ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়া কিভাবে সম্ভব? এর জন্য দায়ী কে? টিডিএন বাংলার মুখোমুখি ধর্মীয় নেতারা

ছবি সংগৃহীত, প্রতীকী ছবি

আব্দুস সালাম, টিডিএন বাংলা: সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে ঘুষ-দুর্নীতি নামক অসুখ। ঘুষ-দুর্নীতির অভিশাপে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের সাধারণ জীবন। এই দূর্বিষহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাইছে আপামর জনতা। কিন্তু বর্তমান সমাজে ঘুষ-দুর্নীতির এত বাড়বাড়ন্তের কারণ কি? সাধারণ মানুষ কেন ঘুষ দিয়ে কাজ করায়? ঘুষ ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়া কি আদেও সম্ভব যদি সম্ভব হয় তাহলে সেটা কিভাবে? এর জন্য দায়ী কে বা কারা? এই ধরনের নানা প্রশ্নে টিডিএন বাংলার মুখোমুখি পশ্চিমবঙ্গের একাধিক ধর্মীয় নেতারা। টিডিএন বাংলার মুখোমুখি হয়ে তাঁরা এই প্রসঙ্গে ঠিক কি কি বললেন তা নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

প্রশ্ন: আমাদের সমাজ, দেশ তথা রাজ্যে ঘুষ-দুর্নীতি নামক ব্যাধির ব্যাপক বাড়বাড়ন্তের কারণ কি এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রায় প্রত্যেকেই বলেন, মূলত মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে ঘুষ আর দুর্নীতি মারণ ব্যাধির মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তর: এই প্রসঙ্গে জামাআতে ইসলামী হিন্দের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি মসিউর রহমান সাহেব বলেন, “মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অভাব, মানুষের মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ চাওয়া, সম্পদের মোহ এবং যে কোনো মূল্যে অর্থ উপার্জনের মানসিকতার কারণে ঘুষ-দুর্নীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।” জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, “বর্তমান সমাজের মানুষ অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক এবং পার্থিব জীবনে তাদের আকাশচুম্বী আশা আকাঙ্খার কারণে বৈধ অবৈধ যে কোনো পথে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান টার্গেট। এর ফলে বৈধ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমজনতা।”

প্রশ্ন: যারা ঘুষ নিচ্ছে তাদের বিষয়টি না হয় বোঝা গেল কিন্তু সাধারণ মানুষ বৈধ পথ ছেড়ে কেন ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে চায়? এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুস সালাম সাহেব ও মসিউর রহমান সাহেব প্রায় একই উত্তর দেন।
উত্তর: তাদের মতে, “প্রথমত রাজ্য তথা দেশ জুড়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে ঘুষ না দিলে সহজে কোনো কাজই হয় না, মানুষ তার বৈধ অধিকার টুকুও পায় না। দুর্নীতি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, মানুষের মধ্যে ধারণাই সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে কার্য সিদ্ধির জন্য ঘুষ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এমতাবস্থায় সব মানুষের পক্ষে তো লড়াই করে অধিকার আদায় করে নেওয়া সম্ভব হয় না তাই তারা এক প্রকার বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে থাকে।অন্যদিকে বাঁকিদের যাই হোক না কেন মানুষের যে কোনো মূল্যে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির প্রবণতাও এর জন্য দায়ী। ফলে অনেক সময় অবৈধ সুবিধা নিতেও অনেকেই ঘুষ দিয়ে থাকেন।”

প্রশ্ন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ঘুষ কান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে এর কারণ কি বা সমাধান কি?
উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তরে আব্দুস সালাম সাহেব বলেন, “শুধু যে রাজনৈতিক নেতারাই ঘুষের সঙ্গে যুক্ত এমন নয়। অধিকাংশ সরকারি বা বেসরকারি অফিসে যে সমস্ত ঘুষ বা দুর্নীতি ঘটে সেখানে মূলত অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাই যুক্ত থাকেন।” এই প্রসঙ্গে মসিউর রহমান সাহেব বলেন, “ঘুষের সঙ্গে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা সমান ভাবেই জড়িত। বেশি বেশি সম্পদের মোহে সবাই এই কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের বা সরকারের কতটা হাত আছে বা নেই তা বলা কঠিন।”

প্রশ্ন: এর ফলে সমাজের কি ক্ষতি হচ্ছে?
উত্তর: আব্দুস সালাম সাহেব বলেন, “এর ক্ষতিকারক প্রভাব‌‌‌ তো একেবারেই স্পষ্ট। এর ফলে সাধারণ মানুষ ছোট খাটো থেকে বড়োসড়ো যে কোনো কাজের জন্য এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু তার বৈধ অধিকার টুকুও পাচ্ছে না। সম্পদ গুটিকতক মানুষের কাছে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে সমাজে একটি শ্রেণী সর্বস্ব হারিয়ে সর্বহারা হচ্ছে। অন্যদিকে অপর একটি শ্রেণী সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করছে। সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

প্রশ্ন: কিভাবে ঘুষ মুক্ত সমাজ বা দেশ গড়া সম্ভব?
উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তরে জামাআতে ইসলামী হিন্দের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি মসিউর রহমান সাহেব বলেন, “আমরা মনে করি ২টি উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রথমত, মানুষের মধ্যে যদি স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় থাকে। মৃত্যুর পর স্রষ্টার কাছে ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব দিতে হবে। এর পর মিলবে পুরস্কার (জান্নাত) অথবা শাস্তি (জাহান্নাম)। এই বিশ্বাস দৃঢ় থাকলে মানুষের পক্ষে অন্যের অধিকার অবৈধ ভাবে দখল করা বা বড়ো কোনো অন্যায় করা সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, এর বিরুদ্ধে কড়া আইন তো অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু শুধু আইন তৈরি করে এর সমাধান হবে না। প্রশাসন সহ সমস্ত বিভাগে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষার মেলবন্ধন করা প্রয়োজন।”