বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলন নয় বরং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ফল

আব্দুস সালাম:  ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ১৬ ই অক্টোবর বড়লাট লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। এরপর  বাংলা তথা ভারতে শুরু হয় ‘বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন’। স্বাধীনতা আন্দোলনের নামে, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে, বাংলামাতার অঙ্গচ্ছেদের ষড়যন্ত্র বন্ধ করার নামে এই আন্দোলন শুরু হলেও প্রকৃত পক্ষে এই আন্দোলনের কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বসবর্তী হয়েই এই আন্দোলন শুরু করা হয়। এ বিষয়ে ডঃ আম্বেদকরের মত হল, “বাঙালি হিন্দুদের বাংলা বিভাগের বিরোধিতার কারণ ছিল এই যে তারা চাইতেন না মুসলমানরা পূর্ববাংলায় তাদের যথাযোগ্য স্থান অধিকার করুক…।” (পাকিস্তান আর পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া, পৃঃ ১১০)। বিমলানন্দ শাসমল মন্তব্য করেন, “সিন্ধু প্রদেশেও ঠিক এমনটিই হয়েছিল। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুরা সিন্দুকে বোম্বাই হতে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল কারণ তখন সিন্ধুদেশে মুসলমান সংখ্যাধিক্যের সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ১৯২৯ সালে যখন মুসলমান সংখ্যাধিক্য অবধারিত তখন হিন্দুরা সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলন।” (স্বাধীনতার ফাঁকি, পৃঃ ৫৫)

            এক্ষেত্রে আলোচনা করা দরকার ‘বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে’ কে বা কারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমরা দেখতে পাই মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত সম্প্রদায় সর্বপ্রথম বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন বাংলা থেকে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তাদের কর্মসূচির অন্তর্গত করে। ফলে শুরু হয় গোটা ভারত জুড়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রচার ও আন্দোলন। অন্যদিকে বাংলায় যুগান্তর পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা প্রভৃতি ও ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের মত প্রথম সারির পত্রিকাগুলি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে‌। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেস ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত সরাসরি কোনো সরকার বিরোধী আন্দোলনে নামেনি। তারা সর্বদা আবেদন-নিবেদনেই বিশ্বাসী ছিলেন। অথচ সেই কংগ্রেসই এবার বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রণংদেহী রূপ নিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করলো। মহা উৎসাহে শুরু হলো স্বরাজ ও স্বদেশী আন্দোলন।(বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস,পৃঃ ৩০৬-৩৩০)

            এখন প্রশ্ন হচ্ছে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের কারণগুলি কি ছিল, বাংলাকে বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করাই কী এর মূল কারণ ছিল? (যেমনটি তারা প্রচার করছিল) স্বাধীনতা আন্দোলনকে জোরদার করাই কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল, না অন্য কোন দুরভিসন্ধি এর পিছনে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

          ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে পূর্ববাংলার ভাগে পড়ে ১ লক্ষ ৬ হাজার ৫৪০ বর্গমাইল এলাকা এবং এর জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ১০ লক্ষ। এর মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ্য ছিলেন হিন্দু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। অন্যদিকে বাংলার দখলে থেকে যায় প্রায় ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৫৮০ বর্গমাইল অঞ্চল এবং এর জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লক্ষ। এর মধ্যে ৪ কোটি ২০ লক্ষ ছিলেন হিন্দু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের এবং ৯০ লক্ষ ছিলেন মুসলিম‍ সম্প্রদায়ের মানুষ। অর্থাৎ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, বঙ্গভঙ্গের ফলে একটি মুসলিম অধ্যুষিত নতুন প্রদেশের সৃষ্টি হয়েছিল (বাংলা পিডিয়া- বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞান কোষ)। মুসলিম অধ‍্যুসিত একটি নতুন প্রদেশের উদ্ভব হিন্দুত্ববাদীরা কোন মতেই মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তাছাড়া অবিভক্ত বাংলাতে হিন্দুরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে সৃষ্ট নতুন প্রদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন। ফলে শুরু হলো দুর্বার আন্দোলন। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী নেতৃবৃন্দ এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে সুকৌশলে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ দেওয়ার আপ্রান চেষ্টা চালান।

            এক্ষেত্রে তারা এই আন্দোলনকে স্বাধীনতার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে তুলে ধরতে অনেকাংশেই সফল হয়েছিলেন বলা চলে। অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী অভিজাত শ্রেনির আন্দোলন থেকে সাধারণ জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। অবশ্য এ আন্দোলনে বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্ন স্বার্থে যোগ দিয়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এই আন্দোলনে জমিদার শ্রেনি যোগ দিয়ে ছিলেন তাদের জমিদারী রক্ষার তাগিদে। কারণ তাদের অধিকাংশের জমিদারি ছিল পূর্ব বাংলাতে। এই জমিদারদের মধ্যে হিন্দুদের পাশাপাশি কিছু মুসলিম জমিদারও ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের জমিদারী হাতছাড়া হয়ে যাবে। এছাড়া বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসাবে ঢাকা শহরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে কলিকাতার গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত শ্রেনির প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা হুমকির সম্মুখীন হয়। তাদের আরও একটি আশঙ্কা ছিল ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ না করা হলে ঢাকাকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে অপর একটি বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত শ্রেনির উদ্ভব ঘটবে। তাছাড়া বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার চা ও পাঠ উৎপাদনকারী এলাকা পূর্ববঙ্গের মধ্যে পড়ে যা পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। (ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন, পৃঃ ১১৬)।

        এ সমস্ত কারণ তো ছিলই সঙ্গে বঙ্গভঙ্গের এক বছরের মধ্যেই আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। যা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বকে আরো বেশি আতঙ্কিত করে তোলে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ৩০শে জুলাই। এই দিনে ঢাকাতে  মুসলিম নেতৃবৃন্দের উদ্দোগে একটি সর্বভারতীয় শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন তখন তোলপাড়। পূর্ববঙ্গের গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া সকলেই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে আছে এটা জেনেও কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নরমপন্থী ও অহিংস নীতি ত্যাগ করে রণংদেহী মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। এমতাবস্থায় মুসলিম নেতৃত্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন অনুভব করেন। কারণ ততদিনে কংগ্রেসের কর্মপন্থা থেকে এটা স্পষ্ট যে তারা হিন্দুত্ববাদীদের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। অতঃপর সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ৮ হাজার মুসলিম নেতৃত্বের উপস্থিতে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সঙ্গে এই সম্মেলন থেকে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জীবনের মানোন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস,পৃঃ ৩৩০)

       অন্যদিকে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ১ই অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ৩৬ জন নেতৃস্থানীয় মুসলিম-এর একটি প্রতিনিধিদল বড়লাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান। অনেক টালবাহানার পর প্রভূত চাপ সৃষ্টি এবং বিশেষ করে সৈয়দ আমীর আলীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পৃথক নির্বাচনের দাবি অনুমোদিত হয়। এই দুটি ঘটনা বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন যুগের সূত্রপাত ঘটায়। ফলে স্তিমিত হয়ে পড়া বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন আবারও তীব্র আকার ধারণ করে।

তথ্য সূত্র-
১)বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস- আব্বাস আলি খান,
২) ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন- মুহাম্মদ ইনাম উল হক,
৩) বাংলা পিডিয়া- বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞান কোষ,
৪) স্বাধীনতার ফাঁকি- বিমলানন্দ শাসমল