‘আমার ছোট্ট দেবকে বাঁচান’- গভীর রাতে ফোন পেয়েই অক্সিজেন নিয়ে ছুটলেন ফজলুল শরিফুলরা

নিজস্ব ছবি

রেবাউল মন্ডল,টিডিএন বাংলা, নবগ্রাম: ‘ছেলেকে এক্ষুনি অক্সিজেন না দিলে বাঁচানো যাবে না। দয়া করে আপনারা সাহায্য করুন’- গভীর রাতে ফোনের ওপারে বাবার করুন আর্তি। আর দেরি নয়। মুহূর্তেই অক্সিজেন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মুর্শিদাবাদের ফজলুল কবীর, শরিফুল আলম, হাসেম আলী, সরফরাজ সিদ্দিকী, মসিউর রহমান, জিয়ারুল সেখরা।

ঘটনা মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম থানার লক্ষণপুর গ্রামের। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাপি মার্জিতের বছর বারোর ছেলে দেব মার্জিত দীর্ঘদিন থেকেই ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছে। তিন বছর বয়স থেকেই চলছে তার চিকিৎসা। কলকাতার এনআরএস মেডিকেল সহ ব্যাঙ্গালোরেও ছুটেছেন তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থ সাথ না দেওয়ায় বর্তমানে অক্সিজেন কংসেন্ট্রেটরের মাধ্যমে বাড়িতে নিয়মিত অক্সিজেন দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু শনিবার রাতে হঠাৎই সেটি বিকল হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েন দেবের পরিবার। অত রাতে কোথায় মিলবে অক্সিজেন? ফোন যায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘উইংস অফ হোপ’ এর সেক্রেটারি ফজলুল কবীরের কাছে। বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ অক্সিজেন সহ দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ফজলুল।

ফজলুল কবীর জানান, ‘আমরা যখন বাচ্চাটির বাড়িতে পৌঁছায় তখন ঘড়ির কাটায় ঠিক সাড়ে এগারোটা। দেখি খড়-মাটির ছোট্ট একটা বাড়িতে অনেক সদস্য। মেঝেতে পড়ে আছে শিশুটি। সঙ্গে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট। অক্সিজেন লেভেল চেক করতেই দেখি ৩৬ এ নেমে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তার তথা আমাদের গ্রূপ মেম্বার বাসিরুল ইসলাম কে ফোন করে পরামর্শ চাই। উনি দ্রুত অক্সিজেন চালাতে এবং হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। চমৎকার ভাই অক্সিজেন চালু করে। ৩৫ মিনিট পরে অক্সিজেন লেভেল ৯০ এ পৌঁছায়। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সদস্য শরিফুল ইসলামের নিজের গাড়িতে করেই শিশুটিকে বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করি। তখন রাত্রি ১টা পেরিয়েছে। আপাতত দেব এখন সুস্থ।’

দেবের মা মামনি মার্জিত জানান, ‘তিন বছর বয়স থেকেই ছেলেটি ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছে। বিভিন্ন হাসপাতালে এপর্যন্ত চিকিৎসা চালাতেই ফুরিয়েছে সর্বস্ব। কোথায় কোন আর্থিক সাহায্য পাইনি। রাতে ওই ছেলেগুলি দেবদূত হয়ে এসে অক্সিজেন দিয়েছে। গাড়ি ভাড়া করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পয়সাটাও ছিল না। ওরাই নিজের গাড়ি করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ছেলেটিকে এযাত্রায় বাঁচিয়েছে। ওদের এই উপকার ভুলব না।’

খড় মাটির একচিলতে একটি বাড়িতে মাথা গোঁজে পরিবারটি। দেব ছাড়াও ছয় মাসের একটি শিশু সন্তানও আছে তাদের। চোখের জল মুছতে মুছতে দেবের বাবা বাপি মার্জিত বলেন, ‘দিনমজুরি করে কোন মতে সংসারটা চালাই। ২০১৫ সালে ছেলেকে ব্যাঙ্গালোরে দেখিয়েছি। দিন আনা দিন খাওয়া সংসারে গত আট বছরে ঘটিবাটি বেঁচে এখন আমি নিঃস্ব। ছয় মাস আগেও ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তাররা বলেছেন ছেলের অপারেশনের জন্য ৩৫লক্ষ টাকা লাগবে। কিন্তু ওতো টাকা কোথায় পাব? তাই সেই থেকে বাড়িতেই অক্সিজেন চালিয়ে রেখেছি। পরশু হঠাৎই মেশিনটি খারাপ হয়ে যাওয়ায় বিপদে পড়ি। এরপর যে কি হবে ভগবানই জানে।’

এবারের যাত্রায় দেব বেঁচে গেলেও কবে সম্পূর্ণ সুস্থ হবে কলিজার টুকরোটি জানেনা দেবের মা বাবা।
এলাকাবাসীরা চাইছেন এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াক সরকার, সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসুক বিভিন্ন এনজিও গুলিও।