কাজ নেই বাবার, চেয়েচিন্তে সংসারের হাল ধরছে দুই খুদে স্কুল পড়ুয়া ভাইবোন, পাশে দাঁড়াল পুলিশ

রেবাউল মন্ডল, টিডিএন বাংলা, করিমপুর: লকডাউনে কাজ হারিয়েছে বাবা। ওদের ঘর বলতে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি। বাড়িতে বিদ্যুৎও নেই। কথা বলা মোবাইলটা চার্জ দিতে যেতে হয় পাশের দোকানে। বাড়িতে নেই টয়লেটও। কি খাবে তাই নিয়ে চিন্তা। বাধ্য হয়েই কখনো কখনো পাড়া গাঁয়ে খাবারের জন্য চাইতে যেতে হয় দুই খুদে স্কুল পড়ুয়া ভাইবোনকে।

থানারপাড়া থানা থেকে দেওয়া হচ্ছে খাবার

ঘটনা নদিয়ার করিমপুর-২ ব্লকের থানারপাড়ার নারায়ণপুর গ্রামের খাঁ পাড়ার সরিফুল খানের পরিবারের। দুই সন্তান মনিরুল খান ও নুরজাহান খাতুন। ওরা দুজনেই নারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের যথাক্রমে ষষ্ঠ ও পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী। লকডাউনে স্কুল বন্ধ থাকায় কখনো কখনো সরিফুলের দুই ছেলে মেয়েও বের হয় চাইতে। এখবর সামনে আসতেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রেমীরা এগিয়ে আসেন। খবর যায় থানায়। থানারপাড়া থানার পক্ষ থেকে খাবারও দেওয়া হয়।

প্রতিনিধি সরিফুল খানের বাড়িতে গিয়ে দেখেন এক চিলতে ছোট একটি কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে এলেন স্ত্রী টুম্পা খাতুন। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার কথা জিজ্ঞেস করতেই কাঁদতে লাগলেন। আঁচলে চোখ মুছে বললেন, ঠিকমত খাবারই তো জোটে না। ওদের বই খাতা টিউশন এসবের খরচ কোথায় পাব। বারবার বলে আজও সরকারের ঘরটাও তো পেলাম না। এভাবে কি বাঁচা যায় বলুন!’ বাড়িতে আজও পায়খানা বানাতে পারিনি, ঘরে একটি চৌকিও নেই। এই বর্ষায় যেখানে রান্না করি সেখানেই ঘুমাতে হয় বলে জানাচ্ছেন তিনি।

এদিকে মনিরুল ও নুরজাহান জানাচ্ছে, আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মত তারাও পড়তে চায়, বড় হতে চায়। কিন্তু পরিবারের দুর্দশা নিয়ে তাদের কচি মুখেও হতাশার ছাপ। কিন্তু ওদের কি আর পড়াশুনা হবে নাকি এভাবেই চলবে জানে না ওরা কিছুই। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, ওদের বাড়িতে সন্ধ্যে হলেই অন্ধকার। মোবাইল চার্জ দিতে পাশের দোকানে যেতে হয়।

সরিফুলের বাড়িতে খাবার নিয়ে যাচ্ছে ‘আশার আলো’র কর্মীরা

সরিফুল খান বলেন, ‘গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ভাঙাচোরা, প্লাস্টিক কিনে তা বিক্রি করে যে আয় হত তা দিয়েই কোন রকমে সংসারটা চালাতাম। কিন্তু লকডাউন এসে থেকে সেটাও বন্ধ। এখন আমার শরীরটাও ভাল নেই। তাই বাধ্য হয়েই ছেলে মেয়েদের চাইতে পাঠাতে হয়।’

পরিবারটির কথা জানতে পেরে বাচ্চা দুটিকে নিজের বাড়িতে ডেকে বই খাতা পেন কিনে দিয়ে নিয়মিত পড়াচ্ছেন স্থানীয় শিক্ষক মনজুর আহমেদ। তিনি জানান, ‘ওদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। একটা ত্রিপল টাঙানো ঘরেই চারজনের রান্না খাওয়া থাকা। প্রশাসন বা কোন সংস্থা যদি বাচ্চা দুটির পড়ানোর দায়িত্ত্ব নিত ভাল হত। পরিচর্যা পেলে ওরাও একদিন ফুল হয়ে ফুটবে।’

খবর পেয়ে পরিবারটির বাড়িতে তেল চাল ডাল তরিতরকারি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানারপাড়া থানার ওসি অভ্র বিশ্বাস।
৩৫কেজি চাল, ১২কেজি আলু, ২ কেজি ডাল সহ তেল চিনিও তার বাড়িতে দিয়ে এসেছি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আশার আলো’র সদস্য মিলন মিয়া।

নারায়ণপুর-১ পঞ্চায়েত প্রধান মনোয়ারা শাহ বলেন, ‘বাচ্চাদুটিকে ওরা যদি পড়াতে চাই আমরা পড়ানোর দায়িত্ত্ব নিতে চাই। সরকারি ঘরের যখন সার্ভে হয় তখন ওরা বাড়িতে না থাকায় লিস্টে নাম আসেনি। তবুও দেখছি প্রশাসন কে বলে কিছু করা যায় কিনা।’

করিমপুর-২ বিডিও সামসুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, ‘সংসার চলছে না, এমন সমস্যা কেউ আমাকে জানাই নি। যদি কোনও পরিবার আর্থিক সহযোগিতা চায়, অবশ্যই তা বিবেচনা করা হবে।’