টিডিএন বাংলা ডেস্ক : পুলওয়ামা কাণ্ডের ঠিক ১২ দিনের মাথায় এক ডজন মিরাজ-২০০০ ফৌজি বিমান সীমান্ত অতিক্রম করে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিতে পালটা হামলার পর সরকারিভাবে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি গুড়িয়ে দেবার ঘোষণা করা হলেও, ঠিক কতজন সন্ত্রাসবাদীর মৃত্যু হয়ে‍‌ছে সুনির্দিষ্টাভাবে ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু তা করা না হলেও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নানা সূত্রে মৃতের সংখ্যা কম করেও ৩০০ হবে বলে উল্লেখ করেছে। এতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পেশি ফুলিয়ে আস্ফালন করতে শুরু করেন। পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী হানায় ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যুর খবরে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে মোদী আসরে নেমে পড়েন। এতগুলি জওয়ানের মৃত্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও শোক প্রকাশ তো দূরের কথা, বিভিন্ন জনসভায় তিনি প্রতিবেশী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পালটা হানার জিগির তুলে দেন। এতজন জওয়ানের মৃত্যুতে তাঁর জনসভার সূচি কিংবা অনুষ্ঠানসূচি স্থগিত করাতো দূরের কথা, একের পর এক সভায় যুদ্ধের জিগির চালিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর চোখে মুখে শোকের ভাব লক্ষ্য করা যায়নি।
সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে জওয়ানদের মৃত্যুতে তাঁর কোনও কর্মসূচি তো স্থগিত ছিলই না, উলটে তাঁকে জিম করবেট উদ্যানে প্রচারের শুটিংয়ে দেখা গেছে। জওয়ানদের মৃত্যুতে শোক নয়, মোদীর আত্মপ্রচারই হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতসব ঘটনাবলীর পরেও মোদী আমোদেই তাঁর কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। এ তো গেল একদিক। অপরদিকে বায়ুসেনারা দক্ষতার সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর সেই কৃতিত্ব নিয়ে মোদীর পরাক্রমকে বারবার তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। যেন সমস্ত কৃতিত্বের অধিকারী তিনি। শুধু মোদীই নয়, সেনাদের নিয়ে মন্ত্রী ও নেতাদের পুরোদস্তুর রাজনীতি এখন দেশবাসীর কারও চোখ এড়াচ্ছে না। কিন্তু পাকিস্তানের মাটিতে বায়ুসেনার একজন পাইলটের আটকের খবরে তাঁর ৫৬ ইঞ্চির ছাতিতে বেশ ভালোই ধাক্কা লেগেছে। তাই বলে তিনি দমে যাননি। যে পেশি ফুলিয়ে তিনি আস্ফালন চালিয়ে যাচ্ছিলেন বায়ুসেনার পাইলট পাক কবজায় থাকা সত্ত্বেও, তা অব্যাহত ছিল। শুধু তাই নয়, পাইলটকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও প্রচারের শীর্ষে এনে দেশপ্রেমের ভাবাবেগ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
পাক সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, ভারতকে শান্তির বার্তা দিতেই মুক্তি দেওয়া হচ্ছে পাইলটকে। শুক্রবার রাতে ওয়াঘা সীমান্তে ভারতের হাতে পাইলটকে ভারতীয় অফিসারদের কাছে হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান। কিন্তু এরপরও যুদ্ধ জিগিরের রাস্তা থেকে সরতে রাজি নন মোদী। লক্ষণীয় বিষয়, মোদীর এই জিগিরের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে দেশের এক অংশের সংবাদমাধ্যম। ভারতের মানুষের কাছে এসব সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অজানা নয়। কিন্তু দে‍শের সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে খবর সম্প্রচার, আলোচনা ও সঞ্চালন পদ্ধতি নিয়ে এখন বিদেশি মিডিয়ায়ও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ভারতের সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা এখন প্রশ্নের মুখে। বেশ কিছু বিদেশি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে কয়েক বছর ধরেই এখানকার চ্যানেলগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত-পাক সীমান্ত সংঘাত নিয়ে যুদ্ধের আবহ তৈরিতে চ্যানেলগুলি আগ বাড়িয়ে বিভিন্ন ঢঙে খবর প্রচার করে চলেছে।
শাসকদল বিজেপি যে কায়দায় যুদ্ধের জিগির তোলার চেষ্টা করছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারতীয় চ্যানেলগুলির প্রচারের ভূমিকাও যেন একই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ প্রচার, আলোচনার হিড়িক দেখলে মনে হবে টিভি স্টুডিওকেই যেন রণাঙ্গন বানানো হয়েছে। ভারতীয় টিভির সঞ্চালকদের কথাবার্তা শুনে মনে হ‍‌বে দেশপ্রেমে তারা উদ্বেল হয়ে উঠেছেন। আলজিজিরা টিভি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান-এর মতো সংবাদপত্র ও টিভিতে বর্তমান ভারতীয় সাংবাদিকতা নিয়ে বিদ্রূপ ও কটাক্ষের ঝড় বইছে। একটি বিদেশি কাগজ উল্লেখ করেছে, পঞ্চশীলের প্রবক্তা ভারতের মতো শান্তিকামী দেশে যখন ‘যুদ্ধ চাই’ বলে জিগির তোলা হচ্ছে, তখন তথাকথিত ‘যুদ্ধবাজ’ প্রতিবেশী দেশে শান্তি মিছিল বের হচ্ছে। আশ্চর্যের ঘটনা হচ্ছে এটাই। এসবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে শাসকদলের গোটা বাহিনী যুদ্ধ জিগিরের পাশাপাশি ভোটের ময়দানে নেমে পড়েছে। আর তাদেরই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম সেনাদের কৃতিত্বকে আড়াল করার চেষ্টায় মোদীর তথাকথিত পরাক্রমকে বারবার উজ্জ্বল করে তোলার চেষ্টা করছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ‍‌বিদ্রূপ দেখে এদে‍‌শের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কি কোনও পরিবর্তন হবে? সূত্র: গণশক্তি