ভবঘুরে ‘পাগল’ নাজমুলকে ভাইয়ের মতো বুকে টেনে নিলেন থানারপাড়ার ওসি অভ্র বিশ্বাস

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, করিমপুর: লকডাউনে পথে পথে ঘুরছিল ভবঘুরে। পাড়ার লোকেদের মুখে সে ‘পাগল’ নামে পরিচিত। লোকের কাছে হাত পেতে যা কিছু পয়সা পেত তা দিয়েই চলত ওর পেট। রাতবিরেতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফুটপাতেই কাটতো ওর রাত। এমনই এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের পরিবারের সঙ্গে রেখে পরিচর্যা করছেন ওসি অভ্র বিশ্বাস। নদিয়ার থানারপাড়া থানার ওসির এই মহানভবতায় খুশি এলাকাবাসীও।

জানা গেছে, বছর বাইশের ওই ‘পাগল’ নাজমুল হোসেনের বাড়ি মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার চোঁয়া গ্রামে। ডিউটিতে বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী হাগনাগাড়িতে প্রায়ই ওসি অভ্র বিশ্বাসের নজরে পড়ত নাজমুল। তারপর তাকে সেখান থেকে থানায় নিয়ে আসে থানারপাড়া থানার ওসি অভ্র বিশ্বাস। তিনি তাকে থাকার জায়গা করে দেন। নিয়মিত ওকে খেতে দেন ওর পছন্দের খাবার। কিনে দেন নতুন পোশাকও।

একসময় যাকে যারা ওকে ‘পাগল’ বলতো তারাই এখন সম্মান করে। ওসি জানাচ্ছেন, ও পাগল নয়, মানসিক প্রতিবন্ধি। ছোটবেলা থেকে যদি ও ভাল চিকিৎসা পেত তাহলে ঠিক হয়ে যেতে পারত। তবে ওকে আমার পরিবারের সঙ্গে রাখার পর কেমন একটা অদৃশ্য মায়া তৈরি হয়ে গেছে। আমরা একই সঙ্গে খায়। আমার স্ত্রীও ওকে খুব ভালোবাসে।

সম্পুর্ন বাক্য বলতে না পারলেও কথা বলতে পারে নাজমুল। স্মৃতি শক্তিও প্রখর। স্থানীয়রা বলছে একবার একটা কথা বলে দিলে সেটি কখনো সে ভোলে না। নিজে দরিদ্র ঘরের ছেলে বলে অসহায়দের প্রতিও ওর অসম্ভব মায়া। ভালোবেসে কেউ দশ-বিশ টাকা দিলে সেটি জমিয়ে রাখে নাজমুল। কখনো কখনো সেই টাকা বাড়িতে বাবার কাছেও পাঠায়। এবারের ঈদ উপলক্ষে তার জমানো সঞ্চয় থেকে গরীবদের কিছু পোশাকও কিনে দিয়েছে নাজমুল।

এই প্রতিনিধি থানার কোয়ার্টারে নাজমুলের কাছে গিয়ে দেখে অনেক গুলি পোশাক হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে সে। এগুলি কি হবে জিজ্ঞেস করতেই তিন শব্দে নাজমুলের জবাব, ‘ঈদে-ন্যাংড়া-কানা।’ ও বোঝাতে চাইছে যারা প্রতিবন্ধী, অন্ধ ঈদ উপলক্ষে তাদের সেগুলি দান করবে। কেমন লাগে এখানে থাকতে, ওর সটান উত্তর, ‘ভালো ভালো খুব ভালো।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী সাঈদ আনোয়ার বলছিলেন, মানবিক ওসি সাহেব মানসিক প্রতিবন্ধী ওই ছেলেটিকে যেভাবে পরিচর্যা করে মানুষ করছেন দেখে আমরা অভিভূত। নাজমুল এখন নিজের থেকে অন্যদের দানও করে।

থানারপাড়া থানার ওসি আরও জানালেন, ‘মানুষের সেবা করা মহান কাজ। সেই কাজটাই করার চেষ্টা করেছি মাত্র। আমার স্ত্রী তো নাজমুল কে ছেড়ে এখন আর বাড়িই যেতে চায় না।’ ওসির স্ত্রী দীপান্বিতা দাস বললেন, ‘অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে যে কত আনন্দ আর সুখ লুকিয়ে আছে তা কেবল সেই জানে যে মানব সেবা করে। নাজমুল তো এখন আমার পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে।’ নাজমুল কে এখন আর চোখের আড়াল হতে দেন না ওসি। থানার আশপাশের চায়ের দোকানে বসা লোকেরাও এখন ‘পাগল’ নাজমুল হোসেন কে সম্মান না দিয়ে পারেন না।

নাজমুলের বাবা খলিল খান বলেন, আমার ‘পাগল’ নাজমুল কে ওসি সাহেব যেভাবে আদর যত্ন ভালোবাসা দিয়ে নিজের কাছে রেখেছেন তা মুখে বলা সম্ভব নয়। ও এখন আর বাড়িতে আসতে চায়না। নাজমুলকে কেন্দ্র করে ওসির পরিবারের সঙ্গেও আমাদের একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মেয়ের বিয়েতেও ওসি সহ থানার পুলিশরাও এসেছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ।

জানা গেছে, শুধু নাজমুলের দেখাশোনাই নয়। লকডাউনের শুরু থেকেই এলাকার বিভিন্ন অসহায় দরিদ্রদের নিয়মিত খাবারও পৌঁছে দিচ্ছেন ওসি। ঈদে দুঃস্থদের পোশাকও দান করেছেন তিনি। আর একাজে পাশে থেকে উৎসাহ জুগিয়ে মানবিক ওসি কে সব সময় সহযোগিতা করে আসছেন স্ত্রী দীপান্বিতা দাসও।