টিডিএন বাংলা ডেস্ক: হাথরাস এবং বলরামপুর গণধর্ষণ কাণ্ডের ভয়াবহতার পর বিগত কয়েক বছরের ভারতবর্ষে দলিতদের অবস্থা যে কতটা সংকটজনক হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গোটা বিশ্বের কাছে। দলিতদের ওপর লাগাতার বেড়ে চলা অত্যাচারের প্রতিবাদে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন ২৩৬ জন বাল্মিকী দলিত। ১৯৫৫ সালে ড: বি আর আম্বেদকর স্থাপিত “বুদ্ধিস্ট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া”র তরফ থেকে তাদের ধর্মান্তরিত হওয়ার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

বুধবার, উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের করহেরা গ্রামে ভারতীয় সংবিধানের জনক ডঃ বি আর আম্বেদকরের নাতির ভাইপো তথা “বুদ্ধিস্ট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া”র সভাপতি রাজরত্ন আম্বেদকরের নেতৃত্বে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের উপস্থিতিতে ধর্মান্তরিত হলেন বলরামপুর গণধর্ষণকাণ্ডের নির্যাতিতার পরিবার সহ ২৩৬ জন বাল্মিকী দলিত। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ধর্ম পরিবর্তনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক দিন ১৪ অক্টোবর। এই দিনটিকে ইতিহাসে “ধর্মচক্র পরিবর্তন” দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৬ সালে এইদিন বাবাসাহেব আম্বেদকর ভারতবর্ষে দলিতদের উপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে একমাত্র পথ হিসেবে কয়েক হাজার দলিতদের নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

দলিতদের ওপর হয়ে চলা অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদে নেওয়া এই পদক্ষেপ সম্পর্কে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম “মিডিয়া ইন্ডিয়া গ্রুপে”র কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডাক্তার বি আর আম্বেদকরের নাতির ভাইপো রাজরত্ন আম্বেদকর জানান,”দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য অবশ্যই উদ্বেগজনক। ২০১৪ সাল থেকে অপরাধ ও নৃশংসতা বেড়েছে।হাথরাস ও বলরামপুরে দলিত মহিলাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ধর্ষণের মামলার পরে দলিতরা আগের চেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন বোধ করতে শুরু করেছে। বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরের চাহিদা দেশজুড়ে, বিশেষত উত্তরপ্রদেশে বহুগুণ বেড়েছে। দলিত সম্প্রদায় এবং অন্যান্য তফসিলি বর্ণের লোকেরা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ এবং বৌদ্ধধর্মকে মুক্তির কাজ হিসাবে গ্রহণ করার এবং ভয় ও নিপীড়নের চক্রাকার প্রকৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে বেছে নিচ্ছেন।”

তিনি আরো বলেন,”পুলিশ এবং কর্তৃপক্ষ রাজ্যের সমস্যার একটি অংশ। সকল স্তরে উচ্চ-বর্ণের আধিপত্য রয়েছে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে, তারা নিচু বর্ণের মানুষদের উপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে চোখ বন্ধ করে নেন এবং কখনও কখনও হাতরাসের ঘটনার মতো নিজেরাও অত্যাচারীর ভূমিকা গ্রহণ করেন।”

বুধবার, বলরামপুর গণধর্ষণকাণ্ডের নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করতে পারলেও পুলিশ এবং প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা হাথরাসের পরিবার ধর্মান্তরিত হতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে রাজরত্ন আম্বেদকার বলেন,”বলরামপুর ধর্ষণের শিকার পরিবারের সদস্যরাও ভয় ও নিপীড়নের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, কারণ তারা অনুভব করেছিলেন যে এটাই তাদের পক্ষে একমাত্র উপায়। এমনকি হাথরাসের নির্যাতিতার পরিবারও ধর্মান্তরিত হতে পারে তবে তারা কর্তৃপক্ষের চরম চাপ ও অবিচ্ছিন্ন নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।”

তবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেই যে সঙ্গে সঙ্গে দলিতদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন এবং সমাজের নিচু দৃষ্টিভঙ্গি শেষ হয়ে যাবে তা নয়। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজরত্ন আম্বেদকর আরো বলেন,”যদিও দলিতদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা তাৎক্ষণিকভাবে ধর্মান্তরের পরে থামবে না, তবে এই পদক্ষেপ নিজেই একপ্রকার ক্ষমতায়ন। দলিতদের পক্ষ থেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে ধর্মান্তরকরণ অত্যাচারীর আধিপত্যের মূল পক্ষে একটি চ্যালেঞ্জ। উত্তরপ্রদেশে দলিতদের সাম্প্রতিক গণ ধর্মান্তরকরণ হ’ল জাতি দ্বারা আধিপত্য বিস্তার এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বিপ্লব যা, তাদের ওপর সমাজ চাপিয়ে দিচ্ছে।”

হাথরাসের নির্যাতিতার ওপর হওয়া নৃশংস গণধর্ষণ এবং তাঁর মৃত্যুর পর উত্তর প্রদেশে পুলিশের তরফ থেকে তড়িঘড়ি মাঝরাতে পেট্রোল জ্বালিয়ে নির্যাতিতার অন্তিম সংস্কার করার ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। সারা দেশজুড়ে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, মহিলা সংগঠন, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করা হয়। বহু মানুষ শামিল হন মৌন মোমবাতি মিছিলে। প্রথমে হাথরাস তারপর বলরামপুর। হাথরাসের নির্যাতিতা ও তাঁর পরিবারের ন্যায়ের দাবীতে সারা দেশ জুড়ে একের পর এক আয়োজিত হয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদী মিছিল। এমনকি এই ঘটনায় প্রশাসনিক শক্তির অপব্যবহার এবং দলিতদের ওপর বেড়ে চলা অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে যোগী আদিত্যনাথের পদত্যাগের দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা।

উত্তরপ্রদেশে দলিতদের ওপর হয়ে চলা অত্যাচারের ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশে দলিতদের করুণ পরিস্থিতির ইতিহাস। এ সম্পর্কে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম “মিডিয়া ইন্ডিয়া গ্রুপে”র কাছে শশীকান্ত এম যাদব নামে এক ব্যক্তি বলেন,”আমরা যতই পড়াশোনা করি, কাজ করি বা বিদ্রোহ করি না কেন, উচ্চ বর্ণের লোকেরা আমাদের তুচ্ছ করে আমাদের নিকৃষ্টমানের মানুষ বলে বিবেচনা করে। আমাদের মনে হয় যে আমরা সমাজ বা দেশের সমান নাগরিক নই। সাম্প্রতিক হাথরাস ধর্ষণ মামলা হোক বা দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যান্য ঘটনা হোক, আমরা প্রতিদিন এবং প্রতিটি জায়গায় দুর্ভোগ পোহাতে থাকি।”