দেবিকা মজুমদার, টিডিএন বাংলা: এবার আর বিরোধী দল নেতাদের নিশানায় নয়, ডক্টর কাফিল খান মামলায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ নাগরিকের রোষের শিকার হল উত্তরপ্রদেশ সরকার এবং ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন।ডক্টর কাফিল খানের বিষয়ে ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কেন নীরব রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। রবিবার জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী উমর খালিদ এ বিষয়ে প্রশ্ন করে টুইট করেন,”ভারতের শ্রেষ্ঠ ডক্টর দের মধ্যে একজনের প্রতি এ ধরনের নির্লজ্জ অবিচার হওয়ার পরও কেন এই বিষয় নিয়ে নীরব রয়েছে ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন?”

উমর খালিদ এই টুইট করার পরে তাঁর সমর্থনে একের পর এক টুইটার ব্যবহারকারীদের এ বিষয়ে মন্তব্য উঠে আসতে থাকে। অনেকেই উমর খালেদকে সমর্থন জানিয়ে উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আবার কেউ কেউ ইন্ডিয়ান মেডিকেল কাউন্সিল সম্বন্ধে লিখেছেন “আই এম এ পেশাদারি ব্যক্তিদের সংগঠন কোন সমাজকর্মীদের নয়।”পাশাপাশি ওমর খালিদের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে মুস্তফা কামাল বার ভুঁইয়া নামে অপরাধ টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, “# ডক্টরকাফিল এরওপরঅত্যাচারবন্ধকরো”। অপর এক টুইটার ব্যবহারকারী মুস্তাফা খান পাঠান লেখেন,”প্রশ্ন উঠছে, দিল্লিতে ভোটের সময় আপ সরকার এর জন্য রাস্তায় ভোট চাইতে দেখা গিয়েছিল ডঃ কাফিল খান কে। বিহারে কানাইয়া কুমার এর জন্য ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন ডক্টর কাফিল খান। চন্দ্রশেখর আজাদ এর সঙ্গেও তাঁকে দেখা গিয়েছে। কিন্তু আজ ওনার সাথে কে আছে? মুসলিম ভোট সংগ্রহকারী দল সপা-বিএসপিও নেই। এটা আপনার আওয়াজ।#ডক্টরকাফিলেরওপরঅত্যাচার_ বন্ধ_করো”। অহনা পাঠক নামে অপর এক টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন,”ডক্টর কাফিল কে অতি শীঘ্র মুক্তি দেওয়া হোক, তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন।”দিনেশ কুমার লিখেছেন,”আজকের দিনে কোন সংগঠনই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নয়। যদি কোন সংগঠন স্বতন্ত্র হয় তাহলে তার শীর্ষে যে আছে সে স্বতন্ত্র নয়।”

অপরদিকে খালিদের এই মন্তব্যের জন্য অনেকেই তাঁকে পাল্টা আক্রমণ করেছেন। ডক্টর কাফিল খান কে ভারতের শ্রেষ্ঠ ডাক্তার দের মধ্যে একজন বলার জন্য মনীষ শর্মা নামে এক টুইটার ব্যবহারকারী লেখেন, “একজন নকশাল আরেকটি নকশাল ব্র্যান্ড কে সাপোর্ট করছে।”

প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগেই ডঃ কাফিল খান-এর একটি ভিডিও বার্তা সোশ্যাল-মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও বার্তায় তাঁকে বলতে দেখা গেছে তিনি জেল যেতে ভয় পান না কিন্তু তার পরিবারের লোকজন তাঁকে নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। তাঁকে জেলে মেরে ফেলা হতে পারে বা এটা বলা হতে পারে যে তিনি সুইসাইড করেছেন, কিংবা এটা দেখানো হতে পারে যে তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাই তাঁকে এনকাউন্টার করা হয়েছে। ডঃ খানকে নিজের মৃত্যু নিয়ে এ ধরনের সম্ভাবনার কথা বলতে শোনা গেছে ওই ভিডিও বার্তায়। ভিডিওটির শেষে ডঃ খান আরও বলেন যে তিনি এটা স্পষ্ট করে দিতে চান তিনি এতটা কমজোর নন যে তিনি আত্মহত্যা করবেন।”আমি কখনই আত্মহত্যা করব না। আমি এখান থেকে পালাতে ও যাচ্ছি না যে আমাকে ওরা (পুলিশ) মেরে ফেলবে।” এর আগেও মথুরা জেলের নারকীয় পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে চিঠি লেখেন ডঃ কাফিল খান। যদিও সেই চিঠির কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন মথুরা জেলা সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট শৈলেন্দ্র মৈত্রী। তিনি বলেন জেলের বাইরে যাওয়া সমস্ত চিঠি তাঁরা বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। অপরদিকে তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ওই চিঠি ১৫ জুলাই কাফিল খান জেল থেকে লিখেছিলেন এবং তা পোস্টের মাধ্যমে তার পরিবারের হাতে এসে পৌঁছায়।

উল্লেখ্য ২০১৯ সালের ১৩ই ডিসেম্বর আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করে উস্কানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। ওই এফআইআরের ভিত্তিতে এই ঘটনার ৪২ দিনের মাথায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স তাঁকে গ্রেফতার করে। যদিও ডঃ কাফিল খান-এর এই জেলযাত্রা প্রথমবার নয়, এর আগেও ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরে বিআরডি হাসপাতালে ৬০ জনেরও বেশি শিশু মৃত্যুর জেরে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। সে সময় ওই হাসপাতালের শিশু বিভাগের দায়িত্বে থাকা কাফিল খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি অন্যান্য হাসপাতাল থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন। পরে আরো অভিযোগ ওঠে যে বিআরডি হাসপাতাল থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার চুরি করে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা চালাচ্ছিলেন কাফিল খান। আর সেই কারণেই হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ঘাটতি তৈরি হয়। যার জেরে মৃত্যু হয় ওই শিশুদের। যদিও পরে এই ঘটনায় ডঃ কাফিল খান কে ক্লিনচিট দেয় উত্তরপ্রদেশ সরকার। এরপর আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি মঞ্চে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করে আপত্তিজনক মন্তব্য করার জন্য গ্রেফতার হন ডঃ কাফিল খান। এই ঘটনার পর তাঁর আইনজীবীরা আর্জি শুনে গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে জেল থেকে মুক্ত করার নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু, উত্তরপ্রদেশ সরকার ডক্টর কাফিল খানকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী দোষী ঘোষণা করে।

এরপরই দিন চারেক আগে, ডক্টর কাফিল খানের ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও বার্তা সামনে আসে। তারপর থেকেই ডঃ কাফিল খান মামলা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়।