শিক্ষারত্ন পুরস্কার পাচ্ছেন জানকিনগর হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক সোহরাব হোসেন

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, পলাশী: মাদ্রাসা ও ছাত্র-ছাত্রীদের মানোন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সংস্কারেও অসামান্য অবদান। রাজ্য সরকার মনোনীত শিক্ষারত্ন পুরস্কার পেতে চলেছেন নদিয়ার পলাশীর জানকিনগর হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক সোহরাব হোসেন। আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর জেলা শাসকের দফতর থেকে তিনি এই সম্মান পাবেন। ঐতিহাসিক পলাশীর এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই শিক্ষকের সফলতার খবরে স্বভাবতই খুশির হাওয়া মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাকর্মী, সহশিক্ষক-শিক্ষিকা সহ ঐতিহাসিক পলাশীর সাধারণ মানুষের মধ্যেও। শিক্ষকের বাড়ি পলাশীর মীরা মাঠ পাড়ায়। ২০০১ সালে তিনি জলঙ্গির ফরিদপুর হাই স্কুলের সহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তারপর আট বার এসএসসি ও এমএসসির পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে কৃতকার্যও হন। ২০১৪ সালে ২৬ সে মার্চ পলাশীর জানকিনগর হাই মাদ্রাসা (এইচএস) তে প্রধান শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেন সোহরাব হোসেন।

জানকিনগর হাই মাদ্রাসায় যোগদানের সময় থেকেই সোহরাব হোসেনের প্রতিজ্ঞা ছিলো মাদ্রাসা কে একটি আদর্শ মাদ্রাসা হিসাবে গড়ে তোলার। আর সেই মানসিকতা নিয়ে কাজ শুরু করে আজ তিনি সফল। প্রথমে কিছুটা বাধার সম্মুখীনও হন তিনি। কারণ অভিভাবকরা তাঁদের ছেলে মেয়েকে মাদ্রাসায় ভর্তি না করে স্কুলে ভর্তি করার কথা ভাবতেন। আর এই সমস্যাকে তিনি ধৈর্য্যের সঙ্গে মোকাবেলাও করে।

তিনি জানাচ্ছেন, প্রথমে মাদ্রাসার পরিচালন সমিতি ও শিক্ষক শিক্ষিকা দের সঙ্গে মিটিং করে এই সমস্যার কথা তুলে ধরলাম। সেই মিটিং এর নির্যাস নিয়ে বিভিন্ন লিফ্লেট, ব্যানার ও বিভিন্ন প্রচারমূলক অভিযান শুরু করি। এভাবে ধীরে ধীরে অভিভাবক দের মন থেকে মাদ্রাসা সম্পর্কে ভুল ধারণা ভাঙাতে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম।

২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত স্কুল সার্ভিস কমিশনে আট বার পাস করেছেন সোহরাব হোসেন। ২০১২ সালে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের হেড মাস্টার নিয়োগ এবং ২০১৭ সালে এসএসসির হেড মাস্টার নিয়োগের পরীক্ষাতেও তিনি কৃতকার্য হন তিনি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, শুধু মাত্র পঠন-পাঠনে নয়, ছাত্রছাত্রীদের সার্বিক বিকাশের কথা মাথায় রেখে শিক্ষক শিক্ষিকা দের মধ্যে বিভিন্ন কমিটি তৈরি করি, যেমন স্পোর্টস কমিটি, সাংস্কৃতিক কমিটি, শৃঙ্খলা কমিটি ইত্যাদি। ছাত্র ছাত্রী দের যে যেখানে পারদর্শী সেইখানে তাদের কে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম এবং সফল হয়েছিলাম।

মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক নভ:জ্যোতি ঘোষ বলছেন, হেড স্যারের এই খবরের আমরা সকলেই উৎফুল্ল। প্রশাসনিক ও একাডেমিক দক্ষতার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও তিনি খোলা মনের। প্রতি বছর জেলা তথা রাজ্য থেকে বিভিন্ন ইভেন্ট এ পুরস্কার পেয়েছে জানকিনগর হাই মাদ্রাসা। ২০১৭ সালে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার, ২০২১ সালে ১৪ আগস্ট রাজ্য থেকে কন্যাশ্রী সোশ্যাল ক্যাটাগরি আউট স্টান্ডিং এচিভমেন্ট পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মাদ্রাসার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে।’

জানা গেছে, ২০১৭ সালে মাদ্রাসায় মিনা মঞ্চ গঠন, কন্যাশ্রী ক্লাব তৈরি , বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক দিন গুলি পালন করা , মিশন নির্মল বাংলা কোভিড পরিস্থিতি তে অনলাইনে ক্লাসের ব্যবস্থা করা সহ মাসিক কাজ টেস্ট করার জন্য ছাত্র ছাত্রী দের অভিভাবক কে মিড ডে মিল চলা কালীন আসাইমেন্ট পেপার দেওয়া নেওয়াও চলেছে সোহরাব হোসেনের নেতৃত্বে।

সহকারী শিক্ষক শিক্ষিকাদের সহযোগীতায় বিভিন্ন টিচিং মাধ্যম যেমন গুগল মিট, হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস মেসেজ ইত্যাদি পদ্ধতিতে সারা বছর ক্লাস পরিচালিনা করেছেন তিনি। বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার অভিভাবক মিটিং করার মধ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রী দের পড়াশোনার রিপোর্ট তুলে ধরার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মানোন্নয়নও সম্ভব হয়েছে। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার রেজাল্ট দৃষ্টান্তমূলক ভাবে এই মাদ্রাসা জেলা তে কয়েক বছর ধরে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে।

প্রধান শিক্ষক বলেন, শনিবার রাতে মেইল মারফত শিক্ষারত্ন পুরস্কারের কথা জানতে পারি। স্বভাবতই একটা গর্বের বিষয়। প্রতি বছরই জেলায় প্রথম দশে থাকে আমাদের পড়ুয়ারা। ছাত্রছাত্রী অভিভাবক, সহশিক্ষক-শিক্ষিকা সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাদ্রাসার যে সার্বিক উন্নতি হয়েছে তাতে আমি গর্বিত।

পলাশীর বিশিষ্ট সমাজ সেবক ওসমান গনি খান বলেন, এটা খুবই গর্বের বিষয় যে আমাদের পলাশীর কোনো শিক্ষক আজ গোটা পশ্চিমবঙ্গে মধ্যে শিক্ষারত্ন পুরস্কার পাচ্ছেন। যা দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ বাড়বে শিক্ষার। এই মানুষটিকে আমাদের পলাশীর প্রতিটি যুবক ও সমাজ সেবকরা আইকন ভাবেন।

মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র মোঃ মুস্তাকিম সেখ বলেন, প্রধান শিক্ষক শিক্ষারত্ন পুরস্কারে নাম ঘোষিত হওয়া তে মাদ্রাসার সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকা ও অশিক্ষক কর্মীদের পাশাপাশি এলাকার মানুষজন খুবই খুশি হয়েছেন। ছাত্র ছাত্রী দের পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক নানান কাজে উৎসাহিত করেন। এছাড়াও মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা কে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার জন্য ওনি দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছেন।