নিজের দলের গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আগে ব্যাবস্থা নিন মুখ্যমন্ত্রী

মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা : তৃতীয়বারের জন্য জনা দেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। তিনি যেমনভাবে বাংলার জনগণের আশীর্বাদ পেয়েছেন তেমনি তাঁর কাছেই জনগণের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তৃতীয় বার শপথ নেওয়ার পরপরই তাঁর সামনে সর্বপ্রথম যে কাজটি এসে পড়ে সেটি হল নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক হিংসা থামিয়ে রাজ্যকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা।

স্বাভাবিকভাবেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ গ্রহণের পরপরই কোভিড নাইনটিন পরিস্থিতি নিয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। বিষয়টি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার নয়। মুখ্যমন্ত্রীও তাঁর কয়েকটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি বিষয়টি হালকাভাবে নিতে চান না। কিন্তু নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কয়েকটি শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত জরুরী।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক হিংসায় নিহত ১৬ জন ব্যক্তিকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁর এই ঘোষণা যেন তাঁর অতি পরিচিত খয়রাত এর রাজনীতি হয়ে না ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে কিছু দান করতে হলে তাদেরকে সর্ব প্রথম দিতে হবে সুবিচার।এটাই তাদের সর্ব প্রথম প্রাপ্য।আর্থিক অনুদান সুবিচারের একটি ছোট্ট অংশ হতে পারে কিন্ত সেটাই সব নয়।অপরাধীদের চিহ্নিত করা ও তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা একান্ত জরুরি। যদিও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন সরকারি সাহায্য প্রদানের ক্ষেত্রে বা গুন্ডামি রোধ করার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক রঙ দেখা হবে না। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন দল-মত নির্বিশেষে সকলের প্রতি প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাঁর এই ঘোষণা কার্যকর হওয়া দরকার।

তিনি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন বিজেপির বিরুদ্ধেও। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ নিহত ব্যক্তিদের অর্ধেক তৃণমূল অর্ধেক বিজেপির। তাঁর শপথ গ্রহণ করার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই কেন্দ্রীয় নেতারা যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে এসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছেন তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন।

মমতা ব্যানার্জির এপর্যন্ত এই সকল উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। মানুষ তার কাছে আরো কিছু প্রত্যাশা করেন। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যথার্থ রাজ ধর্ম পালন করবেন এই প্রত্যাশা নিয়েই মানুষ তাকে পুনর্বার নির্বাচিত করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ করতে হলে কতকগুলো দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। কথায় বলে আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি এই নীতি অবলম্বন করে সর্বপ্রথম তার দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, উস্কানি দিয়েছে, মানুষের ঘরবাড়ি লুট করেছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাহলেই রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ হতে বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। কিন্তু যদি এক্ষেত্রে কোনভাবে পক্ষপাতিত্ব করা হয়, প্রশাসনের কর্তারা যদি তৃণমূল নেতাদের গায়ে হাত দিতে সামান্য ভয় পায় তাহলে রাজনীতির হিংসা বন্ধ হওয়ার আশা করা মুশকিল। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব ক্যানিং, হাড়োয়া এই সকল জায়গায় শাসকদলের মদদপুষ্ট গুন্ডারা যেভাবে অত্যাচার চালিয়েছে লুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উপর আবার এক জুলুম চালানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে গৃহচ্যুত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারের অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। শুধু এই নির্বাচন নয় সেই বামপন্থীদের সময় থেকে এই সকল এলাকা সব সময় রাজনৈতিক হিংসায় জর্জরিত থাকে। সুতরাং এই সকল এলাকায় রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ করার জন্য এবং যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি গড়ে তোলা এবং বিজয়ী দেরকে বিনয়ী হতে শেখানো একান্ত জরুরি। গণতান্ত্রিক পরিবেশে উদার সংবেদনশিল, সহনশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার। এক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহণে প্রশাসন পক্ষপাতিত্ব করলে ভুল হবে। প্রশাসনকে যথার্থ সাহস যোগাতে হবে যাতে তারা দলের রং না দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এটা এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি যদি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেন এবং রাজ ধর্ম পালনের আদর্শ স্থাপন করে দেখাতে পারেন তাহলে মানুষ তাঁর চিরদিন মনে রাখবে। শুধু তাই নয় পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে যাবে।