আদিবাসী সমাজের মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছবি উঠে এল সাঁইথিয়ার গৌরাইপুর গ্রামে

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, বীরভূম: আদিবাসী সমাজের মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছবি উঠে এলো বীরভূমে। ভারতীয় কোন সংবিধান নয়, এখনো এই সমাজের কিছু অংশে আইন-কানুন নিয়ম চলে মোড়ল এর কথায়। সালিশী সভায় গ্রামের মোড়লের বিচারের প্রতিবাদ করেছিলেন তারা যে নিরপরাধ যুবককে অপরাধী সাজিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। সেই প্রতিবাদের কারণে গ্রামের বেশকিছু পরিবারকে সামাজিক বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছিল মোড়লের পক্ষ থেকে। ঘটনাটি ঘটেছে সাঁইথিয়া থানার গৌরাইপুর আদিবাসী গ্রামে। বিষয়টি নজরে আসার পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া থানার গৌরাইপুর আদিবাসী গ্রামের বারোটি আদিবাসী পরিবারের ৮০ জন সদস্যকে সামাজিক বয়কটের ডাক দিয়েছিল ১ আদিবাসী মোড়ল। ঘটনার সূত্রপাত বছরখানেক আগে একজন আদিবাসী যুবক কে পরকীয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে জরিমানা করা হয়। ওই যুবক জরিমানা না দেওয়াই তাকে সামাজিক ভাবে বহিষ্কারের ডাক দেওয়া হয় তখন। ইতিমধ্যেই দিন পনেরো আগে গ্রামে বহিস্কৃত ওই যুবকের ভাইজির বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। ফের সেই মোড়ল পুনরায় ফতেয়া জারি করে বিয়েতে বহিস্কৃত যুবক অংশগ্রহণ করলে সে যাবে না। মোড়লকে অগ্রাহ্য করে সে ভাইজির বিয়েতে অংশগ্রহণ করে। তারই ফলস্বরূপ গত বুধবার ওই গ্রামে সালিশি সভা বসিয়ে ওই গ্রামের বারোটি পরিবারকে একঘরে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মোড়লের পক্ষ থেকে। ওই পরিবারের ৮০জন সদস্য গ্রামের পুকুরের জল, টিউব-ওয়েলের জল সহ অন্যান্য কোন সুবিধা নিতে পারবেন না বলেও সালিশি সভায় ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিষয়টি বীরভূম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানার পর সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেহেতু কোনো লিখিত অভিযোগ হয়নি তাই বিষয়টি দুই পক্ষকে বসিয়ে মিটমাট করে দেওয়া হয়েছে।

মোড়লের নিদানে সামাজিক বয়কট হওয়া পরিবারের সদস্য মঙ্গল সরেন বলেন, “শুধুমাত্র সালিশি সভায় বিচার নয়, তাদেরকে শারীরিকভাবে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ওই পরিবারের সদস্যরা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জল আনতে গেলেও বাধা দিচ্ছেন মোড়ল এবং তার অনুগামীরা। প্রায় এক বছর আগে একটি সালিশি সভা হয়েছিল। যেখানে তার কাকার ছেলেকে একটি পরকীয়া সম্পর্কের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। “যেহেতু সে নির্দোষ। তাই আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। তখন গ্রামের আঠারোটা পরিবারকে বয়কট করা হয়েছিল। পরে মারধর করে ছটা পরিবারকে নিজেদের দলে নিলেও, আমরা আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তে অটুট ছিলাম বলে গত বুধবার, আবারও সালিশি সভা বসিয়ে, আমাদের পরিবারগুলোকে সামাজিক বয়কট রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় আমি সহ আরও কয়েকজন তাদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি”। মোড়ল শরৎ হেমরম সালিশি সভা বসিয়ে বিচার হয়েছে বলে স্বীকার করে নেন এবং তিনি বলেন, “আমি গ্রামের মোড়ল। ওরা আমাকে মোড়ল ঠিক করেছে। আমি ওদের জন্য। ওদের কথা যেমন আমাকে শুনতে হবে, সেরকম আমার কথাও ওদেরকে শুনতে হবে”।

বীরভূম জেলা পুলিশ সুপার নগেন্দ্র নাথ ত্রিপাঠী বলেন,” বিষয়টি নজরে আনার পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দুই পক্ষকে বসিয়ে সমস্যা সমাধান করা হয়েছে যদিও ঘটনার কোনো লিখিত অভিযোগ হয়নি।”