‘বঙ্গাল’ না ‘বাংলা’ কাকে নেবে তুমি

মুহাম্মাদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলাঃ

“ছেলে আমার খুব সিরিয়াস কথায় কথায় হাসে না,
জানেন দাদা! আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।

ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের রসাত্মক ছড়া বাংলা ভাষাকে দেখে নাক সিটকানো আধুনিক শিক্ষিতদের উদ্দেশ্যে একটা তীব্র শ্লেষ। বাংলা ভাষার গুরুত্ব বা বঙ্গ প্রীতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা আজকের উদ্দেশ্য নয়। বরং আজকাল কিছু কিছু মানুষের বঙ্গ প্রীতি বেড়েছে খুব বেশি। ইনিয়ে বিনিয়ে নানানভাবে তারা বাংলা বলার চেষ্টা করছেন। তাদের কেউই বাংলাটা ঠিক ভালো করে উচ্চারণ করতে পারেন না। বাংলাটা তাদের কাছে ‘বঙ্গল’ হয়েই রয়ে যায়। তবুও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘গুরুবর’ বলে উল্লেখ করে তার কবিতা আউড়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সাঙ্গ পাঙ্গরা নিজেদের বাংলা প্রীতি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তখন বড় অদ্ভুত লাগে। যেমনঃ
“চোলায় চোলায় বাজবে জোয়ের বেরি
পায়ের বেগেই পোত কেটে যায়
করিস না আর দেরি”
এরকম আরোও অদ্ভুত অদ্ভুত বাংলা উচ্চারণ ইদানিং খুব বেশি শোনা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের এই দেশে এধরনের দেওয়া-নেওয়ার সংস্কৃতি কখনো কখনো খুবই মজাদার উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আবার কখনো কখনো তা হৃদয়ের তন্ত্রীতে সাড়া দিয়ে সবাইকে এক করে নিতে শেখায়। এই কালচারটা অবশ্য নতুন নয়। জহরলাল নেহেরু যখন তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে পাঠান তখন তার বাংলার প্রতি ছিলো অগাধ শ্রদ্ধা। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের প্রতি। সেই নেহেরু কন্যা যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী তিনিও বাংলায় এলে জনগণকে বাংলায় সম্বোধন করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, আমি বাংলা বলতে পারি না কিন্তু বুঝতে পারি। এই নিয়ে কখনো কারো মনে কোন প্রশ্ন জাগেনি। বরং যখন কোন অবাঙালি বাংলায় এসে জনগনকে বাংলায় সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনারা ভালু আছেন?” তখন বাঙালি সমাজ তা উপভোগ করেন বইকি। সেইজন্যে প্রায়ই করতালি দিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। বাঙালি অস্মিতা কখনো এটাকে বক্র চোখে দেখেনি। সব মানুষ সব ভাষা জানবেন, সব ভাষায় কথা বলবেন এটা তো হতে পারে না। কিন্তু এক ভাষার মানুষ যখন অন্য ভাষায় কথা বলে তখন তা বেশ মজার শোনায়ও। হোক না! এভাবে চললে ক্ষতি কি? হয়তো এইভাবেই যুগ যুগ ধরে নতুন নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। এরই নাম সংস্কৃতি, এরই নাম মেলবন্ধন। শর্ত হচ্ছে যদি তা আন্তরিক হয়। যদি তা উদার মনে সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা সম্ভ্রম বজায় রেখে হয়। সবাইকে বুকে টেনে নেওয়ার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার মত হয়। তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে ‘বঙ্গাল’ আর ‘বাংলা’-র যে লড়াই তারমধ্যে আন্তরিকতা আর উদারতার ছিটেফোঁটা খুঁজতে যাওয়া আহম্বকি।
বাংলা দখল করতে আসা বরগী সেনাদের আপ্রাণ বাংলা বলার চেষ্টা বাংলার প্রতি ভালোবাসা না ফন্দি? বাংলায় ভোটে জিততে গেলে বাঙালির মন জয় করা দরকার। কিন্তু অভিনয় দিয়ে কখনো মন জয় করা যায় না। হয়তো এদের অনেকেই দক্ষ অভিনেতা। অভিনয়ে তাদের খামতি নেই। নরেন্দ্র মোদির দাড়ি আর চুলের বহর দেখে অনেকেই তো রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ ভাবতে শুরু করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে ইলেকশন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যতই বিশ্বকবি হোন না কেন তিনিতো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। বাংলা সংস্কৃতির প্রাণ। সুতরাং অন্তত বাইরের দিকটা রাবীন্দ্রিক ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারলেই কেল্লাফতে। এমন ভাবনা থেকেই হয়তো এ ধরনের বেশভূষা হতে পারে। আবার হয়তো কিছুই নাও হতে পারে। সবটাই মানুষের কল্পনা বিলাস হতে পারে।
যাক সে কথা। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন
“উহারা রত্ন বেনে
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্না করেও চেনে।”
রত্ন আর রত্নাকর যে এক নয় তা বুঝা দরকার। পশ্চিম ভারত থেকে আসা এই বেনিয়া সমাজ যে রত্ন ছাড়া আর কিছুই বোঝে না তা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। গোটা দেশজুড়ে চলছে তাদের লুটতরাজ। জনগণের টাকা কত রকমভাবে শোষণ করা যায় তার নিত্য-নতুন কৌশল তারা দিনরাত আবিষ্কার করেই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে তাদের এই বঙ্গ প্রীতি আসলে যে অভিনয় তা বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয়।

তারা এনআরসি করে ইতিমধ্যে বাঙ্গালীদের নাগরিকত্ব দেয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। যারা এদেশের নাগরিক হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে সব রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে তাদের হঠাৎ করে নাগরিকত্ব দেওয়ার কী প্রয়োজন পড়ল? প্রশ্ন জাগে। শরণার্থী সমস্যা ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যে ততোটা প্রকট নয় যতটা পশ্চিমবঙ্গে। কেননা, দেশভাগের করাল থাবা সরাসরি ছুরি চালিয়ে ছিল বঙ্গ জননীর বুকের উপর দিয়ে। তাই বাংলা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। সে রক্তক্ষরণ এখনো বন্ধ হয়নি। তাই শরণার্থীদের নিয়ে কথা বললে তাদের আবেগে আঘাত দিলে তাদেরকে পাশে টানার কৌশল অবলম্বন করলে যে অতি সহজেই মন ভরানো সম্ভব তা এই বেনিয়ারা ভালই বোঝে। ঠিক সেইভাবেই পাতা হয়েছে ফাঁদ।
১৯৩৫ সালের হিটলারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নুরেমবার্গ এর মাধ্যমে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ভয়ঙ্কর আইনটি চালু হওয়ার সময় জার্মানির বেশিরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন এটি বুঝি দারুন আইন। এতে জার্মানির দারুণ উন্নতি হবে। হিটলার বলেছিলেন, এই আইনে কেবলমাত্র অনুপ্রবেশকারী ইহুদিদের দেশ ছাড়া করা হবে। কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। ঠিক একইভাবে আমাদের দেশেও নুরেমবার্গের অনুকরণে করল সিএএ। এখানেও সেই হিটলারের মত একই বাণী এই আইনে নাকি দেশের উন্নতি হবে। মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেয়া হবে ইত্যাদি। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে এই আইন ভারতের ভূমিপুত্রদের আইনের জালে ফাঁসিয়ে শেষ করে দেওয়ার কুটকৌশল। ৪ কোটি বাঙালিকে দাস শ্রমিক বানানোর চেষ্টা। সি এ এ পাস করে বিজেপি দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীদের। আর সেই সুযোগে তারা হিন্দু উদ্বাস্তুদের বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মুসলিমদের রাগ হয়েছে। তাই ওরা আন্দোলন করছে। এইভাবে সুস্পষ্টভাবে বিভাজনের যাঁতাকলে জনগণকে শোষণ করার কৌশল চলছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে।

ঠিক নির্বাচনের মুখে এসে যারা শরণার্থী বাঙালীদের জন্য মায়া কান্না কাঁদছে তারা কিন্তু আসামের দগদগে ঘা এখনো চাপা দিতে পারেনি। মুখে যাই বলা হোক না কেন প্রকৃতপক্ষে আসামের বাঙালি হিন্দু মুসলিম সবাই সমানভাবে এনআরসির শিকার। সেখানে চার ভাগের তিন ভাগ বাঙালি হিন্দু এনআরসি তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে হাজার হাজার শরণার্থী হিন্দুরা আছে। আসলে এই ডিটেনশন ক্যাম্প টাই দাস শ্রমিক বানানোর কৌশল। এটা বেনিয়াদের নীল নকশা। বিশ্বজুড়ে অসহায় মানুষকে দাস বানিয়ে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উৎখাতের পিছনে যে ইতিহাস আছে চীনের উইঘুর এলাকার মানুষদের ডিটেনশান ক্যাম্পে রাখার সেই একই ইতিহাস। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে গেলে আমাদের দেশেও দাস শ্রমিক চাই। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষকে বে-নাগরিক করে দিয়ে তাদেরকে দাস বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখতে পারলে তবেই এই বেনিয়াদের পরিকল্পনা সার্থক হবে।

এখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা এই বঙ্গাল মার্কা দরদীদের রাজপাঠ দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকবেন? না এই বর্গীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে অটুট রাখবেন। সিদ্ধান্ত নিতে হবে যারা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে বর্ণপরিচয় লেখান, যারা অন্যতম বাঙালি সংস্কারক ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে অপমানিত করেন, যারা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে চুরমার করেন, যারা স্বামী বিবেকানন্দকে বলেন বিবেকানন্দ ঠাকুর, যারা বাঙালি সমাজের আরাধ্য দেবী দুর্গার সত্তা নিয়ে টানাটানি করেন, যারা রামের নামে রাজনীতি করে হিংসার বীজ বপন করেন তাদের পাশে থাকবেন না দেশ-জাতি মানবতা রক্ষার স্বার্থে সমস্ত সংকীর্ণতা বিভেদ হিংসা ঘৃণা বিদ্বেষ দূর করে সম্প্রীতি ও বন্ধনের সেতু রচনা করবেন? আজকের সচেতন বাঙালিকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কেননা আজকে বাংলা যা ভাবে কালকে সারা ভারত তাই ভাববে। সুতরাং এই বর্গীর হামলা থেকে বাংলা তথা দেশকে রক্ষা করার অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে এই বাঙ্গালীদের কেই।