HighlightNewsদেশধর্ম ও দর্শন

আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের মন্দির-মসজিদ নিয়ে মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করলেন ডব্লিউপিআই সভাপতি কাসেম রসূল ইলিয়াস

টিডিএন বাংলা ডেস্কঃ আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করলেন ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি কাসেম রসূল ইলিয়াস। বৃহস্পতিবার নাগপুরে আরএসএসের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেছিলেন, ”সমস্ত মসজিদে শিবলিঙ্গ খোঁজার প্রয়োজন কী? রোজ রোজ নতুন করে বিতর্ক তোলা উচিত নয়। জ্ঞানবাপী নিয়ে আমাদের আলাদা ভক্তি থাকতেই পারে, তাই বলে সমস্ত মসজিদে শিবলিঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে বেরিয়ে, জিগির তোলা অনুচিৎ।” শুধু তাই নয়, ওই অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবত আদালতের রায় মেনে চলারও পরামর্শ দেন। ভাগবতের এই মন্তব্যকে একটি চতুরতার সাথে পরিকল্পিত মন্তব্য বলেই দাবি করেছেন ইলিয়াস।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোষ্ট করে ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি জানিয়েছেন,”আর এস এস প্রধান ইতিহাস তো অবশ্যই জানেন এবং তিনি সব কিছুই জানেন যে কোন মন্দির কি কারণে ভাঙ্গা হয়েছিল, কে ভেঙ্গেছিল আর মসজিদগুলি যে কোনও মন্দিরের ওপরে তৈরি হয়নি তাও তিনি জানেন।“
বাবরি মসজিদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ইলিয়াস আরও বলেন,”বাবরি মসজিদের বিষয়েও এটা বলা হচ্ছিল যে রাম মন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কোনও মন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে মুভমেন্ট শুরু হয়েছে তাকে উনি( মোহন ভাগবত ) একপ্রকার সমর্থন করছেন। আর তাই উনি বলছেন যে ঠিক আছে এখন আদালতের সিদ্ধান্ত হবে তাই আমরা মেনে নেব। এই কথা আগেও বলা যেতে পারত কিন্তু, আগে একথা বলা হয়নি।তখন বলা হয়েছিল আমরা যে কোনও উপায়ে রাম মন্দির ফেরত নেব।“

একইসঙ্গে ইলিয়াস মোহন ভাগবতের বলা আরও কয়েকটি মন্তব্য তুলে ধরে বলেন,” উনি বলেছেন অন্যান্য মন্দির নিয়ে যে দাবি উঠছে তার সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু, যারা এবিষয়ে মন্তব্য করছেন তাঁরা কি আরএসএস এর থেকে আলাদা? তাঁরা কি সংঘ পরিবারের সদস্য নয়? তাহলে কি মোহন ভাগবতের তাঁদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া উচিৎ নয়? কেন্দ্রের বিজেপি শাসিত সরকার এবং রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেওয়া উচিৎ নয়? আর ১৯৯১ এর আইন সম্পর্কে উনি একটি শব্দও বললেন না। ১৯৯১ সালের ওই আইন বলে এবার আর কোনও নতুন আপত্তি উত্থাপন করা যাবেনা। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ধরমস্থলের যে অবস্থান অর্থাৎ মন্দির-মসজিদ-গির্জা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই থাকবে। এবিসয়ে উনি কিছুই বললেন না। এরপর উনি একটি অদ্ভুত কথা বলেন যে ভারতের মুসলমানেরা সবাই হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। তাই তাঁরা যদি চান তাঁরা তাঁদের পূজা পদ্ধতি আলাদা রাখতে চান তাহলে আমাদের তাতে কোনও আপত্তি নেই। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, প্রতিদিন যে নতুন নতুন আপত্তি উঠছে, কখনও আজান নিয়ে, কখনও হিজাব নিয়ে তো কখনও আন্য কিছু নিয়ে এবিষয়ে আরএসএস প্রধান চুপ করে আছেন কেন ? তিনি এবিষয়ে কিছু বলছেন না কেন ?”

ইলিয়াস আরও বলেন,”বিশ্বজুড়ে যখন ভারতকে বদনাম করা হচ্ছে যখন বিভিন্ন সংস্থা তাদের রিপোর্টে বলছে ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপরে বিশেষত মুসলিমদের ওপরে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাদের মানবাধিকার শেষ করে দেওয়া হচ্ছে, তখন একটি ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে সংঘ এসবের সঙ্গে জড়িত নয় এবং সংঘের তরফ থেকে এধরণের কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সরকারের তরফ থেকেও এ ধরণের মন্তব্য করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে সরকার কে চালাচ্ছে? সরকারের কাছে আইনের শাসন বজায় রাখার জন্য কতটা শক্তি আছে? যেভাবে হেট স্পিচ দেওয়া হচ্ছে, যেভাবে মুসলিমদের গণহত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, মহিলাদের ধর্ষণ করার কথা বলা হচ্ছে সে বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন? যারা এধরণের মন্তব্য করছে তারা কিভাবে সহজেই জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে? আর ভুয়ো অভিযোগে জেলবন্দি হয়ে থাকারা জামিন পান না। এই সমস্ত বিষয়ে আরএসএস প্রধান চুপ করে আছেন কেন? বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি যেমন উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটকের সরকারকে কেন নির্দেশ দেন না এধরণের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য?” ইলিয়াসের দাবি, মোহন ভাগবতের বলা কথা এবং কাজের মধ্যে অনেক ফারাক আছে। আর এস এস যতই দাবি করুক যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যা ঘটছে তার সঙ্গে আর এস এস এর কোনও যোগ নেই তা অসত্য এবং দেশের জনসাধারণ তা ভালো করেই বোঝেন।

প্রসঙ্গত, কাশীর জ্ঞানবাপী মসজিদের একাংশে হিন্দু ধর্মমতে পুজো-আচ্চা হতো, এই দাবি তুলে তার প্রমাণ খুঁজতে চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন হিন্দুত্ববাদীরা। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে পাঁচ হিন্দু মহিলা জ্ঞানবাপীর ‘মা শৃঙ্গার গৌরী’ এবং মসজিদের অন্দরের পশ্চিমের দেওয়ালে দেবদেবীর মূর্তির অস্তিত্বের দাবি করে তা পূজার্চনার অনুমতি চেয়েছিলেন বারাণসী আদালতে। সেই মামলায় মে মাসে বারাণসী আদালতের নির্দেশে জ্ঞানবাপী মসজিদের ভিতরে শুরু হয়েছিল ভিডিও সার্ভে। দাবি, ওই ভিডিও সার্ভেতেই প্রকাশ্যে আসে একটি ‘শিবলিঙ্গ’। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপাতত সিল রয়েছে মসজিদের ওজুখানা। তবে নমাজপাঠ করতে যাঁরা আসবেন, তাঁদের জন্য অন্য ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে বৃহস্পতিবার সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত রাম মন্দিরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ”ইতিহাসের সাক্ষী অযোধ্যায় রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা করা আমাদের লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তুলে আমরা সফল হয়েছি। আর কোনও আন্দোলন চাই না।”

জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে ভাগবত আরও বলেন,”ইতিহাস বদলানো যায় না। মনে রাখতে হবে, আজকের কোনও হিন্দু বা মুসলিম তা রচনা করেনি। বহু বহু যুগ আগে তা তৈরি হয়েছিল। বহিরাগতদের এ দেশ আক্রমণের মাধ্যমে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। শুধু হিন্দুই নয়, স্বাধীনতাকামীদের মনোবল ভাঙতে উপাস্য দেবতাদের মূর্তি, মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল।”

Related Articles

Back to top button
error: