বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক

supreme court of india

মুহাম্মাদ নূরুদ্দীন 

ভারতের প্রধান বিচারপতি এন ভি রমন সম্প্রতি বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। রাজধানী নতুন দিল্লিতে সপ্তম জাস্টিস বি ডি দেসাই মেমোরিয়াল লেকচার প্রদানকালে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার চাই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। বিচারব্যবস্থা যাতে কোনোভাবেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক চাপের শিকার না হয় সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করা দরকার। শুধু রাজনৈতিক প্রভাব নয়, জনসাধারণের আবেগ উচ্ছ্বাস দ্বারাও বিচারব্যবস্থা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হয়। বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে প্রকৃত সত্যকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন ২০১৪ সালের পর থেকেই বিচার ব্যবস্থার উপর রাজনীতির প্রভাব অনেকটা বেড়েছে। তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে ন্যাশনাল জুডিশিয়ারি অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন তৈরি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ জন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত কলেজিয়াম ২০১৫ সালের অক্টোবরে এই কমিশনকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের অনেক পরামর্শকে উপেক্ষা করে চলেছে। হাইকোর্ট গুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ বিচারপতির পদ শূন্য আছে। এ অবস্থায় দ্রুত বিচার পৌঁছে দেওয়া কিভাবে সম্ভব?
ভারতের প্রধান বিচারপতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি পেশ করে বলেন,
“চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য, উচ্চ যেথা শির
জ্ঞান যেথা মুক্ত
যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।”
তিনি তেলেগু কবি জি এ রাও এর উদ্বৃতি দিয়ে বলেন,
“একটি জাতি শুধুমাত্র কোন ভৌগলিক ভূখন্ড নয়, বরং জাতি বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে। যখন জনগোষ্ঠীর উন্নতি হয় তখনই জাতির উন্নতি হয়।” তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, বিচারব্যবস্থার প্রধানতম দায়িত্ব সংবিধানকে সুরক্ষিত রাখা। তারা যে শপথ বাক্য পাঠ করে তার মূলকথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের মূল ধারাকে সংরক্ষণ করা। তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থা হচ্ছে দুমুখো তলোয়ার। সেটা দিয়ে যেমন সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় তেমনি অত্যাচারীদের অত্যাচারকেও বৈধতা দেওয়ার যায়।
দেশের গণতন্ত্র এবং বিচার ব্যবস্থা যখন বিপন্ন তখন ভারতের প্রধান বিচারপতির কন্ঠে এই বলিষ্ঠ আওয়াজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত আইন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা এবং শাসন ব্যবস্থার স্বতন্ত্রতা। এই স্বতন্ত্রতা ও পারস্পরিক সীমা যত সযত্নে রক্ষা করা যাবে গণতন্ত্র ততই শক্তিশালী হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে দিনের পর দিন রাজনৈতিক চাপের কাছে শাসন ব্যবস্থা এবং বিচার ব্যবস্থা মাথা নত করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছর ভারতের বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যেভাবে রাজনৈতিক চাপের কাছে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে তাতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে পারেনি। এ প্রসঙ্গে অবশ্যই বাবরি মসজিদ রাম জন্মভূমি মামলার কথা উল্লেখ করাই যায়। গোটা বিশ্ব লক্ষ্য করেছে যে কিভাবে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ভারতের প্রধান বিচারপতি একপেশে রায় প্রদান করে ছিলেন। দেশের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী মতকে দমিয়ে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা এবং যারা প্রশ্ন তুলতে পারে এ ধরনের ব্যক্তিত্বও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ করে দেওয়ার যে অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি সঠিকভাবেই বলেছেন, আইনের শাসন এবং সংবিধান সুরক্ষাই বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। এ বিষয়ে সকলকে সতর্ক হতে হবে।