আধুনিক গবেষণার জগতে ইনস্টিটিউট অফ অবজেক্টিভ স্টাডিস্

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান, টিডিএন বাংলাঃ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে , ইনস্টিটিউট অফ অবজেক্টিভ স্টাডিস (দিল্লী) বিশেষ সম্মান ও দক্ষতার সাথে গবেষণামূলক কাজ করে আসছে । এই সংস্থাটি বর্তমান ভারতবর্ষের সংবিধান , সমাজ , অর্থনীতি , ধর্ম , সংস্কৃতি ইত্যাদির মূল সমস্যা গুলি গবেষণার মাধ্যমে উপস্থাপন করে চলেছে। সমাজবিজ্ঞান ও মানবতা বিষয়ক ক্ষেত্রে এই সংস্থা যে কর্ম করে চলেছে তা সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ । স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়কালে ভারতীয় মুসলিম সমাজের অবস্থান, উন্নয়ন ও নানা সমস্যার বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাদের বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে । সংস্থাটি মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যাগুলোও গবেষণামূলক কাজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরে থাকে ।

এই সংস্থাটি একটি অরাজনৈতিক এবং অলাভজনক সংস্থা রুপে সফলতার সঙ্গে দীর্ঘ ৩৫ বছরের পথ অতিক্রম করল । বর্তমানে গবেষণা , সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সমীক্ষা , প্রকাশনা , বৃত্তি প্রদান , সাময়িক পত্র পত্রিকার প্রকাশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার ফলস্বরূপ এই সংস্থা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেছে । ইউনাইটেড নেশনস এর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ECOSOC) থেকে সংস্থার সফলতা ও কার্যক্রম বিবেচিত হয়েছে । মূলত আই.ও.এস হল ইউনাইটেড নেশনস এর অন্তর্গত ECOSOC এর একটি উপদেষ্টা সংস্থা ।

১৯৮৬ সালে ড. মোঃ মনজুর আলম সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন আরবের ইউনিভার্সিটি অফ ইমাম-মুহাম্মদ-বিন-সাউদ এর ইসলামিক অর্থনীতি বিভাগে কর্মরত ছিলেন । সৌদি আরবের অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় অর্থনীতি বিভাগে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা রূপে কাজ করেছেন । তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট এর সমিতি সদস্য । সেই সঙ্গে তিনি কুয়েতের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য । এছাড়া তিনি বর্তমানে ভারত তথা বিশ্বব্যাপী এই ধরনের ১২ টির বেশি সংস্থার সাথে যুক্ত রয়েছেন ।

সংস্থাটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দুটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় । যার একটি হল সাধারণ সভা যা ১৭৭+২০ জন সদস্য কর্তৃক গঠিত। অপরটি কার্যকারী কমিশন যা ১৫ জন কর্মী সহায়ক দ্বারা গঠিত। সংস্থার গবেষণা ও অধ্যায়ন বিষয়ক কার্যক্রম ২৩ টি একাডেমিক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এটির মূল সদর দপ্তর দিল্লীতে অবস্থিত। এছাড়াও এটির আরো ৬ টি শাখা রয়েছে ; শাখা গুলো যথাক্রমে আলিগড়, চেন্নাই , কালিকট, আমেদাবাদ, পাটনা ও কলকাতায় অবস্থিত।

এই সংস্থাটি সমাজবিজ্ঞান ও মানবতা বিষয়ক ক্ষেত্রগুলিতে গবেষণার কাজ করে থাকে। গবেষণার মধ্য দিয়ে তারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান, তাদের উন্নয়ন, সংবিধান, আইন , ভারতের ইতিহাস , ইসলামী বিশ্ব ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে তাদের এই নানাধর্মী গবেষণামূলক কাজ গুলো গবেষণার জগতে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে । বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প নির্ধারন করার বিষয়ে তাদের এই গবেষণা বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে । ইতিমধ্যে সংস্থাটি ৪১০ টিরও বেশি গবেষণা প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছে। সেই সঙ্গে আরও অনেক নতুন গবেষণার কাজ চলছে। বর্তমানে সমাজের পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু , দলিত, আদিবাসী শ্রেণি সম্পর্কিত গ্রহণযোগ্য তথ্যের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে , এটি একটি তথ্যভান্ডার রূপে আবির্ভূত হয়েছে ।

পাশাপাশি এই সংস্থাটি প্রকাশনার ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তারা ব্যাঙ্কিং, অর্থায়ন, মুসলিম সমাজের উন্নতি সাধন, সংবিধান, আইন, সমাজবিজ্ঞান, শিক্ষা, ভারতীয় ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, ধর্ম, ইসলামী বিশ্ব, ভারত তথা বিশ্বের মুসলিম সমাজ সম্পর্কিত একাধিক পুস্তক প্রকাশ করেছে। ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি উর্দু, আরবি ও হিন্দি ভাষায় এ ধরনের নানা বই তারা প্রকাশনা করলেও সম্প্রতি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় তারা প্রকাশনার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সংস্থাটি ৪০৫ টিরও বেশি পুস্তক প্রকাশনা সম্পন্ন করেছে। সংস্থাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের সম্মেলন , কর্মশালা, বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে থাকে। তাদের এই সমস্ত আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে সামাজিক,অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । এখনো পর্যন্ত তারা প্রায়ই ১২৫০ এর বেশি এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ।

প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর অধ্যয়ন বিষয়ক দুটি দ্বি-বার্ষিক সাময়িক পত্রিকা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে থাকে । এই সাময়িক পত্রিকা দুটি হল যথা – ১. ‘ দি জার্নাল অফ অবজেক্টিভ স্টাডিস ‘ ২. ‘ দি জার্নাল অফ রিলিজিয়ান এ্যন্ড ল রিভিউ ‘। সেইসঙ্গে ‘হিউম্যান রাইটস টুডে’ নামে একটি ক্ষুদ্র ইশতেহার পত্র প্রকাশ করে । ২০০৬ সাল থেকে সংস্থাটি উর্দু ভাষায় ‘ মুত্তালেয়্আত ‘ নামক ত্রৈমাসিক সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে। সমাজের শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়মিত খবর প্রদান ও সংস্পর্শে থাকার উদ্দেশ্যে সংস্থাটি ইংরেজিতে একটি মাসিক সংবাদ সংকলন এবং একটি ত্রৈমাসিক সংবাদ সংকলন উর্দু ভাষায় প্রকাশ করে থাকে। এছাড়াও সংস্থার তিনটি ওয়েব ম্যাগাজিন রয়েছে, যথা – ১. আই.ও.এস কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ২. আই.ও.এস মিনারেট ৩. আই.ও.এস নুকতা-ই- নাজার ।

প্রতিভাবান ও যোগ্য প্রার্থী যারা সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান , আইন , ব্যবস্থাপনা, সাংবাদিকতা ও অন্যান্য গবেষণামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত তাদের অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য প্রতিষ্ঠানের একটি বৃত্তিদান প্রকল্প আছে। সংস্থাটি প্রাথমিক ১৬ বছরের কার্যকালে ৯৩৪ জনকে এই বৃত্তি পুরস্কার প্রদান করেছে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘ শাহ ওয়ালীউল্লাহ পুরস্কার’ প্রদান শুরু করে । এই পুরস্কারটি সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও ইসলামিক ক্ষেত্রে পণ্ডিতদের অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ দেওয়া হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে সংস্থা টি ‘আই.ও.এস লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ‘ নামে একটি পুরস্কার প্রদান চালু করে । প্রতিবছর কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় জীবনের অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়।

বর্তমানে কলকাতার ৪৫ নম্বর ইলিয়ট রোডে সংস্থার একটি শাখা রয়েছে । ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে ড. মোঃ মনজুর আলম ও ড. মোঃ খলিল আব্বাস সিদ্দিকীর মিলিত উদ্যোগে এই কলকাতা শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতা শাখা এর দিক নির্দেশক ছিলেন এই ড. সিদ্দিকী । তিনি দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে “এ্যনথ্রপলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ” সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ড. সিদ্দিকীর অধীনে এই কলকাতা শাখাটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বিভিন্ন কাজ করে চলেছে যার অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে সংস্থার দিক নির্দেশক হলেন আব্দুল বাসিত ইসমাইল। এ পর্যন্ত এই কলকাতা শাখার উদ্যোগে ১১৫ টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের আলোচনা সভা আয়োজিত হয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সমীক্ষা ও গবেষণার কাজ সম্পন্ন করেছে , সেইসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে একাধিক পুস্তক ।

এভাবেই সংস্থাটি একের পর এক ভিন্নধর্মী গবেষণামূলক কাজ করে চলেছে । তাদের এই নানাধর্মী গবেষণা, প্রকাশনা ও আলোচনা সভা গুলি যেভাবে সমাজের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছে তা প্রকৃতই তাৎপর্যপূর্ণ। পরিশেষে আমাদের এ কথা মানতে হয় যে ‘ইনস্টিটিউট অফ অবজেক্টিভ স্টাডিস’ বর্তমান গবেষণার জগতে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছে এবং সমাজে এক নতুন চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটিয়েছে।

(লেখক- গবেষক,ইতিহাস বিভাগ,আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়,কলকাতা)