স্কুল-কলেজ বন্ধ, লাটে উঠেছে পড়াশোনা, পথ খুঁজতে ‘আইটা’র সভায় সরব শিক্ষাবিদরা

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: করোনা গোটা বিশ্বকে উলোটপালোট করে দিয়েছে। তারপরেও প্রতিটি ক্ষেত্রই স্বমহিমায় ফিরে আসার চেষ্টা করছে। ব্যবসা বানিজ্য, বাস ট্রেন, হাট বাজার, মাঠ ঘাট সব কিছু চালু। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চও বন্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলবে না কেন? যখন এই প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র ঠিক সেই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সমাজের কি হবে? করোনা কি বদলে দেবে শিক্ষাব্যবস্থা? বদলে দেবে কি শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের চিরাচরিত ভুমিকা ? অতিমারির এহেন পরিস্থিতিতে সেই বিষয়ে সুস্থ সমাধান পথ বের করতে দেশ তথা রাজ্যের বিশিষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘কোভিড পরিস্থিতিঃ বিপর্যস্ত পঠন-পাঠন ও উত্তোরণের উপায়’ শিরোনামে রাজ্যব্যাপি ভার্চুয়াল সভার আয়োজন করল শিক্ষক সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া আইডিয়াল টিচার এসোসিয়েশন’ (আইটা)।

রবিবার সভার শুরুতেই সঞ্চালক নূর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানে আলম বলেন, ‘শিক্ষাই যখন জাতির মেরুদন্ড তখন আমরা দেড় বছর ধরে আমরা উদাসীন কেন?তাহলে আমরা কী শিক্ষাকে পঙ্গু করে দিতেই বেশি খুশি? অবস্থা সম্পন্ন লোকেরা তাঁদের ছেলে মেয়েদের শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করে নেবে ঠিকই। কিন্তু বেশির ভাগই তো সাধারণ গরীব নিম্নবিত্তের মানুষ। তাঁদের ছেলেমেয়েদের আমরা বেমালুম ভুলে বসেছি। করোনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে তাদের উন্নত ভবিষ্যতের কথা আমরা কী একটু চিন্তা করতে পারি না?

ডিএনসি কলেজের অধ্যাপক ড সুনীলকুমার কুমার দে সময়োপযোগী এই আলোচনা চক্রের আয়োজন করার জন্য আইটা কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, কোভিড পরিস্থিতির জন্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ব। শিক্ষা,স্বাস্থ্য, সমাজের সর্বস্তরে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিশেষভাবে শিক্ষা- জগতে কোভিডের প্রভাব সর্বাধিক। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। অনলাইনে ক্লাস নিয়ে কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হলেও শিক্ষক -শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাৎ না হওয়ায় উভয় পক্ষই অসন্তুষ্ট। এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে শিক্ষাকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিশা দিতে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকা উচিত বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

অধ্যাপিকা তথা লেখিকা ড. মীরাতুন নাহার বলেন, ‘শিক্ষা এখন ক্রয় যোগ্য পণ্য হয়ে উঠেছে। এখন শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য হয়েছে বড় চাকরি আর বিপুল অর্থ উপার্জন। তিনি আরো বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে গুরুত্বহীন করে দেয়া হয়েছে। সেজন্য তিনি শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ, স্কুল পরিদর্শক, অভিভাবক এবং শিক্ষা অনুরাগী ব্যক্তিদের কাছে আবেদন জানান কিভাবে স্কুল খোলা যাবে তার পরিকল্পনা তৈরি করে সরকারকে তা বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেওয়া।’

স্টুডেন্ট ইসলামীক অর্গানাইজেশন এর রাজ্য সভাপতি সাব্বির আহমেদ পরিসংখ্যান দিয়ে উল্লেখ করেন, এই পরিস্থিতিতে স্কুল গুলিতে ড্রপ আউট পড়ুয়া বেড়ে গেছে। তাছাড়া বর্ণালী সাহার আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, করোনা অতিমারির কারণে পরীক্ষা না হ‌ওয়ায় বর্ণালী সাহার মত নক্ষত্র হারিয়ে যাচ্ছে।

ইউনিসেফ এর প্রাক্তন কনসালটেন্ট মোচবাহার শেখ বলেন, কোন প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে প্রথমে রাষ্ট্র চাই মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে সেই কাজটাই করছে। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা কতটা প্রয়োগ করা যাচ্ছে এ ব্যাপারে শিক্ষকদের পরিসরে মনিটরিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।

শহীদ নুরুল ইসলাম কলেজের প্রিন্সিপাল ডক্টর আফসার আলী তার বক্তব্যে বলেন, ‘একটা এডুকেশনাল মার্ডার হচ্ছে এর দায় কে নেবে!’

রহটপুর হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শহিদুর রহমান বলেন, অতিমারির কারণে তো পৃথিবীর কোন কাজ বন্ধ নেই বন্ধ কেবল স্কুল গুলো! জয়েন্ট এন্ট্রান্সের মত পরীক্ষা হল, শুধু হল না মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকের মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অতিমারির কারণে গ্রাম বাংলায় যথেষ্ট পরিমাণে বাল্য বিবাহ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগও প্রকাশ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সাধুবাদ জানিয়ে মানিকচক সার্কেলের এসআইএস মোঃ পারভেজ বলেন, সরকার চাইছে স্কুল খুলতে। কিন্তু যদি কোন সমস্যা হয় তার দায় কে নেবে? আর এই করোনা পরিস্থিতিতে পঠন পঠন যে স্তব্ধ সেটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এই সময়ে আমরা কিভাবে বাচ্চাদের স্কুলের আঙিনায় আনতে পারব সেটা ভাবতে হবে। করোনা আছে থাকবে। বিদ্যালয়গুলো সানিটাইজ করে কোভিড বিধি মেনে শিক্ষন প্রক্রিয়াটা কিভাবে চালাতে পারি সেটা সরকারের নজরে আনার বিষয়েও ভাবতে হবে।’

এদিনের ভার্চুয়াল সভায় উপস্থিত ছিলেন আইটার কেন্দ্রীয় সম্পাদক আসলাম ফিরোজ, জামায়াতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি মোজাফফর আলী, শেখ মোস্তফা জামান। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ ফারুক।

আইটার রাজ্য সভাপতি মাহবুল হক বলেন, আজকের আলোচনায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদদের পরামর্শ ও অভিমতকে উপেক্ষা করা উচিত হবে না। সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ, তাদের অভিমত গুলি গুরুত্ব সহকারে ভাবা দরকার এবং সেগুলি ব্যাপক বিশ্লেষণ হওয়া উচিৎ যাতে অবিলম্বে সবধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা যায়।