Highlightউপসম্পাদকীয়দেশ

মোদী না যোগী, কে হবে বিজেপির মুখ

আখের আলি

পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বিজেপি প্রসার ঘটাতে চাইছিল তা তো হলোই না বরং তার প্রভাব সারা ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এমনভাবে পড়ল যে, উত্তরপ্রদেশের আসন্ন নির্বাচনে তৈরি করল বিজেপির ক্রাইসিস; মোদি ভার্সেস যোগী। যোগীর রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করলে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া বলুন আর উত্তরপ্রদেশের অলিগলিতে বলুন এখন একটাই চর্চা; কে হবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের প্রধান মুখ? দিল্লির দরবার থেকে যখন কলকাঠি নাড়া হচ্ছিল তখন যোগী দেখালেন তার খেলা। মোদী, অমিত শাহ যখন ভাবল পশ্চিমবাংলায় যে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে তা ফিরে পাওয়ার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে উত্তর প্রদেশ। তাই দিল্লি থেকে কল কাটি নাড়া দিলেও যোগীকে মোটেও বাগে আনা যাচ্ছে না। যোগী দিল্লিতে দরবার করলে তাতে রাজনৈতিক সৌজন্যে বজায় থাকলেও সমস্যার সমাধান বের হল না। বরং যোগী নতুন করে উপলব্ধি করল খেলতে হবে তাকে অন্যভাবে। সেই সঙ্গে আরএসএস ও বিজেপির ঘরে বাইরে খেলা শুরু হয়ে গেল। যোগী চাইছেন প্রচারের মুখ মোদি নয়। প্রচারের নীতিনির্ধারক অমিত শাহ নয়। সব হবন তিনি নিজেই। আরএসএস পড়লো উভয় সংকটে। যোগীকে ছাড়তে পারছেনা। আবার মোদিকে ধরতে পারছে না। যোগী যদি আলাদা করে হিন্দু সেনাদের নিয়ে হিন্দুত্বের আলাদা ধ্বজা তুলে বসে, তাহলে নতুন সংকট তৈরি হবে। অন্যদিকে মোদি ও অমিত শাহ- এর লাগাম টানা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের হেরে যাওয়ার সুযোগে তা করাই যায়। তাই যোগী হবে এই কাজের দক্ষ সেনাপতি।
তাহলে কি আর এস এস যোগী আদিত্যনাথের উপর এতই নির্ভরশীল যে তাকে ভরসা করে ইউপির রাজনৈতিক বৈতরণী পার হয়ে যাবে? মনে তো হয় না। ইদানিং বারানসি ও গোরক্ষপুর দুটো জায়গায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে হেরেছে বিজেপি। ভরসা পুরো না থাকলেও উপায় নেই। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে উত্তরপ্রদেশের যে করুণ অবস্থা ধরা পড়েছে তার জন্য যোগীর থেকে লোক মোদিকে বেশি দায়ী করছে। তাই যোগী এখন আরএসএস এর কাছে মন্দের ভালো। তাছাড়া আরএসএস যে বিদ্বেষ ও বিভাজনের নীতি নিয়ে চলে; তা বেশি বেশি করে চালাতে ও হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণ করতে যোগী প্রথম পছন্দ। যোগী প্রথম থেকে এখনো পর্যন্ত সেই কাজ করে যাচ্ছে নিপুণভাবে।
তাই কেশবচন্দ্র মৌর্য যখন বলেন নির্বাচনের পরে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হবে তখন যোগী সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যায় উপ মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে। যা এর আগে কোনদিন ঘটেনি। যোগীর সঙ্গে ছিলেন দত্তা দেহস বলে; যার স্থান আরএসএস এর দ্বিতীয় চেয়ারে। আর কৃষ্ণ গোপাল জি; যিনি বিজেপি ও আরএসএস এর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখেন।
যোগী কেশব মৌর্য কে বোঝান আর কতদিন দিল্লির মুখ চেয়ে রাজনীতি করবে? পুরোপুরিভাবে আমার সঙ্গে চলে এসো। কারণ আমাকে ও তোমাকেই তো চালাতে হবে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি। তার ফলস্বরূপ কেশব মৌর্য এখন চুপ করে আছেন।
এখন প্রশ্ন অনেক। মোদির অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? যদি ইউপিতে বিজেপি জিতে যায় ও প্রচারের মুখ হিসেবে মোদি না থাকেন। তাহলে কি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার মোদি থাকবে? আবার যদি উত্তরপ্রদেশে বিজেপি হেরে যায় তাহলে মোদির অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
এই আশঙ্কা কিন্তু মোদির মনের মধ্যেও ঘনিয়ে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গ গেল। বিহার আছে কিন্তু নীতিশের চালের কাছে মোদির হনুমান এল জে পি এখন দু’ভাগে বিভক্ত। এল জে পি প্রধান চিরাগ পাস্বান প্রায় শেষ। এল জে পি মিশে যেতে পারে নীতীশ কুমারের সঙ্গে। ক্ষতি কিন্তু বিজেপির হচ্ছে।
প্রসঙ্গত বলি, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল দিল্লি গেলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন. কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে দেখা করলেন। ভেবেছিলেন কিছুতো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা যাবে। রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেই প্লান কাজে এলোনা। ফলস্বরূপ রাজ্যপাল নিজেকে বিজেপির মুখপাত্র হিসেবে প্রমাণ করলো। বিজেপির ভাবমূর্তি তথা মোদী ও শাহ এর ভাবমূর্তি বাংলায় আরো খারাপ হল। উদ্ধব ঠাকরে মাঝে মাঝে দিল্লি এলেও তাতে চিড়ে ভেজে না। মারাঠিরা আর যাই হোক নিজেদের রাজনৈতিক সত্তা বিকিয়ে দেবে না। এই মুহূর্তে বিজেপিতে ফিরে আসা তো দূরের কথা বরং বিভিন্ন বিষয়ে লড়াই করার মুডে আছেন উদ্ধব ঠাকরে।
তাহলে যা দাঁড়াচ্ছে; পশ্চিমবঙ্গ গেল। বিহার সরে দাঁড়াচ্ছে। মহারাষ্ট্র অধরা। তামিলনাড়ু হাতে নেই। তেলেঙ্গানায় ডাল গলবে না। অন্ধ্রকে ধরা যাবেনা।
অংকের হিসেব বলছে পশ্চিমবঙ্গের ৪২; বিহারের ৪০; মহারাষ্ট্রের ৪৮; তামিলনাড়ুর ৩৯; তেলেঙ্গানার ১৭; আর অন্ধ্রপ্রদেশের ২৫; এই ছয়টা রাজ্যের মোট লোকসভার আসন সংখ্যা ২১১। যার উপর মোদির কেরামতি খাটবে না। তাহলে এখন শুধু ভরসা উত্তরপ্রদেশ। আর উত্তরপ্রদেশের ৮০ টা আসন হবে মোদির তুরুপের তাস। সেই জন্য আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন মোদির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যোগী হচ্ছে তার গলার কাঁটা। না পাচ্ছে তাকে গিলতে। আর না পারছে তাকে ফেলতে।
ভাবুন তো ইউপি বিধানসভা নির্বাচনে যদি বিজেপি হেরে যায় আর ২১১টা আসনের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের ৮০টি আসন যোগ হয়; তাছাড়া ছোট রাজ্যের কথা বাদই দিলাম; ওদিকে কংগ্রেস তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না! তাদের আসনসংখ্যা ২০২৪ এ বাড়বে। সে যে কোনো কারণেই হোক। তাহলে ২০২৪- এর সমীকরণ কি হবে? কোথায় যাবে ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি? কোথায় যাবে ২০২৪- এর মধ্যে হিন্দু রাষ্ট্রের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?
এখন বড় প্রশ্ন ইউপিতে নির্বাচনের ফলাফল কি হতে পারে? বারানসি ও গোরক্ষপুর পঞ্চায়েত নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি জিতেছে বটে; তবে তাদের কাজের জন্য নয়। করোনায় মোদির ব্যর্থতা; রাজ্যের নির্মমতা ও সত্য গোপন করার প্রবণতা; সাধারণ জনগণের হাহাকার; সব মিলিয়ে মন্দের ভালো হিসেবে অখিলেশ যাদবকে সবাই বিকল্প হিসেবে ভাবছে। তাই স্লোগান “এবার ইউপিতে খেল হই”। কারণ রাজ্যের খবরে বলা হয়েছে ৯ মাসে ৩ লক্ষ্য ৯০ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু অখিলেশ যাদব আর টি আই এর মাধ্যমে খুব সচেতনভাবে জনতার দরবারে পৌঁছে দিয়েছে ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি লোক মারা গেছে।
অবশেষে প্রশ্ন এসে যায় উত্তরপ্রদেশে এবারের নির্বাচনে অন্যান্য দলের ভূমিকা কী হবে? আর মায়াবতীর বা অবস্থান কোথায়?
দিল্লি চায় ছোট ছোট দলকে নিয়ে চলতে। যাদের মধ্যে শুকদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি যাদের আসন সংখ্যা মাত্র ৪টি প্রাপ্ত ভোট্ ৬ লক্ষ্য; নিষাদ পার্টি যাদের আসনসংখ্যা ১টি প্রাপ্ত ভোট ৫.৫ লক্ষ্য। আর আপনা দলের ৯টি আসন ও প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা সাড়ে ৮ লাখ। যেদিন যোগী অমিত শাহের সঙ্গে দিল্লিতে দেখা করে সেদিন আপনা দল ছিল শাহের সঙ্গে। কিন্তু যোগী চায় না এইসব ছোট দলের সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতা করতে। তার রাস্তা পরিষ্কার হিন্দুত্বের রাস্তা। সেই সঙ্গে মায়াবতীর বহু জন সমাজবাদী পার্টি বিজেপির সঙ্গে আছে এই খবর যদি ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলেই বা কেমন হয়?
কিন্তু প্রশ্ন মায়াবতীর প্রাপ্ত ১ কোটি ৯২ লাখ ভোট কোন দিকে যাবে? বলাবাহুল্য মায়াবতী এখন রাজনৈতিক সংকটে ভুগছে। তাই এবারের নির্বাচনে তাকে ইউপির মানুষ বিকল্প ভাববে না। অন্তত মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করবে না। তাই যে খবর ছড়াক না কেন আখেরে অখিলেশের লাভ হবে। কারণ ইউপির জনগণ এবার দায়িত্ব নিয়েছে বিজেপি কে হঠাতে হবে। মায়াবতীর কিছুটা ভোট অখিলেশের ঝুলিতে যাবে। যেমনভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাম ও কংগ্রেসের ভোট দিদির ঘরে ঢুকেছিল। আর সেইসঙ্গে রাকেশ টিকায়েতের কৃষি আন্দোলন ও কিছুটা সহযোগী হয়ে উঠবে।

Related Articles

Back to top button
error: