গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-১৪)

(পর্ব-১৪)

রিজু মাস্টারের চলার পথটি অত্যন্ত দুর্গম। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাকে চলতে হয়। সামান্য ভুলে মাসুল গুনতে হয় অনেক বেশি। আজ তার চোখদুটি অশ্রুসিক্ত। বুকের মাঝে বাজে অশনি সংকেত। বিষাদ সিন্ধুতে হাবুডুবু খায় সে। সাইক্লোনের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে তলিয়ে যায় অনেক দূরে। দম বন্ধ হয়ে আসে তার। টানা টানা নিঃশ্বাস পড়ে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। মনকে শক্ত করে। ভেঙে পড়লে চলবে না। মাথা তুলে দাঁড়াতেই হবে তাকে। সামলে নেয় নিজেকে। একে একে সব ঘটনা তার চোখের সামনে ভাসে।

সেদিন ভীষণ শীত পড়েছে। কুয়াশায় দূরের কোন জিনিস দেখা যায় না। পৃথিবী যেন লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। বিদ্ঘুটে অন্ধকার
চারদিকে। মাফলার জড়িয়ে এক অপরিচিত যুবক এসে বলল,”আপনি কি রিজু মাস্টার?

……….হ্যাঁ।

………আপনি ?

………আমাকে আপনি চিনবেন না। বাড়ি আমার কলাডাঙ্গা।

………তা এখানে কি দরকার? আর আপনি আমার নামই বা জানলেন কি করে?

-………..স্যার, আপনি মাষ্টার মশায়। আপনার যথেষ্ট সুনাম শুনেছি। আমাদের গ্রামের বকাউল্লা মাষ্টার, খুব বেশি বকে যে, সে তাে আপনাদের স্কুলেই মাষ্টারী করে।

………..ও! আপনি তাহলে ওকে চেনেন ?

………চিনবাে না স্যার! ওদের বাড়িতেই তো আমি মানুষ।

……….. আচ্ছা। ঠিক আছে। আসল কথা বলুন।

………..স্যার, শুনলাম আপনার ভাড়া দেওয়ার মতো একখানা ঘর আছে। আপনি যদি আমাকে দেন তাহলে খুব উপকার হয়।

ভ্রু কুঁচকালেন রিজু মাষ্টার। জিজ্ঞেস করলেন-আপনি কি করেন?

………আজ্ঞে, ড্রাইভার।

………….ড্রাইভার! না ভাই, ঘর ভাড়া হবে না। আপনি আসতে পারেন।

অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে,
……..”স্যার, ড্রাইভার বলেই কি ভাড়া দেবেন না ? আমরাও তাে মানুষ স্যার।”

রিজু মাষ্টার চমকে ওঠেন। ‘মানুষ’ শব্দটি তার অন্তরকে ছুঁয়ে যায়। মানুষের পেছনে ছুটেও তিনি সত্যিকারের মানুষের দেখা অদ্যাবধি খুব কমই পেয়েছেন। সত্যি কারের মানুষের কদর বােঝেন তিনি। চুপ করে থাকেন রিজু মাষ্টার।

……..স্যার! আমি মদ জীবনে ছুঁয়ে দেখিনি। কোন অসৎ অভ্যাস আমার নেই। আপনি আমাকে যে শর্ত দেবেন তাই মেনে নেব। আমাকে ঘরটা ভাড়া দিন স্যার।(হাত জোড় করে দাঁড়ায়)।

………আপনার কে কে আছেন ?

………..তিন ছেলে আমার।

…..……ঠিক আছে, পরে দেখা করবেন।

……..মাষ্টার মশাই, বলছিলাম কি, যদি বলেন তাে আজকেই চলে আসতে চাই।

………আজকেই, এক্ষুনি ?

………হ্যাঁ। আজ ঘর দেখে বাড়ি ফিরব বলে এসেছি। বর্তমানে যেখানে ভাড়া নিয়ে আছি সেখানে এক মুহূর্তও থাকা চলে না। বুঝতেইতাে পারছেন স্যার। বৌ-ছেলে নিয়ে বাস।

লােকটির ব্যবহারে রিজু মাস্টার তখন বুঝতে পারেননি যে এমন সুন্দর ব্যবহারের পেছনে ওর অন্য একটা মতলব আছে। ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহার করে প্রথমেই তাকে দুর্বল করে দিয়েছিল। ফলে, ঐ রাতে তাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে কী বড়ই না ভুল করেছিল সে! আজ মাথার চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছে তার। সে একটা বােকা। না হলে একটা
অজানা, অচেনা লােকের কথায় মুগ্ধ হয়ে,… ………!

না! আর ভাবতে পারেন না রিজু মাস্টার। নিজেকে বড় অপরাধী বলে মনে হয়। এ অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। ছাদের উপর পায়চারী করতে করতে ধপ করে বসে পড়েন।চারদিক অন্ধকার দেখেন। দেখেন, সেই লোকটি যেন বিশ্রী দাঁত বের করে অট্টহাসি হাসছে। সে তাে এটাই চেয়েছিল।

ঘড়িতে যে ১০টা বাজে, স্কুল যাবে না ! মিতা ডাক দেয়। কোনো উত্তর আসে না দেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, কিগাে! অমন করছো কেন? শরীর খারাপ নাকি? খুব ঘেমে গেছো তাে! পাখার বাতাস করতে করতে পাশে বসে মিতা।

একটু আরাম বােধ করে রিজু মাস্টার। স্ত্রীর বন্ধু্ত্বপূর্ণ ব্যবহারের মূল্য তিনি আগে বােঝেননি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছেন। বিপদের সময় স্ত্রী-ই একমাত্র ভরসা। প্রকৃত বন্ধু। মিতার একটা হাত টেনে নিয়ে বুকের উপর চেপে ধরে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি।মিতার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে তুলতুলে গাল দুটিকে সিক্ত করে। ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে রিজুর মাথার অগােছালো
চুলগুলি নেড়ে দেয়। বলে, তুমি কোন চিন্তা কর না, ধৈর্য্য ধর, আল্লাকে ডাকো। নিশ্চয় তিনি সব ঠিক করে দেবেন।

ফ্যাল ফ্যাল করে মিতার দিকে চায় রিজু। মনে হয় এই বিপদের দিনে এমন বন্ধুরাই পারে প্রশান্তির প্রলেপ দিতে। অথচ,জীবনে স্ত্রী ছাড়া তিনি অনেককেই প্রকৃত বন্ধু বলে মনে করেছিলেন। সব ভুল। বন্ধু চিনতে তিনি এতো বড়ো ভুল করলেন? নিজের প্রতি একটা তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হয়। চোখ দুটি বন্ধ করে সােফায় শুয়ে পড়েন। আজ আর স্কুল যাওয়া হয় না তার।

সকাল থেকেই টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। আজ স্কুলে পঞ্চম শেণীর নির্বাচনী পরীক্ষা। অনেক অভিভাবক অফিসে এসে রিজু মাস্টারের খোঁজ করলেন।

বকাউল্লা মাষ্টার একগাল হেসে উঠলেন। চোখ দুটো মােটা করে, ঘাড় বেকিয়ে একটা বিকৃত ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন,রিজু মাস্টার স্কুল আসবেন কোন লজ্জায়! আপনি শােনেননি তার কেলেঙ্কারীর কথা? আপনাদের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াবার মতাে অবস্থা তার নেই, বুঝলেন?

একজন অভিভাবক বলে উঠলেন, রিজু মাস্টারের এমন অবস্থায় আপনাকে তাে বেশ খুশি খুশি দেখছি। আপনি তাে ভদ্র মানুষ! তা ভদ্রতা রক্ষার জন্য কি তার খোঁজ খবর রেখেছেন, না পরের মুখে শুনে, পরচর্চায় কান দিয়ে নিজের ঝাল মেটাচ্ছেন? আর আমি যা জানি, তাতে রিজু মাস্টারের লজ্জার কিছুই লেই। লজ্জা আপনাদের মতাে ভদ্র মানুষদের। যারা ভালো মানুষদের ভালো মানুষীর সুযােগ নিয়ে যড়যন্ত্রে ফেলে আনন্দ উপভােগ করেন, আর সুক্ষ্ম ছিদ্র পেলে আকাশ বিদীর্ণ করেন।

বকাউল্লা মাষ্টার এবার ঘাবড়ে গেলেন। তাহলে কি লােকে তার ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে সব কিছু জেনে ফেলেছে! না, এখানে দাঁড়ানাে ঠিক নয়। দ্রুত শিক্ষক কক্ষে প্রবেশ করেন।

তিনি ভেবেছিলেন এই অবসরে রিজু সম্বন্ধে যত মনের ক্ষোভ আছে সবই উদ্গার করবেন। সেটা আর হল না। বকাউল্লা মাস্টারের মতে অভিভাবক লােকটা বড্ড পাজি। আসলে তার বাড়ি তাে আর কোন ভদ্র গ্রামে নয়। ঐ গ্রামের সব লােকই তাে জন্ম থেকে অভদ্র। তাহলে তারা বকাউল্লা মাষ্টারের মত ভদ্র মানুষের কথা শুনবে কেন! সে না শুনলে কি হবে! শিক্ষকরুমে পান্ডিত্যপূর্ণ বত্তৃতায় গড়গড় করে রিজু মাস্টারের অপবাদের অপব্যাখ্যা করে গেলেন তিনি। অবশেষে এক প্রবীণ শিক্ষকের মৃদু ধমকে মুখ বন্ধ করলেন বাচাল শিক্ষকটি।

নানা লােকের নানান কথা রিজু মাস্টারের কানে আসে। তাদের কথা শুনে কখনও তার হাসি পায়, কখনাে বা কান্না। জীবনটাকেই শেষ করে দিতে ইচ্ছা করে তার। আজ আর সে নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। জীবনে বেঁচে থাকার কোন অর্থ আছে বলে তার মনে হয় না। মান-সম্মান নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। সেটাই তাে তার শেষ হয়ে গেছে। বিরাট চক্রান্তের বেড়াজালে আটকে গেছে সে। কাছের লােকগুলিও অসময়ে দূরের মানুষের মত পালিয়ে মজা দেখছে। সবাই তাকে ভুল ভাবছে। সবাইকে, সবকে যখন সে আজ হারিয়েছে,তাহলে কি হবে বেঁচে থেকে। এ পৃথিবীতে কোনো মুক্তি নেই তার। তাই সে এখান থেকে পালিয়ে যেতে চাইলাে পরপারে। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে দড়িটা বেঁধে নিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে দিলো। এবার নিজেকে শেষ করে অপবাদের হাত থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার পালা। মিতা কোথা থেকে দৌড়ে এসে খাটের নিচে থেকে রিজুর পা দুটো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। ……….”একি! কী করছ তুমি ? তুমি শুধু তােমারটাই ভাবলে!আমার কথা, হাসি খুশির কথা একটি বারও ভাবলে না! তােমার মৃত্যুতেই কি সব অপবাদ মুছে যাবে? তােমাকে বেঁচে থেকে প্রমাণ করতে হবে তুমি নির্দোষ। কিছু স্বার্থাম্বেষী মানুষ তােমার সরলতার সুযােগ নিয়ে আমাদের সর্বনাশ করতে চাইছে। তাছাড়া,তােমাকে আমি তাে ভালোভাবে চিনি, জানি। যে মানুষটা সারা জীবন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এসেছে তার দ্বারা কোন অন্যায় হবে এটা বিশ্বাস তাে দূরের কথা ভাবতেও পারিনা। পৃথিবীর লােক যে যাই বলে বলুক গে। আল্লাহ আছেন। এর বিচার তিনিই করবেন। রিজু মাস্টার গলার ফাঁস খুলে মিতার হাতদুটো চেপে ধরে কান্নায় ফেটে পড়েন।

……….”এই অপবাদের বোঝা আমি যে আর বইতে পারছিনা মিতা। আমি কী করবো বলো! মৃত্যু ছাড়া আমার আর কোনো পথ যে খোলা নেই!”

নাবালিকা নিষ্পাপ দুই কন্যা হাসি আর খুশি একবার পাপার দিকে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বােঝাতে চায়, পাপা তুমি মরে গেলে আমাদের কি হবে! রিজু
মাষ্টার কন্যাদ্বয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা ছেলের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন! বলেন, নারে! আমি তােদের ছেড়ে মরতে চাইনা! আমি বাঁচতে চাই! আমি বাঁচতে চাই!

দুই মেয়ে হাসি খুশি তাদের নরম হাত দিয়ে পাপার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি মুছে দেয়। তাদেরও চোখের কোণ জলে ভরে ওঠে।