HighlightNewsদেশ

ইলেক্টোরাল বন্ড কেলেঙ্কারি প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চ শেষ পর্যন্ত মোদি সরকারের ইলেক্টোরাল বন্ড স্কিমকে অসাংবিধানিক বলে খারিজ করে দিল। বাস্তবিকই এই স্কিম সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কদর্য কেলেঙ্কারিগুলির অন‍্যতম। এবং এটা সন্তোষজনক যে সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত বিষয়টিতে নজর দিয়ে এরকম রায় দিল যা গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার পুনস্থাপনের সহায়ক হবে, বিশেষত আজকের ভারতে কর্পোরেট ক্ষমতার সাথে অসম লড়াইয়ের পরিস্থিতিতে। স্কিমটিকে খারিজ করে দেওয়ার সাথে সাথে সুপ্রিম কোর্ট এসবিআই-কে নির্দেশও দিয়েছে এযাবৎ যত বন্ড ভাঙানো হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ, দাতা ও গ্রহিতাদের পরিচয় সহ, ভারতের ইলেকশন কমিশনের কাছে ৬ মার্চের মধ‍্যে জমা দিতে, যাতে করে ইলেকশন কমিশন ১৩ মার্চের মধ‍্যে সেইসব তথ‍্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে।

ইলেক্টোরাল বন্ডের পুরো বিষয়টাই গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি এক নির্লজ্জ পরিহাস। জালিয়াতি করে সংসদে এটা পাস করানো হয়েছিল ২০১৭ সালের অর্থ বিলের অংশ হিসেবে পেশ করে, যাতে রাজ‍্যসভায় পর্যালোচনার দরকার না পড়ে। কারণ রাজ‍্যসভায় বিজেপির সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও এই সরকার বিচারবিভাগ নিয়ন্ত্রণের মতবাদ আরোপ করতে চেয়েছিল যে নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক বিষয়ে প্রযোজ‍্য যে বিষয়ে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না। নির্বাচনে নগদ বা বেআইনী টাকার উপযোগ কমানো তো অনেক দূরের কথা, এই স্কিম নির্বাচনে টাকার খেলা অনেক ঘাত বাড়িয়ে দেয়। এবং নাম গোপন রেখে ঊর্ধ্বসীমাহীন কর্পোরেট চাঁদার সুযোগ করে দিয়ে এই স্কিম নির্বাচকমণ্ডলীর তথ‍্যের অধিকার খর্ব করে এবং তার ফলে অবহিত সুচিন্তিত রাজনৈতিক অভিমত গড়ে ওঠার ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।

ইলেক্টোরাল বন্ড স্কিম প্রণয়নের ফলে কোম্পানি আইন ২০১৩, ইনকাম ট‍্যাক্স আইন ১৯৬১ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫১ সহ একগুচ্ছ বিধিতে বড়সরো পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়। এর আগে কমপক্ষে তিন বছর ধরে বিরাজমান কোম্পানিগুলি তাদের বিগত তিন বছরের গড় মুনাফার ৭.৫ শতাংশের বেশি রাজনৈতিক চাঁদা হিসেবে দিতে পারত না এবং চাঁদার বিস্তারিত বিবরণ ওই কোম্পানির সমস্ত শেয়ারহোল্ডারদের জানাতে হত। রাজনৈতিক দলগুলি আইনত বাধ‍্য থাকত ২০ হাজারের ওপর কোনও চাঁদা পেলেই তার বিস্তারিত তথ‍্য জমা দিতে। ইলেক্টোরাল বন্ড স্কিম বিদেশি কোম্পানির ভারতীয় শাখা সহ যে কোনো কোম্পানিকে যত ইচ্ছে টাকা ঢালার অনুমোদন দিয়ে এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে বণ্ডের মাধ‍্যমে সর্বমোট প্রাপ্ত চাঁদার উল্লেখ করা ছাড়া বাকি সমস্ত তথ‍্য প্রকাশ করার দায় থেকে মুক্ত করে আগেকার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়।

৫ ফেব্রুয়ারি মোদি সরকার লোকসভায় জানায় যে শুরু হওয়ার পর থেকে ৩০টি শাখায় মোট ১৬,৫১৮ কোটি টাকার ইলেক্টোরাল বন্ড ইস‍্যু করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলির সর্বশেষ বার্ষিক আয়ব‍্যয় রিপোর্ট তখনো জমা না পড়ায় এই হিসেবটি ২০২২-২৩ আর্থিক বছরের। এবং এই হিসেব অনুযায়ি বিজেপি পেয়েছে মোট ১২,৯৭৯ কোটির মধ‍্যে ৬,৫৫৫.১২ কোটি টাকা, কংগ্রেসের থেকে (১১২৩.২৯ কোটি টাকা) প্রায় ছয় গুণ। সর্বশেষ হিসেব জমা পড়লে এই ফারাকটা নিশ্চিতরূপে অনেকটাই বেড়ে যেতে দেখা যাবে। বিজেপি ও কংগ্রেসের পরেই আছে নানা রাজ‍্যে ক্ষমতায় থাকা নানান দল। যেমন পশ্চিমবঙ্গে টিএমসি, তেলাঙ্গানায় বিআরএস, ওড়িশায় বিজেডি, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআরসিপি ৩৫০ কোটি টাকার বেশি করে পেয়েছে।

ইলেক্টোরাল বন্ড এইভাবে হয়ে উঠেছে ক্ষমতায় থাকা দলকে কর্পোরেট তহবিল জোগানোর বেনামী হাতিয়ার এবং বিজেপি যেহেতু বেশিরভাগ রাজ‍্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার চালাচ্ছে তাই তারা এই স্কিমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে। ১ হাজার থেকে ১ কোটি পর্যন্ত পাঁচ রকম অঙ্কে বন্ডগুলি ইস‍্যু করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৩এর জুলাই পর্যন্ত বিক্রী হওয়া বন্ড থেকে দেখা যাচ্ছে বন্ডের সর্বমোট অর্থমূল‍্যের ৯৪ শতাংশই বিক্রী হয়েছে ১ কোটির অঙ্কে এবং ৫ শতাংশের বেশী হয়েছে ১০ লাখের অঙ্কে। খুবই স্পষ্ট যে ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ‍্যমে যারা টাকা দিচ্ছেন তাঁরা সব বড় কর্পোরেট দাতা, সাধারণ ব‍্যক্তি মানুষ নন। এটাও বুঝে নিতে হবে যে ইলেক্টোরাল বন্ড কর্পোরেট অর্থদানের বা বেআইনী উপার্জন আদানপ্রদানের অন‍্যান‍্য প্রণালিগুলিকে প্রতিস্থাপিত করে দেয় নি। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনে কাঁচা টাকার ব‍্যবহার এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সরকার ফেলে দিতে বা সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা প্রদর্শনে জনপ্রতিনিধি কেনাবেচায় কালো টাকার ব‍্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিরাট মাত্রায় বেড়ে গেছে।

ইলেক্টোরাল বন্ডের খাত দিয়ে প্রবাহিত বিপুল কর্পোরেট অর্থানুকুল‍্য নিশ্চয় জনসেবামূলক কাজ নয় বা ‘কর্পোরেট সামাজিক দায়দায়িত্ব’ নয়। বিস্তারিত তথ‍্য একবার সামনে এসে গেলেই, দাতা ও গ্রহীতাদের পরিচয় প্রকাশ‍্যে এসে গেলেই, আমরা এইসব কর্পোরেট দান ও তার বিনিময়ে টাকা পাওয়া দলগুলির সরকারে থাকাকালীন কর্পোরেটকে দেওয়া সুবিধার ‘কিছু দিয়ে কিছু পাও’ ছবিটি দেখতে পাব, বিশেষ করে মোদি সরকার ও বিজেপি চালিত রাজ‍্য সরকারগুলির। এই স্কিম আড়ালে রাখতে অনামা থাকার যে পর্দা তা নির্দিষ্টভাবে এই কিছু দিয়ে কিছু পাও –স‍্যাঙাত কর্পোরেট ও তাদের রাজনৈতিক দোসরদের এই বিলা– গোপনে চালিয়ে যেতেই আনা হয়েছে। ইলেক্টোরাল বন্ড স্কিম বাস্তবে অবাধে সীমাহীন কর্পোরেট ঘুষ ব‍্যবস্থারই ভদ্রনাম যা ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ইতিমধ‍্যেই মারাত্মক বিকৃত করে দিয়েছে। এটা স্বল্পসংখ‍্যকের হাতে ধনসম্পদের চরম ঘনীভবন ও ভারতের বড় কর্পোরেটদের আনুকূল‍্যপ্রাপ্ত দলের পক্ষে নির্বাচনী ভারসাম‍্যকে ক্রমবর্ধমান হারে ঝুঁকিয়ে দেওয়ার মধ‍্যেকার সেতু।

এখন দেখতে হবে এসবিআই, ইসি এবং যে মোদি সরকার সাংবিধানিক শাসনের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা বাস্তবে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ি কাজ করে কি না। সরকারের প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, আমরা ভারতের জনগণ নিশ্চয় বিপন্ন ভারতীয় গণতন্ত্রকে বিচারবিভাগের দেওয়া এই বিলম্বিত প্রাণবায়ু থেকে শক্তি নেব এবং সাধারণতন্ত্র ফিরিয়ে নিতে সংগ্রাম তীব্রতর করব। ইলেক্টোরাল বন্ডের আবরণ খোলাকে সকলের সামনে এনে কর্পোরেট ক্ষমতা ও রাষ্ট্র ক্ষমতার বন্ধনকে উন্মোচিত করতে হবে যে বন্ধন সব ব্র‍্যাণ্ডের ফ‍্যাসিবাদেরই এক মূল দিক। একই রকম গুরুত্বপূর্ণ হল, যে সরকার এরকম অসাংবিধানিক স্কিম মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং যা এই অসাধু পথে নেওয়া সুবিধাকে ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক ফাঁস আঁটোসাঁটো করার কাজে লাগাচ্ছে সেই সরকারকে ভোটে হারানো।

বঙ্গানুবাদে এমএল আপডেট সম্পাদকীয়, ২০ – ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

Related Articles

Back to top button
error: