স্বাগত দিল্লী ও এলাহাবাদ আদালতের রায়

ছবি ফেসবুক থেকে।

মুহাম্মাদ নূরুদ্দীন: সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্ট এবং উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ কোর্ট যে রায় প্রদান করেছে তাতে বলা যায় এখনো আশার আলো নিভে যায় নি। ভারতে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন যেভাবে দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পদতলে পিষ্ট হচ্ছে এমনকি বিচারব্যবস্থা ও যেখানে অসহায় দর্শক এ পরিণত হচ্ছে তা দেখার পর উদ্বিগ্ন হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।
এই সময় এই দুতি রায় খুবী তাৎপর্যপূর্ণ। দুটি রায়ের প্রথমটি হল, তিন পড়ুয়া সমাজকর্মী দেবাঞ্জনা কালিতা, নাতাশা নারওয়াল ও আসিফ ইকবাল তানহাকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ। তাদেরকে ইউপিএ ধারায় প্রায় এক বছর ধরে দিল্লি পুলিশ আটক করে রেখেছিল। দিল্লি হাইকোর্ট তাদের জামিন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জানিয়েছে যে সাধারণ মানুষকে দমিয়ে রাখতে এবং সংবিধান স্বীকৃত আন্দোলনের অধিকার ও সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের মধ্যে যে রেখা রয়েছে তা যেন কোথাও অস্পষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। এমন মনোভাব সক্রিয় থাকলে গণতন্ত্রের জন্য তা দুর্দিন।
তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছিল প্রায় এক বছর পূর্বে । তারা জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। বিচারপতি সিদ্ধার্থ মৃদুল ও অনুপ জয়রাম এই ধরনের ক্ষেত্রে ইউএপি এর মত কঠোর ধারা প্রয়োগ এর বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অনুরূপভাবে উত্তর মথুরার আদালত কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান এবং তার আরও তিন সঙ্গীকে শান্তি লংঘন করা সম্পর্কিত অভিযোগের মামলা বাতিল করে দিয়েছে। পৃথক পৃথক হলেও দুই আদালতের এই রায় অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
দিনের পর দিন রাষ্ট্রশক্তি যেভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে এই রায় প্রদান অনেকটাই উত্তপ্ত চেম্বার এ শীতল বাতাসের মতই।
সন্দেহবশত গ্রেফতার করে একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমান ভারতে প্রায় ৭০ শতাংশ বিচারাধীন বন্দী রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বছরের পর বছর আটক রয়েছেন। ১০/১২ বছর আটক রাখার পর অনেককে নির্দোষ বলে মুক্তি দিতে দেখাও যায়। প্রশ্ন হল, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণ হয়নি তাদেরকে এইভাবে দীর্ঘদিন আটকে রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় কি? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে আটকে রাখা এবং তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে নানান মিথ্যা তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রমাণের চেষ্টা করা অন্যায়। দেবাঙ্গনা কালিকা, নাতাশা নারওয়াল ও আসিফ ইকবাল তানহা তিনজনেই বিক্ষোভ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধিতা করার, বিক্ষোভ প্রদর্শন করার , মিটিং মিছিল করার অধিকার জনগণের আছে। রাষ্ট্র সে অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। দিল্লি হাইকোর্টের রায় একথা সুস্পষ্ট করেছে।
অপর দিকে সিদ্দিক কাপ্পান পেশায় সাংবাদিক। তিনি উত্তরপ্রদেশের হাতরাসে একটি গণধর্ষণের সংবাদ করতে গিয়েছিলেন। সেখানেও রাষ্ট্রশক্তি শাসক রাজনৈতিক দলের কোন নেতাকে আড়াল করতে কাপ্পান ও তার সংগীদের গ্রেফতার করে এবং তারপর তাদের উপর একের পর এক মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দেয়া হয়। প্রশ্ন হল, প্রথমে কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তারপর তার বিরুদ্ধে অপরাধের রাশি রাশি মামলা দায়ের করা কি ন্যায় বিচার? এভাবে কি রাষ্ট্র নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে? না কোন রাষ্ট্র এইরূপ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করতে পারে? রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যে দেশ যতটা উদার, যে দেশ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে যতটা সক্ষম সেই দেশ ততটাই শক্তিশালী হতে পারে। পেশী শক্তির মাধ্যমে বুলেটের আঘাতে জনগণকে দাবিয়ে রাখলে, প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করলে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রকে দুর্বল করা হয়। তাই এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সমস্ত সচেতন নাগরিকদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। দিল্লি হাইকোর্ট ও এলাহাবাদ কোর্ট যে রায় প্রদান করেছে তা গণতন্ত্রের পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, সুবিচারের পক্ষে একটি বলিষ্ঠ আওয়াজ। রা ষরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে এই আওয়াজ কে আরো সম্প্রসারিত করতে হবে।