‘বঙ্গভঙ্গ’ কি লর্ড কার্জনের মুসলিম তোষন নীতির ফল

আব্দুস সালাম, টিডিএন বাংলাঃ এক শ্রেনির ঐতিহাসিকগণ অভিযোগ করেন লর্ড কার্জন হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে আতঙ্কিত হয়ে মুসলিমদের প্রতি তোষন নীতি অবলম্বন করেন। যাতে করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলার তথা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়া যায়। তাদের আরও অভিযোগ বঙ্গভঙ্গের পিছনে তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাই বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পেশ করা হলে প্রাথমিক লগ্নে মুসলিম নেতৃত্বও এর বিরোধিতা করেছিলেন। এক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিল- মুসলিম ক্রনিকাল পত্রিকা, সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন। অন্য দিকে কাজিমুদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী, দেলোয়ার হোসেন আহমেদ, নবাব খাজা সলিমুল্লাহ এর মত ব্যক্তিত্বও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও তারা এর সুফলগুলির কথা চিন্তা করে বিরোধিতা থেকে সরে আসেন। ফলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মুসলিমরা বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। হিন্দু-মুসলিম উভয়ের কাছেই এ সিদ্ধান্ত ছিল অপ্রত্যাশিত।

যারা অভিযোগ করেন বঙ্গভঙ্গ ছিল লর্ড কার্জনের মুসলিম তোষন নীতির ফল তাদের জানা দরকার ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গই কিন্তু প্রথম বঙ্গভঙ্গ নয়। ইতিপূর্বে প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের জন্য ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে উত্তরাঞ্চলের এলাকাগুলিকে বাংলা থেকে পৃথক করে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনস্থ করা হয়। এদিকে গভর্নর লর্ড ডালহৌসিও বাংলার এই বিশালতা নিয়ে অভিযোগ করেন এবং একে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেন। অতঃপর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে সপরিষদ গভর্নর জেনারেলকে সরাসরি বাংলা শাসন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে বাংলার শাসনভার দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও বাংলার বিশালতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব হয়নি। বাংলার গভর্নর উইলিয়াম গ্রে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে , স‍্যার জন ক্যাম্পবেল ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে, ভারত সচিব জন লরেন্স প্রমূখ বাংলার বিশালতা নিয়ে অভিযোগ করে একে বিভক্ত করার দাবি তোলেন। এই দাবির ফলে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেটসহ অসমকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একজন চীফ কমিশনারের অধীনস্থ করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে লুসাই পাহাড়কেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কিন্তু এই বঙ্গভঙ্গের ফলেও বাংলার বিশালতা ও তার ফলে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা কমেনি। তাই ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ও ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রশাসনিক মহল থেকেই আসাম ও পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব ওঠে। এই প্রস্তাবিত প্রদেশের মধ্যে বর্তমান দার্জিলিং জেলাও ছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের চীফ কমিশনার স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার নতুন একটি সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রদেশের সম্বলপুরের আদালতে উড়িয়া ভাষা ব্যবহৃত হয়। অথচ সমগ্র প্রদেশের কোথাও উড়িয়া ভাষার চলন নেই। তাই তিনি দাবি করেন, হয় সেখানে হিন্দি ভাষার প্রচলন করা হোক, অথবা সম্বলপুরকে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত উড়িষ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হোক। একেতো বাংলার আয়তন ছিল বিশাল তার উপর এই সমস্যা আরও ভাবিয়ে তোলে লর্ড কার্জনকে।

এখন আসা যাক আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের কথায়। অনেক আলোচনা পর্যালোচনা শেষে লর্ড কার্জন ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে সময়ের দাবি মেনে বঙ্গভঙ্গের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে ভারত সচিবকে প্রেরণ করেন। প্রস্তাবটিতে চট্টগ্রাম বিভাগসহ ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা অসমের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে এর ফলে চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে জলপথবিহীন অসমের সংযুক্তি হবে যা অসমের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। কারণ পূর্ববঙ্গের জেলা গুলিকে অনুন্নত অসমের সঙ্গে যুক্ত করা হলে তাতে উন্নয়নের সম্ভাবনা খুবই কম। যাই হোক অবশেষে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। এরপর ১ সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গের চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়। অবশেষে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ই অক্টোবর এই পরিকল্পনা কার্যকরী করা শুরু হয়। নতুন প্রদেশটির প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন স‍্যার ব‍্যামফিল্ড ফুলার।

এত কথা বলার কারণ একটাই যারা অভিযোগ করেন বঙ্গভঙ্গ ছিল একটি ষড়যন্ত্রের অংশ ও হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা। যারা বলেন এটি ছিল লর্ড কার্জনের মুসলিম তোষননীতি ও মুসলিম নেতৃত্বের যোগসাজসের ফল তাদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা পাঠকের পক্ষে যেন সহজ হয়।

তথ্য সূত্র-
১)বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস- আব্বাস আলি খান,
২) ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন- মুহাম্মদ ইনাম উল হক,
৩) বাংলা পিডিয়া- বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞান কোষ,