মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন: সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রী আরও এক চমক দিলেন। দিল্লির এক সভায় তিনি জানালেন ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দেশে লগ্নি আসার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং শীঘ্রই ভারত অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই চমককে ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ইতিপূর্বে নোট বাতিল, বিদেশের ব্যাংকে জমা থাকা কালোটাকা দেশে ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের একাউন্টে ১৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা, জিএসটি ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক চমক তিনি দিয়েছেন। কিন্তু তার এই শেষ চমক একজন সাধারন মানুষের সামনে ও বিস্ময় সৃষ্টি করছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশের কোমর ভাঙ্গা অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বললেও বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক হাল কী, শিল্পায়নের অবস্থা কী, দেশের চালু শিল্পগুলোর পরিস্থিতি কী এসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। অপরদিকে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে তাদের হিসাবে বিগত কয়েক মাসে ভারতের অর্থনীতি ৩৪.৭১ শতাংশ নেমে গেছে । ইকনোমিকটাইমস বিভিন্ন সূত্র থেকে যে সমীক্ষা চালিয়েছে তাতে উঠে এসেছে ভারতের অর্থনৈতিক সংকোচন বিগত কয়েক মাসে ৫৭. ।৬ শতাংশ হয়েছে। ভারতের জিডিপির এক-চতুর্থাংশ সময়ের হিসাব ধরে দেখা যাচ্ছে জিডিপি ৩.১ ।শতাংশে নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান দপ্তর এবং মূখ্য অর্থনৈতিক পরামর্শদাতার অভিমত অনুসারে করোনা ভাইরাস এবং লক ডাউনের কারণেই সারা দেশের এই অর্থনৈতিক পতন। বিশ্বব্যাংকের মতে ভারতের নিম্নগামী অর্থনীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে নিম্নের দিকে নিয়ে গেছে সাম্প্রতিক লকডাউন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ভারতের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশ্বাস বাণী শোনালেন । অথচ বিশ্ব ব্যাংক বলছে ১৯৯০ এর পর ভারতের অর্থনীতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। করনা ভাইরাসের সংক্রমনের কারণে বিশ্বের ৩০টি দেশের আর্থিক অবস্থা নিন্মগামী হয়েছে তার মধ্যে ভারতের স্থান সবচেয়ে উপরে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ভারতের জিডিপি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের আশ্বাসবাণী শোনালেও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগৃহীত রিপোর্ট জানাচ্ছে ১৫ ই মার্চ ২০২০র পর বেকারত্বের সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ১৪ কোটি লোক কাজ হারিয়েছে এবং শতকরা ৪৫ শতাংশ মানুষের বেতনে কাটছাঁট করা হয়েছে। লকডাউন এর প্রথম মাসে প্রতিদিন ৩২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ দপ্তর। এই সময়ে ৫৩ % ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোটা দেশের কৃষকরা অনিশ্চয়তার শিকার। সঠিক সময়ে বীজ না পাওয়ার কারণে চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত যেমন হয়েছে তেমনি বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসল যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে বাজারে পৌঁছাতে না পারার ফলে ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। যদিও এই ক্ষতি মেরামত করার জন্য ইতিপূর্বে সরকার একাধিক আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিল কিন্তু তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সে রিপোর্ট এখনো আসেনি। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর ১৭ এপ্রিল জানিয়েছিলেন লকডাউন এর কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য নবার্ড অর্থাৎ ন্যাশনাল ব্যাংক অফ এগ্রিকালচার এন্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ও এস আইডিবিআই অর্থাৎ স্মল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া কে ৫০ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে। ১২ ই মে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা করেন লকডাউন এবং করোনাভাইরাস এর ক্ষতির কারণে বাৎসরিক বাজেটের প্রায় ১০% অর্কুথাৎ কুড়ি লক্ষ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে দেয়া হবে। অর্থমন্ত্রী এই টাকা প্রদানের বিস্তারিত রিপোর্ট এখনো তৈরি করে উঠতে পেরেছেন বলে জানা যায়নি । তবে তিনি জানিয়েছেন যে মধ্যবিত্তদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রধান মন্ত্রী ভারতে যে ভয়াবহ সঙ্কট চলছে তা থেকে উত্তরণের কোনও দিশা দেখাননি। ব্যাখ্যা করলেন আত্মনির্ভর ভারতের অর্থ। যখন দেশের একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তখন তিনি বিদেশিলগ্নি টানতে লাল কার্পেট বিছিয়ে রাখার কথা বলছেন। পুরোটাই ধোঁয়াশা। আসলে কথার জাদুতে মোহিত করাটাই তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। অনেকগুলি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তাঁর বক্তব্যের পর বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং তারপর সেই বিভ্রান্তি কাটাতে তিনি আসরে নেমে পড়ছেন। এই ভয়াবহ সঙ্কটে থাকা দেশে কোন জাদুতে তিনি অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ খুঁজে পেলেন তা স্পষ্ট করে দেওয়ার দরকার ছিল। সত্যিই কি দেশে বিনিয়োগের পথ মসৃণ হয়েছে? প্রশ্ন উঠবেই।
আসলে কাজের চেয়ে বাগাড়ম্বর বেশি। কথায় ও কাজে অমিল প্রতি পদে পদে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর তা ভাঙার রেকর্ড গড়েছে এই সরকার। আর রয়েছে রাজ্যকে বঞ্চনা করার দীর্ঘ ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরার লক্ষণ খুঁজছেন তখন তাঁরই অর্থমন্ত্রী বাংলাকে বঞ্চিত রেখে প্রচারের ঢক্কানিনাদ বাজালেন। জিএসটি ঘাটতির ক্ষতিপূরণ বাবদ গত অর্থ বছরের ন্যায্য প্রাপ্য ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেওয়া থেকে বাংলাকে বঞ্চিত করে মাত্র ৪১৭ কোটি টাকা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করলেন। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে হলে রাজ্যগুলির অর্থনীতির ভিতও যে মজবুত করা জরুরি তা তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেন না। করোনা লড়াইয়ে রাজ্যের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল কেন্দ্রের। দরকার ছিল সহযোগিতার। দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বপ্ন দেখাতেই বেশি পছন্দ করেন। কখনও আচ্ছে দিনের স্বপ্ন, কখনও ডিজিটাল ইন্ডিয়ার, কখনও বা আত্মনির্ভর ভারত গড়ার স্বপ্ন। এখন অর্থনীতির ভাঙা কোমর নিয়ে বাস্তবকে আড়ালে রেখে বিদেশি ও স্বদেশি লগ্নিতে লাল কার্পেট বিছিয়ে দেওয়ার কথা
বলে বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তাঁর এই চমক কী অর্থনীতির হাড়ির হাল ফেরাতে পারবে? প্রশ্ন সেখানেই.

(লেখক প্রবীন সাংবাদিক,বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও বহু শিশু পাঠ্য গ্রন্থের রচয়িতা।)