জনক‍ল‍্যানে রাজ‍্য সরকারের বিরুদ্ধে ব‍্যর্থতার অভিযোগ তুললো ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলাঃ জনক‍ল‍্যানে রাজ‍্য সরকারের বিরুদ্ধে ব‍্যর্থতার অভিযোগ তুলে সোমবার কলকাতা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে করলো ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া (WPI)।

এই সম্মেলনে কর্মসংস্থানের অভাব, অতিবৃষ্টি জনিত জলমগ্নতা, গণপিটুনিতে হত্যা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যর্থ মমতা সরকারের কড়া সমালোচনা করল ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া। এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে পার্টির পক্ষ থেকে রাজ‍্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, “রোজগার প্রদানে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার কারণেই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেরা রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে ভিনরাজ্যে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যেই কাজ করে বাঁচার চেষ্টা করছে।” পার্টির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ তোলা হয় যে, “পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যাপারে এ রাজ্যের সরকার বা কাজের উদ্দেশ্যে শ্রমিকরা যে সমস্ত রাজ্যগুলিতে পাড়ি জমায় সেই রাজ্যগুলির কেউই রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের থেকে এদের সঠিক তথ্যানুসন্ধান করবার চেষ্টা চালায়নি । পরিযায়ী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি উন্নয়নেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনওরূপ কল্যাণকামী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি । তাই, ওয়েলফেয়ার পার্টির পক্ষ থেকে মমতা সরকারের কাছে দাবী তোলা হচ্ছে যে, রাজ্যের শ্রমিকদের কল্যাণ সুনিশ্চিত করতে সরকার যেন অবিলম্বে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।” একইসঙ্গে পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, “প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে ও রাজ্যের বাঁধগুলি থেকে যথেচ্ছ পরিমাণে জল ছাড়ার কারণে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, হাওড়া, দক্ষিণ ২৪পরগনা এবং বীরভূম জেলার মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।” পাশাপাশি মমতার সরকারের কাছে আবেদন জানায় যে, “ভবিষ্যতে এধরণের দূর্ঘটনা এড়াতে সরকার যেনো নদী প্রণালী গড়া, মজবুত গার্ডওয়াল তৈরী, সময়ের পূর্বেই দূর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা খালি করা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্য পাঠানো এবং পুনর্বাসন প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালনের জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।” পশ্চিমবঙ্গ একটি কৃষিনির্ভর রাজ্য এবং এই রাজ্যের বিধানসভায় মমতা সরকার যে কেন্দ্রের বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছে তার প্রশংসা করে ওয়েলফেয়ার পার্টি। তবে তারা অভিযোগ করেন, “কেন্দ্র সরকারের সাথে সাথে মমতা সরকারও রাজ্যের কৃষকদের দূরাবস্থার জন্য বা বলা ভালো বিশেষভাবে ধান ও আলু চাষীদের দূরাবস্থার জন্য দায়ী। মমতা সরকারের উচিৎ সমস্ত কৃষি কাজের সাথে যুক্ত মানুষদের প্রতি সর্বোচ্চ সাহায্য ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।” তারা দাবী করে যে, “উত্তরবঙ্গের জন্য মমতা সরকারের উচিৎ বেশ কয়েকটি AIIMS এর ধাঁচের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তোলা।”

ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে যে, “এ রাজ্যের বিধানসভায় ২০১৯ সালেই গণপিটুনিতে হত্যার প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিলটি পাশ হওয়া একটি প্রসংশনীয় ঘটনা হলেও গণপিটুনিতে হত্যার ক্ৰমবর্ধমান ঘটনার কথা মাথায় রেখে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে ঐ আইনের বাস্তব প্রয়োগ হওয়া উচিৎ।” ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া দাবি জানায়, “অতিমারীর কারণে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনের উপর দারুণ খারাপ প্রভাব ফেলেছে । এমতবস্থায়, রাজ্যবাসীর কল্যাণের কথা ভেবে রাজ্য সরকারের উচিৎ ২০০ ইউনিট অবধি বিনামূল্যে ইলেকট্রিক প্রদানের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা।” ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া এদিন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এর কাছে আবেদন করে যে, “তৃণমূল দলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’ পত্রিকায় রাজ্যের সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘোষণা দেওয়া সকল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি গুলি যেন পূর্ণ করা হয়।” উল্লেখ্য, তৃণমূলের ঐ মুখপত্রে মুখ্যমন্ত্রী দাবী করেন যে, সংখ্যালঘুদের জন্য উন্নয়নমূলক প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে এবং চাকরীতে নিয়োগ প্রদান করা হবে। পার্টি এ রাজ্যের বাসন্তীতে রফিকুল ইসলাম নামের ব্যক্তিটির ভয়াবহ গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। পার্টি উল্লেখ করে যে, “সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টি ও নিয়মিত একই কায়দায় সংখ্যালঘুদের উপর ঘৃণাজনিত অপরাধ সংগঠিত হওয়া এবং উত্তরোত্তর তার বৃদ্ধি এই ইঙ্গিতই প্রদান করে যে, ভারত হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাধিক্যবাদের দিকে ভয়ানকভাবে গড়ে যাচ্ছে।” সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এদিন রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে বার্তা দেওয়া হয় যে, “মমতা সরকারের ভুলে গেলে চলবে না যে, সম্প্রতি তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় আসীন হয়েছে । রাজ্য সরকারের উচিৎ, ঐ সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা প্রদান করা ও পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করা। এজন্য, গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাগুলিতে এই রাজ্যের যে বহু সংখ্যক মানুষের প্রাণ গেছে সেসব ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।” রাজ্যের সরকার পোষিত মাদ্রাসা ও সরকারী স্কুলগুলিতে অবিলম্বে শূন্যপদে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করার দাবী তোলে ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া। এদিনের সম্মেলন থেকে ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া পরিবারের মহিলা অভিভাবকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে নেওয়া রাজ্য সরকারের লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পকে স্বাগত জানায়। পাশাপাশি এই প্রকল্পের অধীনে দলিত, ওবিসি ও সাধারণ মহিলাদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অসামঞ্জস্য তৈরী করা হয়েছে তার সমালোচনা করে। তারা জানায়, “যেহেতু এই আর্থিক সহায়তা প্রকল্পটি শুধুমাত্র সমস্ত স্তরের গরীব মহিলাদের উদ্দেশ্যেই রাখা হয়েছে, সেখানে জাতি ও সম্প্রদায় ভিত্তিক এই বিভাজন বৈষম্যমূলক। তাই, মমতা সরকারের উচিৎ, সমাজের সর্বস্তরের গরীব মহিলাদের জন্য এই প্রকল্পের অধীন একই সুযোগ রাখা।”
ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া পুলিশ কনস্টেবল সোহরাবুদ্দিন হত্যা মামলায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তেরও দাবী তোলে এবং দোষী পুলিশ অফিসারদের কঠোর শাস্তির দাবী করা হয় ।

এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি ডঃ এস. কিউ. আর. ইলিয়াস সাহেব, সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ডা: রইসুদ্দিন, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদীকা সীমা মহসীন, রাজ্য সভাপতি মনসা সেন,রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার হাসানসহ অন্যান্যরা।