞ্চ বিজেপি-আরএসএস আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ধর্মনিরেপেক্ষ দলগুলিকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে মুসলিম ভোট চাওয়ার জন্য। এবং এটা করা হয়েছে ভারতীয় রাজনীতি এবং জনজীবনে মুসলিম সম্প্রদায়ের কণ্ঠকে নীরব করার জন্য। কিন্তু আজ যদি ভারতীয় মুসলমানরা ওয়াইসি এবং মীমের মাধ্যমে নিজেদের কণ্ঠস্বর ফিরে পান — না, সেটা কখনোই বিজেপির অভিপ্রায় নয়।
বিজেপি বরং এটাই চাইবে যে, মুসলমানদের ভোট দেওয়ার অধিকার এ না থাকুক – যা শেষ পর্যন্ত NPR-NRC-CAA এর কালানুক্রমিক আইন দ্বারা অর্জিত হতে পারে, যা বহু মুসুলমানের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেবে। অনেকেই লক্ষ্য করেছেন কিভাবে আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক (NRC) মহড়াটি বার বার পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করা হচ্ছে যেমন ভাবে একটি মৃত ঘোড়াকে বার বার বেত্রাঘাত করা হয় যতক্ষণ না তার প্রাণ ফিরে আসে এবং এই ঘটনা পরিষ্কার করে দেয় যে বিজেপি কিভাবে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা হ্রাস করবে এবং কেবলমাত্র ট্রেজারি বেঞ্চগুলি থেকে নয় বিরোধী বেঞ্চগুলি থেকেও কিভাবে মুসলিম প্রতিনিধির অনুপস্থিতি অর্জন করা যেতে পারে।
বিজেপির ওয়েসিকে দরকার নেই,
মেরুকরণের জন্য বিজেপির আজ ওয়াইসি দরকার নেই কারণ বিজেপি ইতিমধ্যে মেরুকরণকে তার সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গেছে।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভুয়ো খবর ছড়ানোর জন্য বিজেপির ওয়াইসিকে দরকার নেই – যেমনটি ঘটেছিলো পালঘর এর সাধুদের গণপিটুনির ক্ষেত্রে। ঘটনার সাথে সাথে মুসলিমদের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হলো যদিও এই ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আজ বিজেপি নেতা এবং সমর্থকদের মুসলমানদেরকে হিন্দুবিদ্বেষী ,পাকিস্তান-প্রেমী, গরু-জবাই কারী শয়তান হিসাবে চিত্রিত করার প্রয়াসের পথে যদি কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায় তো সে হলো ওয়াইসির মসৃন সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ।
আর একটি বড়ো ভুল ধারণা হলো, হিন্দুরা কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয় এর কারণেই বিজেপিকে ভোট দেয়। ধর্মীয় পরিচয় এ যদি যথেষ্ট হতো , তাহলে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ বা আরো যেসমস্ত ফাঁকা স্লোগান আছে সেগুলোকে বেচার দরকার হতো না। যেসমস্ত ভোটার শুধুমাত্র ওয়াইসির কারণে বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন তারা এমনিতেও বিজেপিকে ভোট দেবেন। ওয়েসীর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বিজেপির প্রতি হিন্দুত্ববাদী ভোটারদের সান্নিধ্যকে প্রভাবিত করবে না।

ওয়েসির প্রয়োজন কাদের?
আজ ওয়েসির প্রয়োজন সবথেকে বেশি যদি কারো হয়ে থাকে তবে তারা হলেন ভারতীয় মুসলিম – যারা আজ সর্বসাধারণের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত এবং তার প্রধান কারণ হল ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলির নীরবতা। যারা এতদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে তারাই মুসলিমদের স্বার্থের সবথেকে বেশি খেয়াল রেখেছে। এমনকি তাদের হিন্দু মৌলবাদের সাথে যে সক্রিয় সহযোগিতা এতদিন নীরবে চলছিল, তা আজ প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। প্রিয়াংকা গান্ধী , কমলনাথ বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল সাম্প্রতিক কার্যকলাপে সেটা পরিষ্কার।
এমতাঅবস্থায় ওয়াইসি ভারতীয় রাজনীতিতে ভালোর জন্য একটি শক্তি। তিনি মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন না এবং তিনি এটি জানেন।
তিনি যেটা করতে পারবেন তা হ’ল মুসলিম ভোটের জন্য কিছুটা প্রতিযোগিতা তৈরি করা, যা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলিকে এটা স্বীকার করে নিতে বাধ্য করবে যে, হ্যাঁ ভারতবর্ষে মুসলমানও রয়েছে এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটারদের মতো তারাও সমমর্যাদার অধিকারী।

(সৌজন্যে: দি প্রিন্ট ।
মূল লেখা: সিভম ভিজ
অনুবাদ: আরিক আখীর, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার)