গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-১৯)

(পর্ব-১৯)

রাজনৈতিক পালাবদলের পর “বদলা নয় বদল চাই” শ্লোগানের সবুজ সরকার শিক্ষকদের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। লাল সরকারের আমলে শিক্ষকদের বেতন মাসের কোন তারিখে হবে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। চাকরিতে বদলির সুযোগ ছিল না। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই মাস পয়লা বেতন চালু করে। শিক্ষকদের সাধারণ বদলি চালু হয়। তারা বাড়ির কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। রিজু মাস্টার সেই সুযোগ গ্রহণ করার জন্য আবেদন করেন। ওর ইচ্ছা ছিল বাড়ির কাছাকাছি ডোমকল বিটি উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার। রিজুর বাবা নিষেধ করেন। বলেন, ” তুমি বাইরে আছো, সম্মান আছে। কাছে আসার দরকার নেই।”

বাবার কথা শুনে পূবের সোনালী সূর্যোদয়ের আলোকোজ্জ্বল কিরণে লাল হয়ে ওঠা মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে যায়।

…………কি গো, কী হলো? মিতা জিজ্ঞেস করে।

……….আমি ডোমকল যাই আব্বা চাননা।

………..আমি তোমাকে বলেছি না কতবার, তোমাকে ওরা ভালোবাসেনা। তুমি জোর করে ওদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে যাও। তোমার আব্বা চাননা তুমি ওখানে যাও। তার ধারণা, তুমি ডোমকল গেলে বাড়ির ভাগ নেবে। ঐ বাড়ির ভাগ তোমার আব্বা তোমাকে দিতে চাননা তুমি বুঝোনা?

…………তুমি কী যে বলো! আমার বাড়ির ভাগ চাইনা। আমি আব্বার ভালবাসার ভাগ চাই। আব্বার বয়স হয়েছে। বাড়িতে একসাথে থাকলে আব্বা মার যত্নটা নিতে পারতাম। সব ভাই মিলে একত্রে থাকার মজাটাই আলাদা। কিন্তু আমার সম্মানের কথা ভেবেই আব্বা ওকথা বলছেন। এখানেই ভালো আছি গো। এখান থেকেই বাড়ির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারি এমন স্কুল ঠিক করতে হবে।

আসলে রিজু বরাবরই বাবার অনুমতি ছাড়া কোনো কাজই এযাবৎ করেনি। রিজু মনে করে সন্তানের জন্য এর মধ্যেই মঙ্গল রয়েছে।

শিক্ষা দফতরের ওয়েবসাইট ঘেঁটে রিজু বহরমপুর-ডোমকলের মাঝামাঝি একটা স্কুল পেল। হ্যাঁ, এই স্কুলটা পেলেও বাড়ির সঙ্গে দিব্যি যোগাযোগ রাখা যাবে। মাধ্যমিক স্কুল। ফাঁকা সময়ে একবার স্কুল ঘুরে আসে রিজু। একেবারে মেন রাস্তার পাশে। অথচ চোখেই পড়েনি এতদিন। এলাকায় সংখ্যালঘু ও নিম্ন বর্গের মানুষের বসবাস। মানুষজন বেশ ভালো বলেই মনে হলো। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী স্কুলের উন্নতি তেমন নেই। কয়েকবছর আগে জুনিয়র হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুলে পরিণত হয়েছে। জন্মলগ্ন থেকেই হেডমাস্টার নেই। একজন এসেছিলেন, কিছু দিন পর তিনি স্কুল ছেড়ে চলে যান। অনেকেই বলেন, তিনি নাকি চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় লালপার্টির বেকার যুবতীরা দীর্ঘদিন অক্লান্ত শ্রম দান করে স্কুলটি গড়েছেন। তারাই স্কুলের শিক্ষক এবং হর্তাকর্তা। সুতরাং এখানে অন্য কেউ হেডমাস্টার হয়ে এসে মাতব্বরি করবেন এটা লালপার্টির স্থানীয় শিক্ষকরা মেনে নিতে পারেন না। ফলে স্কুলের উন্নতি তথৈবচ।

রিজুকে এসব ভাবিত করে না। দীর্ঘ কুড়ি বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি এখানে তো আর মাতব্বরি করতে আসবেন না। আসবেন আদর্শ স্কুল গড়তে। তার শিক্ষার সবটুকুই ছাত্র ছাত্রীদের নিংড়ে দিয়ে তাদের মানুষ করতে। তাদের আদর্শ শিক্ষক হতে। আদর্শ শিক্ষকের ছত্র ছায়ায় শিক্ষার্থীরা আদর্শ নাগরিক হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। তারা শিক্ষকদের মান্যতা দেবে। শিক্ষকদের সম্মান বাড়বে। বাড়বে স্কুলের সম্মান।অনেক কিছু করার আছে এখানে।এই স্কুলটা যদি পান তাহলে স্কুলটাকে তিনি একদিন স্বপ্নের স্কুল বানাবেন।

চিঠি আসার আগেই রিজু মাস্টার ভেড়ামারা স্কুল ছেড়ে চলে যাবেন এই খবর ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । দশম শ্রেণীর ছাত্র এরসাদ দ্রুত শিক্ষক কক্ষে প্রবেশ করে রিজু মাস্টারের পা চেপে ধরে।ও কান্নায় ফেটে পড়ে। না কিছুতেই যেতে দেবে না তাদের প্রিয় শিক্ষককে। ওর কান্না দেখে,ওর ভালবাসায় রিজু মাস্টারের চোখে জল এসে যায়।

………বলুন স্যার, আপনি আমাদের ছেড়ে যাবেন না! বলুন স্যার! কথা দিন! কথা দিন স্যার!

……..…পা’টা ছেড়ে দে এরসাদ। পাগলামী করিস না। কে বলেছে তোকে আমি তোদের ছেড়ে চলে যাবো?

মুখ তুলে এরসাদ বলে, সত্যিই স্যার! আপনি যাবেন না তো? চোখে মুখে আনন্দের ছাপ।

অন্যান্য শিক্ষকরা ছাত্রটিকে আশ্বাস দেন। না,না। স্যার এখন যাবেন না। চিঠিই তো আসেনি এখনো। তোরা শান্ত হো। তোদের এই ভালবাসা ছেড়ে স্যার কখনো কি যেতে পারেন?

পা ছেড়ে দেয় এরসাদ। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে রিজু মাস্টার।বলে, তোদের ছেড়ে কি আমি থাকতে পারি রে! আবেগে গলা ভারি হয়ে আসে রিজুর।

স্কুল প্রাঙ্গণে তখন একটি নবম শ্রেণীর একটি ছাত্রীকে নিয়ে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রীর জটলা পেকেছে। ছাত্রীটির কান্নার কারণ জানতে কয়েকজন শিক্ষক ছুটে যান। রিজু মাস্টারও। রিজু মাস্টার জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে রে বিউটি? তুই কাঁদছিস কেন? কেউ কি তোকে কিছু বলেছে?

স্যারের দিকে মুখটি তুলে ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে ও আবার কাঁদতে শুরু করে। ওর মাথায় হাত রাখে রিজু মাস্টার। হঠাৎই রিজু মাস্টারের পায়ে পড়ে বলে, স্যার আপনি নাকি আমাদের স্কুল ছেড়ে চলে যাবেন! আপনি যাবেন না স্যার!

কান্নার আসল রহস্য উদঘাটন হয়।রিজু মাস্টার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ধূর পাগলী! তোকে এসব কে বললো?

সবাই তো বলছে স্যার, আপনি অন্য স্কুলে চলে যাবেন। না স্যার, আপনি যাবেন না স্যার! আমরা আপনাকে ছেড়ে থাকতে পারবোনা স্যার! সবাই চেঁচিয়ে বলে আপনি আমাদের স্কুল ছেড়ে যাবেন না স্যার!

রিজু মাস্টার অবাক হন। এতো ভালবাসা ওর প্রতি। তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন! বলেন, না,না! আমি যাবো না তোদের ছেড়ে!

এরপর তিনি নিজেকে সামলাতে না পেরে ছুটে গিয়ে শিক্ষকদের ঘরে ঢুকে যান! রুমাল বের করে সিক্ত চোখের কোণটা মুছে নেন।

সহকর্মী ইউসুফ বলেন, স্যার, একজন শিক্ষকের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের এতো ভালবাসা আমি কোথাও দেখিনি। শিক্ষক হিসেবে আপনি সার্থক। স্কুল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি ওদের কথা একবার বিবেচনা করবেন। এদের ছেড়ে গেলে আপনি খুব ভুল করবেন স্যার! আপনার নিজের হাতে সাজানো এই সংসারে আপনার অনুগত আমরা। কত কষ্ট,কত লড়াই করে স্কুলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপনার অবর্তমানে বাংলা বিভাগটাও দুর্বল হয়ে পড়বে। আপনার হাল কে ধরবে স্যার?এই স্কুল আপনি ছাড়বেন না স্যার।

……… ইউসুফ! তোমরা সবাই মিলে কী শুরু করেছো বলো তো? রেকমেন্ডেশন লেটার আসলো না আর এসব বলে আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছো। আদৌ হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটাই জানলাম না তার আগেই এতো কিছু হয়ে যাচ্ছে। আমি এই স্কুলে যোগ দিয়েছিলাম আরবি পোস্টে। বাংলা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি থাকায় তখনকার পরিচালন কমিটি স্কুলের স্বার্থে আমাকেই নিয়েছিলেন। বাংলার জন্য তোমরা তো আছো!

…….. তবুও আপনার হাত ধরার মতো এখনো আমরা কেউ হতে পারিনি স্যার। আপনি যে স্কুলে যাবেন সেই স্কুলের ভাগ্য খুলে যাবে।

রিজু মাস্টার আর কথা বাড়ায়না।ওরা একটু বেশিই বলে। লজ্জা পেয়ে তিনি মাথা নিচু করেন।

পরের দিন একাদশ শ্রেণীর শর্মিষ্ঠা অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয় ডাক্তার দেখিয়ে রিজু মাস্টার তার মোটরসাইকেলে তুলে তার বাড়িতে পৌঁছে দেন। ছাত্রীটির বাবা চা না খাইয়ে ছাড়েন না। কথায় কথায় বাড়ির এক বৃদ্ধ রিজু মাস্টারকে বলেন, “স্কুলে রিজু মাস্টার আছে বলেই স্কুলটা ভালো চলছে। আমরা ঐ মাস্টারের ভরসাতে ছেলে মেয়েদের পাঠায়। আগে তো পরিবেশ খুব খারাপ ছিল। রিজু মাস্টার আসার পর অনেক লড়াই করে এখন সব ঠিক আছে। শুনেছি ঐ মাস্টার নাকি স্কুল থেকে চলে যাবে। স্কুলটা নষ্ট হয়ে যাবে আবার। আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।”

রিজু মাস্টার জিজ্ঞেস করে, আপনি চেনেন রিজু মাস্টারকে?

………..চিনিনা। তবে উনার নাম শুনেছি। আমি বাবা বৃদ্ধ মানুষ।চোখেও তো ভালো দেখতে পায়না। তাই স্কুলে যাওয়া হয়না। আজকে নাতনীটার অসুখ হয়েছে বলে আপনি এসেছেন। তাই একটু কথা বলতে পারছি।

রিজু মাস্টার নিজের প্রশংসা শুনে পুলকিত হোন। ভাবেন, একজন অশীতিপর বৃদ্ধ সে তাকে কোনদিন দেখেনি অথচ তার সম্বন্ধে অনেক খবরই রাখেন।

শর্মিষ্ঠা বলে, দাদু! এইটাই তো রিজু স্যার!

বৃদ্ধ হাত বাড়িয়ে রিজু মাস্টারকে আশীর্বাদ করেন। বলেন, বাবা, তোমাকে দেখিনি কোনোদিন কিন্তু তোমার নাম অনেক শুনেছি। তুমি খুব লড়াকু ছেলে। স্কুলের জন্য আমরা অনেক কিছু করেছি কিন্তু স্কুলে আমাদের জন্য বলার কেউ ছিল না। তুমি এসেছো বলে আমাদের ঘরের ছেলে মেয়েদের অনেক আশা। বাবা তুমি স্কুল ছেড়ে যাবে কেন? এই এলাকার বাচ্চারা যারা এখনো স্কুলে যায়নি তাদের মুখেও তোমার নাম শুনতে পাবে। তোমাকে না দেখলেও সবাই তোমাকে চেনে। তুমি এলাকার মানুষের হৃদয়ে গেঁথে গেছো বাবা।এই স্কুলটা ছেড়ে যেওনা তুমি। এই বুড়োর কথাটা শুনো।

শর্মিষ্ঠা বলে ওঠে, আমরা যেতে দিলেই তো স্যার যাবেন। অন্য স্যার যাবেন যাক, আমরা এই স্যারকে কিছুতেই যেতে দেবোনা।

চা পান শেষ করে রিজু মাস্টার বৃদ্ধকে নমস্কার জানিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেন। আল্লাহকে অশেষ শুকরিয়া জানান। আল্লাহ যেন তাদের ভালোবাসার সম্মান রাখার ক্ষমতা দেন।

রিজু মাস্টার চলেই যাচ্ছেন এতদিনে এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে। রেকমেন্ডেশন লেটার চলে এসেছে।বারো ক্লাসের একদল ছাত্র এসে রিজু মাস্টারকে অনুরোধ করে যেন স্যার তাদের ছেড়ে চলে না যান। ছাত্রদলের নেতা আকাশ, সবুজ,জুয়েল এগিয়ে এসে বলে, আপনি চলে যাওয়ার আগে আমাদের সবার নামে আপনার হাত দিয়ে টিসি লিখে দিয়ে যাবেন স্যার।

সুমন বলে উঠল, আপনি চলে যান, যাওয়ার আগে আমাদের বিষ দিয়ে যাবেন। আপনার সামনেই আমরা বিষ খাবো।

রিঙ্কু বললো , আমাদের লাশের উপর দিয়ে আপনাকে যেতে হবে স্যার। আমাদের কথা আপনি শুনুন স্যার। জোড় হাত করছি স্যার আপনি যাবেন না।

ওদিকে গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক জানিয়ে দিয়েছেন, স্যার যেদিন স্কুল ছেড়ে যাবেন সেদিন স্কুল ঘেরাও হবে। রিজু মাস্টারকে ওরা কিছুতেই ছাড়বেন না। তাতে যতদূর যেতে হয় যাবেন তারা।

রিজু মাস্টার প্রমাদ গুনে। বেশি জানাজানি করে যাওয়া যাবেনা। তাহলে আর যাওয়াই হবে না। কিন্তু রিজু মাস্টারের জেদ উনি স্কুল ছাড়বেনই। না হলে শেষ বয়সে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন কী করে? যদিও ছাত্র ছাত্রীদের মায়া ভরা মুখ গুলো বারবার ভেসে উঠছে তার চোখে। তাদের করুণ আর্তি রিজু মাস্টারের বিবেককে ক্ষত-বিক্ষত করছে। তাদের কথা চিন্তা করে রাতে ঘুম আসছেনা। তার প্রিয় সন্তান সম ছাত্র ছাত্রীদের ছেড়ে চলে আসার কথা ভেবে কান্নায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের মধ্যে একটা হাহাকারের ড্রাম বেঁজে চলেছে। তবুও তিনি স্কুল ছাড়বেনই। মাথায় যেন তার ভূত চেপে ধরেছে।

স্কুলে তখন বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ছাত্র ছাত্রীদের আনাগোনা কম।এটাই মোক্ষম সুযোগ। ফোন করে হেডমাস্টার মশাইকে রিলিজ লেটার রেডি করে রাখতে বলেন। যে পথে তিনি রোজ স্কুল যান আজ সেই পথে না গিয়ে উল্টো পথ দিয়ে সবার অলক্ষ্যে স্কুল থেকে রিলিজ লেটার নিয়ে স্কুলকে বিদায় জানান।

………স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলেন, ভালো থেকো আমার প্রিয় ছাত্র ছাত্রীরা! ভালো থেকো আমার জীবনের প্রথম প্রেম, আমার সাধের বিদ্যালয়! এই ভাবে তোমাদের ছেড়ে চলে আসার জন্য আমাকে ক্ষমা করিও!” রিজু মাস্টারের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
দীর্ঘ কুড়ি বছরের সঙ্গী ভেড়ামারা হাই স্কুলকে বিদায় জানিয়ে চোরের মতো লুকিয়ে এলাকা ছাড়েন রিজু মাস্টার।