গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-১১)

 

প্রত্যাশা মতো চাহিদা পূরণ করতে না পারায় বাড়ির সঙ্গেও রিজু সুসম্পর্ক ধরে রাখতে পারেনা। আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারেনা। মন জয় করা খুব কঠিন কাজ। সব সময় ভাই বোনদের কথা মনে করলেও কেউ তাকে বিশ্বাস করে না। তাতে যদি বাবার সমর্থন থাকে তাহলে তো কথাই নেই। ছেলে মেয়েদের সামনে মিজানুর সাহেব প্রায়ই বলেন, “রিজু ইচ্ছা করলে তোমাদের সব চাহিদা পূরণ করতে পারতো।”

ভাই বোনেরা বড়ো ভাইয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশা মতো কিছু না পেয়ে তাদের মনের মধ্যে রিজুর বিরুদ্ধে একটা অভিমান জমা হয়। তার সঙ্গে যেন ছোট ভাই বোনদের কোথাও দৃঢ় বিশ্বাসে ফাটল ধরে। তাদের বিশ্বাস, “ভাই চাকরি করে। অনেক টাকার মালিক। ইচ্ছা করলেই দিতে পারে।” কিন্তু রিজুর বাবা মা কোনদিনই তাদের বলেননি রিজুর সহযোগিতার কথা। তার সাধ্যের কথা, তার সমস্যার কথা।

মাসুম মাঝে মধ্যে বলে, “ভাই, আপনি যদি মাসে মাসে কিছু টাকা আব্বাকে দেন তাহলে আব্বার কষ্ট দুর হয়। আব্বাকে দেখে মায়া হয় গো ভাই!”

রিজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে তো সাধ্যমত টাকা বাবার হাতে তুলে দেয় তবুও……….! রিজু বুঝতে পারে ভাই বোনদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়েছে। যার পরিনতি ভবিষ্যতে ভালো হবে না।

এদিকে মাসুম বড়ো হয়। বিএ পাশ করে। একটা সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েকে বৌ করে আনে। নেহারের বড়ো আশা, “বড়ো ছেলে বৌ নিয়ে বহরমপুরে থাকে, একটুও উপকারে আসলোনা। মায়ের কষ্ট বুঝলোনা। অনেক ছেলেই তো বাড়ি থেকে অনেক দূরে চাকরি বাকরি করে, তাই বলে কি তারা সবাই বৌ নিয়ে চলে যায়? এবার নতুন বৌ এলে একটু হাতে হিল্লে হবে। একটু আরাম হবে।”

নতুন বৌকে শ্বশুর শাশুড়ি খুব আদর যত্ন করেন। মিজানুর সাহেব নতুন বৌমাকে বলেন, “টুম্পা, এবাড়ির সব কিছুতেই তোমার সমান অধিকার। সব নিজের মনে করবে। তুমি এই বাড়ির শুধু বৌমা নও, এই বাড়ির মেয়ে। তুমি আমার মেয়ে।”

নতুন শ্বশুর আব্বা, আম্মা ও বৌ পেয়ে মাসুম খুব খুশি। শ্বশুর মশাই বেড়াতে এলে মাসুম দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে খবর দেয়, “আব্বা,আব্বা গো! আব্বাজান এসেছেন।”

ছেলের কথা শুনে মিজানুর সাহেবের মনে কেমন যেন একটু কষ্ট জমা হয়। যে ছেলে তার জন্মদাতা পিতাকে কোনদিন আব্বাজান বলে ডাকেনি সেই ছেলে শ্বশুর মশাইকে আব্বাজান বলে সম্বোধন করছে। মনের অজান্তেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন! ঠোঁটের কোণে একটা শুষ্ক হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ছুটে যান বেয়াই মশায়ের কাছে। হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন। নেহার রান্না ঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

টুম্পা কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে যায় এই বাড়িতে শাশুড়ির চেয়ে বৌমার গুরুত্ব বেশি। অন্তত শ্বশুরের কাছে। সুতরাং শ্বশুরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে এই বাড়িতে সব কর্তৃত্ব তার হাতে।

কিছুদিন পর শাশুড়ি বৌমার সাতকাহন পালা শুরু হয়। শ্বশুরের আস্কারায় নতুন বৌমা সাংসারিক কাজে হাত দেয়না। বয়সের ভারে দুর্বল শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে সংসারের কাজ সামলাতে হয় নেহারকে। মিজানুর সাহেবের এসব চোখে পড়েনা কখনো। নতুন বৌ শাশুড়ির একটু সাহায্য করলেই বৌমার প্রশংসার শেষ থাকে না। এতে ভিতরে ভিতরে নেহারের রাগ হয়। স্বামীর উপর একরাশ অভিমান জমা হয় বুকে। তার অভিমানকে মোটেও গুরুত্ব দেননা মিজানুর সাহেব। ফলে একটা দুঃখ কষ্টের পাহাড় বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় নেহারকে। তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে টুম্পার উপর। রেগে গেলে টুম্পার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন। নেহারের এটা একটা বড়ো রোগ। কারও উপর রেগে গেলে গুমরে গুমরে থাকেন। কাউকে কিছু বলে মনকে হালকা করে নিতে পারেন না। বড়ো ছেলেকে ফোন করে অভিযোগ করেন, “মাসুম কত ভালো ছেলে ছিল। সব সময় আমার খবর রাখতো। আমার কথা মতো চলতো। এখন ও আর আমার ছেলে নেই রিজু! ছেলে বৌ ভাড়ুয়া হয়ে গেছে। আমার আর কদর নেই বাড়িতে। মাসুম বৌ এর কথা শুনে আমার সঙ্গে ঝামেলা করে। বৌমা কথায় কথায় তর্ক করে। তোর আব্বাও কিছু বলেননা। আমি একা হয়ে গেছি রে রিজু!”

মায়ের কান্না জড়ানো কথা শুনে রিজু চিন্তিত হয়। ঝামেলা মেটাতে হবে। বাড়তে দেওয়া যাবেনা। মাসুমের সঙ্গে ফোনে কথা বলে। মাসুম উল্টে মায়ের আচরণকে দোষারোপ করে। রিজু বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ঝামেলা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। বহরমপুর থেকে ডোমকল ছুটে যায় রিজু। সবাইকে নিয়ে একসাথে বসে মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

আবেগ ও অতি স্নেহ বশতঃ টুম্পার প্রতি মিজানুর সাহেব বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ফলে রিজু কোন পরামর্শ দিলে তিনি টুম্পার কানে তুলে দিয়ে রিজুকে খারাপ করে তোলেন। এই ধরনের ছেলেমানুষি তার বরাবরের। এর পরিনাম যে খারাপ হতে পারে তিনি কোনোদিন ভাবেননি। ফলে মাসুম এবং টুম্পার কাছে ক্রমশঃ খারাপ হয়ে ওঠে রিজু। নেহার রিজুকে বলেন, “তোর আব্বার জন্যই বাড়িতে এত অশান্তি । একেবারে মেয়েদের মতো পেট পাতলা। আমি যা কিছু বলি,তুই যা কিছু বলিস, সঙ্গে সঙ্গে মাসুম আর টুম্পাকে না বললে রাতে ঘুম হয় না তার।”

নেহার কাঁদেন! কাঁদেন তার স্বামীর নীরবতার জন্য ! কাঁদেন ছেলে- বৌমার আচরণের জন্য! তার সুখ স্বপ্নের আশাগুলো কালো মেঘে ঢাকা পড়ে। ছেলে বৌমা নিয়ে মায়ের সুখের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।

বাড়ির অভিভাবক যখন সিদ্ধান্ত হীনতায় ভোগেন তখন স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িতে অশান্তি প্রবেশ করে। রিজু মায়ের দিকে তাকিয়ে অনেক বুঝিয়েছে বাবাকে। কমপক্ষে বাড়িতে মা যেন গুরুত্ব পান। তিনি উল্টে রেগে গেছেন রিজুর প্রতি। রিজুর প্রতি ছোটদের অভিমান থাকলেও তারা রিজুকে বেশ মেনেই চলে। বাড়িতে বড়ো ছেলের গুরুত্ব দেখে মিজানুর সাহেব হীনমন্যতায় ভোগেন। পিতা পুত্রের মধ্যে একটা ইগো কাজ করে। রিজুর প্রতি মিজানুর সাহেব অসন্তুষ্ট থাকেন। ধীরে ধীরে তার ছোট ভাই বোনদের কাছে রিজু মর্যাদা হারায়। শত দোষ করলেও মাসুমের কোনো দোষ ত্রুটি মিজানুর সাহেবের চোখে পড়ে না। ক্রমশঃ নেহারও বাড়িতে গুরুত্ব হারান। রিজুকে বলেন,” তোর আব্বাই তো আমার গুরুত্ব কোনদিন দেয়নি। বিয়ের পর আজ পর্যন্ত কোনোদিন কোনো কথা বলে শান্তি পাইনি। আমার পোড়া কপাল!”

চোখের জল ফেলেন নেহার। রিজুকে মনের ব্যথাটা শেয়ার করে একটু শান্তি খোঁজার চেষ্টা করেন।

শাশুড়ি বৌ এর দ্বন্দ্বে একটা সময় মাসুমের সংসার আলাদা হয়। সে বৌ নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যায়। গ্রামে গিয়ে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। নেহারের উর্ধ্বে ছেলে বৌমাকে অত্যাধিক প্রশ্রয় দিয়ে মিজানুর সাহেব কত বড়ো ভুল করেছেন তা তিনি হাঁড়ে হাঁড়ে টের পান। অগত্যা রিজুকে ফোন করেন। বলেন, “আমাকে না জানিয়ে মাসুম বাগানের অনেক বাঁশ বিক্রি করে দিয়েছে। তোমার মা ওখানে গেলে প্রতিবেশী এক মহিলাকে দিয়ে অপমান করিয়েছে। আমার নামে পাড়ায় দুর্নাম দিয়ে বেড়াচ্ছে। কী করি বলো? আমিও আর সহ্য করতে পারছিনা। আমার ছেলে এতোটা অবাধ্য হবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। ওকে আমার খুব ভয় করছে। তুমি এসে একটু মিমাংসা করে দাও। আর ভালো লাগছে না। তোমার কথা যদি মাসুম শুনে।”

রিজু উত্তর দেয়, “আমাকে এর মধ্যে আর জড়িয়েন না আব্বা। আপনার দ্বিমুখী আচরণের জন্যই আজ ও এত সাহস পেয়েছে। যে ছোট ভাই আমার দিকে কোনোদিন মুখ তুলে তাকাতো না সে ভাই মুখে মুখে তর্ক করতে শিখেছে। আপনার চোখের সামনে ছেলে বৌমার আচরণে যে বাড়িতে মায়ের চোখ প্রতিনিয়ত সিক্ত হয়েছে, মা অপমানিত হয়েছেন সেই বাড়ির কোনো বিষয়ে আমার মাথা ঘামানোর ইচ্ছা নেই আব্বা। আপনার পক্ষপাতিত্ব ও দুর্বল ভূমিকা আজকের এই পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। এই বিষয়ে আপনি মাসুমের সঙ্গে কথা বলে সতর্ক করুন।”

রিজুর এই সত্য কথাটা মিজানুর সাহেব কোনো মতেই মেনে নিতে পারেননা। এই জন্যই রিজুকে তার ভালো লাগে না। তিনি আর কথা বলেন না। রিজু বুঝতে পারে তার কথায় বাবা কষ্ট পেয়েছেন। পরক্ষণেই ক্ষমা চেয়ে নেয়! বলে, “আব্বা আপনি আমার কথায় রাগ করবেন না। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে।”

ছোট দুই ভাইকে নিয়ে রিজু মাসুমের কাছে গ্রামের বাড়ি যায়। তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে। রিজু বুঝতে পারে ওর মাথাটা বিগড়ে গেছে। এখন ও কাউকে বিশ্বাস করে না। কোনো কথা শুনতেও চায়না। তর্কে জড়িয়ে যায়। রিজুকে অপমান করে। সহ্য করতে না পেরে মাসুমের গালে সপাটে একটা চড় মারে। পাল্টা সেও রিজুর উপর হাত তোলে। আবির, মেহবুব মাসুমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটা দক্ষযজ্ঞ বেঁধে যায়। টুম্পার চিৎকারে পাড়ার লোকজন জড়ো হয়। পাড়ার একজনের উস্কানিতে পেছন থেকে মাসুম হঠাৎই রিজুর ঘাড়ে কিল বসিয়ে পালিয়ে যায়। রিজু বুঝতে পারে মাসুম কতটা নিচে নেমে গেছে। এটা শুধু মাসুমেরই একমাত্র দোষ নয়। রিজু সম্পর্কে ওকে ভুল বোঝানো হয়েছে ।কারণ রিজু বহরমপুর থাকে। ও এই বাড়ির কেউ নয়। সুতরাং এই বাড়ির কোনো বিষয়ে রিজু নাক গলাবে এটা তার বাবাও মেনে নিতে পারেন না। রিজুর প্রতি মায়ের এবং ছোট তিন ভাইয়ের অগাধ ভরসা তার বাবাকে হীনমন্যতায় ভোগায়। তার ফল স্বরূপ তার আচরণ রিজুর বিরুদ্ধে যায়। রিজুর বিরুদ্ধে একটু একটু করে বিষ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে প্রবেশ করে। বিশ্বাসের সম্পর্কটা ভিতরে ভিতরে এতটা বিষাক্ত হয়ে যাবে সেটা মিজানুর সাহেবও ঘুণাক্ষরে টের পাননি। এসব কারণে রিজু ছোট ভাইকে অপরাধী মনে করে না। সে তার ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়। তবুও রিজুর প্রতি মাসুমের রাগ থেকেই যায়। সময় হলে সে তার প্রতিশোধ নেবে।

মাসুম বৌকে অসম্ভব ভালবাসে।ওদের ভালবাসা দেখে বাড়িতে কানাঘুষা হয়। সবাই বলাবলি করে, “মাসুমকে মনে হয় গাছ খাইয়ে বশ করে রেখেছে টুম্পা। না হলে মা ভক্ত ছেলে কী করে বৌ এর আঁচলে মুখ লুকায়?” তাতে মাসুমের কিছু আসে যায় না। তার জন্মদাতা পিতা মাতা আস্তে আস্তে পর হয়। জায়গা দখল করে টুম্পার পিতা মাতা। ওরাই হয়ে ওঠে মাসুমের আসল আব্বা আম্মা।