মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা:

আলোচনার শুরুতে একটা গল্প বলি। একটি জাহাজে দুই দল যাত্রী ছিল। একদল যাত্রী থাকে নিচে আরেকদল উপরে। নিচের যাত্রীদের জলের প্রয়োজন হলে উপরে যেতে হতো। এতে উপরের যাত্রীরা বিরক্ত হত। বাধ্য হয়ে নিচের যাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিল জাহাজের তলা ফুটো করে তারা সমুদ্র থেকে জল তুলে নেবে। যদি উপরের যাত্রীরা তাদের এ কাজ করতে বাধা না দেয় তাহলে পরিণতি কী হবে?

আমাদের দেশ তথা গোটা বিশ্ব এই ধরনের এক প্রশ্নের মুখোমুখি। কর্পোরেট বেনিয়াদের ছোবলে দিনের পর দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। প্রকৃতিতে চলছে বিপর্যয়। যখন আম্পান ঝড় বাংলার উপকূলে আছড়ে পড়ল তখন অনেক বিশ্লেষণ হলো। অনেক আলোচনা হল। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ যে সাইক্লোন গুলোকে ঠেকিয়ে দিতে পারতো তা আজ আর নেই। বড় বড় গাছ সবশেষ। কাঁটা জঙ্গলে ভরে আছে সুন্দরবন। যার ফলে বঙ্গোপসাগরের একের পর এক ঝড়ের আঘাত ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে উপকূলবর্তী এলাকাকে। এই জঙ্গল কাটার পিছনেও বেনিয়াদের হাতে ছিল। আজকের কেন্দ্রীয় সরকার বেসরকারিকরণের পথে দ্রুত ছুটে চলেছে। একের পর এক কর্পোরেট বেনিয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে এ দেশের সরকার। এখন তাদের লক্ষ্য ভারতের বিশাল বনভূমি।

১৮ জুন দেশের ৪১টি কয়লা ব্লক নিলামে চড়িয়েছেন স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘দি মিনারেল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ এর বলে বলীয়ান হয়ে। এই ৪১টি কয়লা ব্লকের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৬লক্ষ হেক্টর জমি ‘নো গো’ এরিয়ায় অর্থাৎ গভীর বনাঞ্চলের অন্তর্গত। ‘নো গো’ এলাকা মানে সেখানে আছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, গভীর বনাঞ্চল আর বিভিন্ন নদী- উপনদীদের অজস্র জলধারা। এর মধ্যে ১১টি মধ্যপ্রদেশে, ৯টি করে ব্লক ছত্তিশগড় ওডিশা আর ঝাড়খন্ডে আর তিনটি মহারাষ্ট্রে। মোদীর সঙ্গেই ই-অকশনে শামিল ছিলেন টাটা সনস’র চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখরন, বেদান্ত গ্রুপের অনিল আগরওয়াল। আর খরিদ্দার হিসাবে ছুটে এসেছে টাটা, বেদান্ত, আদানি, জিন্দাল, হিন্ডালকো, জেএসডব্লিউ থেকে বিএইচপি,রিও টিন্টো, বিলিটনপিবডির মত বিদেশি গ্রুপ।
বন সম্পদের প্রতি বেনিয়াদের লোভ আতি প্রাচীন। ইংরেজরাও এক সময় আদিবাসীদের হটিয়ে বন উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজেদের জীবনধারণের মূল সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নিতে পারে নি আদিবাসী সম্প্রদায় ৷ ১৮৯৫ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুরু হল উলগুলান অথবা উপজাতি বিদ্রোহ ৷ কিংবদন্তী আদিবাসী নেতা বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে জঙ্গল মহলের দিকে দিকে বেজে উঠেছিল ধামসা আর মাদল ৷ শুরু হয়েছিল যুদ্ধ ৷
কয়েক বছর ধরে ব্রিটিশের বন্দুকের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে তীর-ধনুক নিয়ে লড়াই চালানোর পরে ধরা পড়েন বীরসা ৷ ফাঁসি হয় তাঁর। কিন্তু আদিবাসীরা মনে করেন যে তাঁদের বীরসা ভগবান এখনও বেঁচে আছেন ৷
বীরসার লড়াই শুরু হওয়ার প্রায় ১১০ বছর পরে ২০০৫ সালের জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঘোষণা করেছিলেন যে, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষকে জঙ্গল মহলে বাস করার এবং চাষাবাদ করার অধিবার দিতে হবে। তৈরী হয় এক নতুন আইন ৷ আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরেই বনাঞ্চলে বসবাস করে ৷ তাঁদের পরিবারের সদস্য সংখ্যাও বেড়েছে ৷ কিন্তু তাদের বসবাস করাকে অবৈধ বলা হয়। মনমোহন সিং আইন করে জঙ্গলে আদিবাসীদের বসবাসের বৈধতা দিতে চেয়ে ছিলেন ।

কিন্তু আজ আবার সেই আদিবাসীদের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন। পরিবেশবিদদের হিসেব মতো কয়লা ব্লক নিলামে চড়লে শুধু গাছ কাটা পড়বে কয়েকলক্ষ। কমকরে তিরিশ হাজার আদিবাসী পরিবার উচ্ছেদ হবেন এই সব অন্চলে। অন্যান্য জীবজন্তু বিশেষ করে ঐ এলাকার হাতির কথা আর আলাদা করে নাইবা বললাম। গভীর অরণ্যের গাছ কেটে, আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে দেশের জাতীয় সম্পদ তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেটের হাতে।
কয়লা ব্লকের নিলামের বিরুদ্ধে ছত্তিশগড়ের হাসদেও বনাঞ্চলের ২০টি গ্রাম চিঠি লিখেছে মোদীকে। ছত্তিশগড় সরকারও নারাজ। ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন মামলা দায়ের করেছেন সুপ্রিম কোর্টে অকশন বাতিলের দাবিতে। নিজেদের আপত্তি জানিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকারও।
রাষ্ট্রায়ত্ত কোল ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণ রুখতে ২জুলাই থেকে ৪জুলাই টানা তিন দিন ধর্মঘট ডেকেছিল কয়লা ক্ষেত্রের সবকটি ট্রেড ইউনিয়ন একসাথে।
ওডিশার আদিবাসীরা তীর ধনুক হাতে তাড়িয়েছেন বেদান্ত গ্রুপকে। ওরা বক্সাইট খনি শুরু করতে পারেনি। ছত্তিশগড়ের বাইলাডিলায় তির ধুনক নিয়ে আদিবাসীরা ভাগিয়ে দিয়েছেন এনডিএমসি’র কর্তাদের।

জঙ্গল মানে শুধু আরণ্যকের শাল পিয়ালের অপরূপ সৌন্দর্য নয় বা আগন্তুকের মমতা শংকরের ধামসা মাদল বাজিয়ে আদিবাসী নৃত্য নয় বা বেতলা নেতারহাটে জঙ্গল সাফারি নয়।
জঙ্গল মানে আত্মরক্ষার অধিকার। জঙ্গল মানে সম্পদের অধিকার। আর সেই অধিকার আমার দেশের সাঁওতাল কোল মুন্ডা গোন্ড ওঁরাওরা ছেড়ে দেননি। তাঁরা এখনও লড়ছেন। নিজের দেশের সম্পদকে রক্ষার জন্য। আমাদের এখনও তাকিয়ে দেখার সময় হয়নি। আমরা এখনও চিৎকার করিনি। আমাদেরকে ধর্মের জুজু দেখিয়ে সব কিছু লুট হয়ে যাচ্ছে। এখনও যদি বন স্মপদ বাঁচানোর জন্য সার্বিক আন্দোলন গড়ে তোলা না যায় তাহলে ঐ জাহাজের পরিনতি হবে আমাদেরও।
(লেখক প্রবীন সাংবাদিক,বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা।)