দেবিকা মজুমদার, টিডিএন বাংলা: করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে জারি হওয়া দীর্ঘ লকডাউনের জেরে বন্ধ থেকেছে সমস্ত কল কারখানা, শিল্প, উৎপাদন এবং যোগাযোগ। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের অর্থনীতিতে। যার ছায়া থেকে বাঁচতে পারেননি মাতৃ প্রতিমার রূপকার মৃৎশিল্পীরা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা। বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোর পাশাপাশি এবছর মায়ের বিদেশযাত্রার ওপরেও পড়েছে করোনার ছায়া।

টিডিএন বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুমোরটুলির প্রখ্যাত শিল্পী মিন্টু পাল জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় বিদেশে এবছর ফাইবারের প্রতিমা কম গেছে। অন্যান্য বছর যেখানে দেড়শ থেকে দুশো প্রতিমা বিদেশের বিভিন্ন দেশে যেমন ফ্রান্স ইউকে জার্মান কানাডা এমনকি বেজিংয়েও পাড়ি দেয়। এবছর সেই পরিমাণের মাত্র ৩০ থেকে কুড়ি শতাংশ প্রতিমাই বাইরে গেছে। এবছর অর্ডার কম এসেছে। এর কারণ বলতে গিয়ে মিন্টু পাল বলেন, সাধারণত প্রতিবছর জানুয়ারি কিংবা ডিসেম্বর মাসেই অনলাইনে বা কলকাতায় যে সমস্ত প্রবাসী বাঙালিরা রয়েছেন তারা প্রতিমা গড়ার জন্য অর্ডার দিয়ে যান। কিন্তু এবছর করোনার কারণে অনেকেই বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। আর যারা এখনো বিদেশে রয়েছেন তারা বেশিরভাগই আগের বছরের পুরনো প্রতিমাই পুজো করবেন বলে জানিয়েছেন।

মিন্টু পাল জানান, অন্যান্যবার মে, জুন, জুলাই মাস থেকেই বিদেশের বিভিন্ন শহরে পাড়ি দেন মা দুর্গা। জাহাজে করে সপরিবারে পৌঁছন ফ্রান্স অস্ট্রিয়া কিংবা বেজিংয়ে। কিন্তু এ বছর দুর্গাপুজো দেরিতে থাকায় অগাস্ট মাসের থেকে শুরু হয়েছে মায়ের বিদেশ যাত্রা। করোনার প্রভাবে এবছর দেরীতেই পাড়ি দিয়েছেন মা। এমনকি ছোট ফাইবারের প্রতিমা অর্থাৎ দু ফুট বা ৩ ফুট আয়তনের প্রতিমা প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের সাথে নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এজেন্টের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ছোট প্রতিমার অর্ডার। কিন্তু এই অর্ডারের পরিমাণ অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।

করোনার প্রভাবে এবছর কতটা ক্ষতি হয়েছে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলে মিন্টু পাল জানান, বিক্রি অনেকটাই কম হয়েছে। যদিও বিদেশ থেকে প্রতিমা গড়ার মূল্য তারা কম পাননি। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবছর ৭০ শতাংশ কম অর্ডার পেয়েছেন তাঁরা। জানুয়ারি ডিসেম্বর মাসে অর্ডার করে দেওয়া থাকলেও অনেকেই পরে সেই অর্ডার ক্যানসেল করেছেন। তাই লোকসান হয়েছে অনেক। গতবছর যেখানে মিন্টু পাল নিজে দশটি প্রতিমা বিদেশে পাঠাতে পেরেছিলেন এবছর সেখানে মাত্র চারটি প্রতিমা বিক্রি হয়েছে। এমনকি দুটি মূর্তি সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যাওয়া অবস্থাতেই এখনো পড়ে রয়েছে তাঁর কাছে। একটি ইউএসএ এবং একটি ইউকে থেকে অর্ডার করা হয়েছিল।করোনার প্রভাবে এ বছর আর বিক্রি হলো না ওই দুটি প্রতিমা। যারা অর্ডার দিয়েছিলেন তাঁরা জানিয়েছেন সামনের বছর ওই প্রতিমা তাঁরা নেবেন।

তবে, এত বাধা সত্বেও যে চারটি দুর্গা প্রতিমা বিদেশে পাড়ি দিয়েছে তারমধ্যে দুটি দুর্গাপ্রতিমা ফ্রান্সে, ১ টি দুর্গাপ্রতিমা ওয়েস্ট ইন্ডিজে এবং একটি কালী প্রতিমা অস্ট্রিয়ায় বিক্রি হয়েছে।

যদিও গত বছরের তুলনায় এ বছর যা বিক্রি হয়েছে তাতে মোটেও খুশি নন মিন্টু পাল। বারংবার দুঃখ প্রকাশ করে জানান গত বছরও পাহাড় তৈরি করা বারোটি প্রতিমা বিক্রি হয়েছিল বিদেশে। মিন্টু পাল বলেন, দাম হয়ত বিদেশ থেকে তারা কম পাননি, কিন্তু অর্ডার কম হওয়ায় লোকসান হয়েছে বেশি। গতবছরও বেজিংয়ে মূর্তি পাঠিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু এ বছর তাঁরা আগের বছরের মূর্তিতেই পুজো করবেন। করোনার কারণে নতুন মূর্তি গড়ার অর্ডার আসেনি বেজিং থেকে।