দেশজুড়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি ওয়েলফেয়ার পার্টির

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: দেশজুড়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার সরকারের পদত্যাগ দাবি করলেন ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ শাখার রাজ্য সভাপতি মনসা সেন। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মোদী সরকার তার দ্বিতীয় দফার শাসনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি সম্পন্ন করেছে গত ৩০শে মে,২০২১ । এই সরকারের বিগত দুই বছরের শাসন ছিল ধ্বংসাত্মক, বিশেষভাবে শেষ কয়েক মাস যখন সারা দেশে কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ল। এই প্রেক্ষাপটে, ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া গত ২৫শে মে থেকে আগামী ২৪শে জুন,২০২১ অবধি মোদী সরকারের পদত্যাগ দাবী করে–“করোনায় আজ দেশ ছারখার,/ গদি ছাড়ো মোদী সরকার” শিরোনামে দেশব্যাপি একটি প্রচার অভিযান পরিচালনা করছে । এই একমাস যাবৎ চলতে থাকা প্রচার অভিযানের মধ্যে পার্টি বেশকিছু কর্মসূচী হাতে নিয়েছে, যেমন- সাংবাদিক সম্মেলন, রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং জনসচেতনা গড়ে তুলতে ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির উপর ওয়েবিনারের আয়োজন করা, প্রভৃতি ।
বর্তমানে ভারত সম্ভবতঃ তার জনস্বাস্থ্যের জরুরী অবস্থার সর্বোচ্চ সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, কারণ বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময় বড় বড় নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করে ও কুম্ভ মেলার অনুমতি প্রদান করে মোদী সরকার শুধু যে কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগমনের আন্দাজ করতে করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, বরং এই কোরোনা অতিমারীর গাণিতিক হারে বৃদ্ধিতে উল্ল্যেখযোগ্য অবদান রেখেছে ।
প্ৰথম কোরোনা অভিঘাতের পর এই বর্তমান ঘটনাক্রম মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য মোদী সরকার প্রায় এক বছর সময় পেয়েছে। এমনকি কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্রতার কথা আগাম স্মরণ করিয়ে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞগণ সরকারকে সতর্কবার্তাও দেন । কিন্তু জনস্বাস্থ্যের এই জরুরী অবস্থার মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যৎসামান্য ও বিলম্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায় কেবলমাত্র অক্সিজেনের অভাবে, হাসপাতালে বিছানা না পাওয়ার কারণে বা আইসিইউ সুবিধার অভাবে এবং হাসপাতাল পরিষেবা, ডাক্তার ও প্যারামেডিক্যাল কর্মীদের অভাবে । পরিস্থিতি খুবই করুণ, গম্ভীরভাবে আক্রান্ত রুগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরী বিভাগে এম্বুলেন্স নেই, এমনকি মৃত রুগীদের শেষকৃত্যের জন্য শ্মশানে বা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার গাড়ী নেই ! গরীব জনতা তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহ গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে কারণ তাদের শেষকৃত্য করবার সাধ্য নেই ।

সরকার ওষুধ, অক্সিমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডারের কালোবাজারি রুখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে । হাসপাতালগুলি রুগীদের থেকে বেপরোয়া ভাবে অর্থ উপার্জন করেছে । বেসরকারী হাসপাতাল ও এম্বুলেন্স মালিকেরা অভাবী মানুষদের শোষণ করে চলেছে। পার্টির অভিযোগ, মোদী সরকারের আমলে বিজ্ঞানমনস্কতার জায়গা নিয়েছে অন্ধবিশ্বাস, কারণ সরকার নিজেই উৎসাহিত করেছে কিছু নকল প্রতিষেধককে এবং পঞ্চগাভ্য নামক গরুর দুধ, মাখন, ঘী, গোমূত্র ও ডার্ক চকোলেট মিশ্রিত একটি ওষুধের ডাক্তারী গবেষণাগারে পরীক্ষার কাজকে সমর্থন জানালেও দেশের দুটি টীকা উৎপাদক কোম্পানিকে যথেষ্ট আর্থিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে । মোদী সরকার দাবী করেছে যে, গঙ্গা স্নানের মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা অর্জিত হয় । যখন দেশে কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তখন বিগত এপ্রিল মাসে কুম্ভ মেলাকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী হরিদ্বারে জড়ো হল এবং এই ঘটনা দেশে কোরোনার গাণিতিক হারে বৃদ্ধি বাড়িয়ে দিল। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলল হয়, একবার লকডাউনে আঁটকে পড়া দেশ হতাশার সাথে লকডাউন না এড়াতে পারার কষ্টের সাথে ঝুলছে। আবারও যখন বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ অচলাবস্থার মধ্যে এসে পড়ল তখন আরও একবার দৈনিক মজুরীর অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ল দেশের দিনমজুরের দল । এই কঠিন সময়ের মধ্যে এম এস এম ই ও অন্যান্য ছোট শিল্পগুলিকে বেঁচে থাকার বা পুনরুজ্জীবনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক প্যাকেজ দিতে ব্যর্থ মোদী সরকার । এই অবশ্যম্ভাবী লকডাউনের মধ্যে চলাফেরার উপর সরকারী বিধিনিষেধ আরোপের ফলে যে সমস্ত গরীব দেশবাসী তাদের রুটিরুজি হারালো তাদের হাতে জীবন বাঁচানোর মতো আর্থিক সহায়তা পৌঁছাতে মোদী সরকার ব্যর্থ ।
মোদী সরকার রাজ্য সরকারগুলোকে অর্থ সাহায্য, টীকা প্রদান, অক্সিজেন যোগান দেওয়া বা অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ প্রদানের ক্ষেত্রেও ব্যর্থ । মোদী সরকার দেশের ভেঙে পড়া অর্থব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে কোনরূপ কার্যকরী সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতেও ব্যর্থ ।

অতিমারীর মতো এরূপ বড়সড় সঙ্কটের মধ্যে যে কোনও দেশের দায়িত্বশীল সরকারই চেষ্টা করে আন্তর্জাতিক সমালোচনা সহ সব ধরণের সমালোচনাকে শুনে দেশের স্বার্থে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে । যদিও, আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলির সাথে বা বিশেষজ্ঞদের সাথে বা সকল বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বদের সাথে যৌথভাবে আলোচনা না করেই যেকোনও সমালোচনাকে অবদমিত করতে কঠোর দন্দ্বমূলক অবস্থান নিচ্ছে ও বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণ করবার চেষ্টা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার আদলে বিভিন্ন আইনী কার্যাবলী ও মান-নির্ণায়ক নীতিনির্ধারণগুলি ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন ছিল পাবলিক হেলথ আইনের । এই পরিস্থিতিতে দেশের বর্তমান দুটি আইন, যথা– Epidemic Diseases Act ও Disaster Management Act, খুবই অপর্যাপ্ত ।

অন্যদিকে, মোদী সরকারের অদক্ষতা, একগুঁয়েমি এবং দেশের শিক্ষাবিদগণ ও বিশেষজ্ঞদের গঠনমূলক উপদেশকে না শোনার মানসিকতার কারণে এবং সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসির কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরী হয়েছে, যা দেশের ছাত্র সমাজের ভবিষ্যতকে সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে। সমস্ত রকম অভিনয় বন্ধ করে দেশের স্বাস্থ্যের এই বেহাল দশার দায় মোদী সরকারের স্বীকার করা উচিৎ এবং অবিলম্বে এই স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যাগুলির সমাধান করা উচিৎ । এছাড়াও এই বেহাল স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যর্থতার কারণে যেসকল মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব নেওয়া উচিৎ এবং সেই মৃতব্যক্তিদের পরিবারবর্গকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিৎ ।

ওয়েলফেয়ার পার্টির রাজ্য সভাপতি মনসা সেনের অভিযোগ, অতিমারীর সংকটময় পরিস্থিতির মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি মোদী সরকার স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও অধিকৃত করবার অপচেষ্টার দোষে দুষ্ট এবং দেশের এই সংকট মুহূর্তে সিএএ বা কৃষি আইনের মতো ন্যাক্কারজনক জনবিরোধী, বিভেদকামী আইন পাশ করানোর জন্য দায়ী। উপরন্তু, পশ্চিমবঙ্গের মতো সমুদ্র উপকূলবর্তী একটি রাজ্যে একটা বড় অংশের মানুষ যখন সাম্প্রতিক ইয়াস ঝড়ের তান্ডবে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে দিশেহারা, সেই মহাদূর্দিনেও রাজ্যকে আর্থিক সহায়তা ও জরুরী পরিষেবার সাহায্য না দিয়ে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের সাথে যে নোঙরা রাজনৈতিক কুট-কচালির পথ মোদী সরকার বেছে নিয়েছে তা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সর্বোপরি, মোদী সরকার সমস্ত ক্ষেত্রে নিদারুণ ভাবে পরাস্ত । তাই সকল ব্যর্থতার জন্য মোদী সরকারই দায়বদ্ধ এবং আমরা অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পদত্যাগ দাবী করছি। এদিনের অনলাইন সাংবাদিক সম্মেলনে মনসা সেন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার হাসান ও রাজ্য সম্পাদক আবু তাহের আনসারী।