অসন্তোষ দমাতে ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র ‘অপব্যবহার’ ঠিক নয় : সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি চন্দ্রচূড়

টিডিএন বাংলা ডেস্ক :   ভিন্নমত পোষণ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যে কোনও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নাগরিকদের অন্যতম অধিকার। সম্প্রতি সেই অধিকারই খর্ব করা হচ্ছে বলে কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে। সন্ত্রাস-বিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে কড়া সুর শোনা গেল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের গলায়। আমেরিকা ও ভারতের আইনি সম্পর্ক নিয়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বিচারপতি চন্দ্রচূড় জানান, “অসন্তোষ দমাতে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের অপব্যবহার উচিত নয়।”

গণতন্ত্রে ‘সেফটি ভাল্‌ভের’ মতো কাজ করে ভিন্নমত। প্রশ্ন করা কিংবা বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দিলে সার্বিক অগ্রগতিই বাধাপ্রাপ্ত হয়- গত বছর এক আলোচনাসভায় এমনটাই মন্তব্য করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়।
অনেকে মনে করাচ্ছেন, কয়েক দিন আগে দিল্লি হিংসায় উস্কানির অভিযোগে ইউএপিএ-র কঠোর ধারায় আটক তিন পড়ুয়াকে জামিন দিতে গিয়ে কেন্দ্রকে ভর্ৎসনা করে দিল্লি হাইকোর্টও বলেছিল, প্রতিবাদের অধিকার আর জঙ্গি কার্যকলাপের ফারাক বুঝতে হবে।

ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল অ্যাক্ট, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন প্রয়োগ করাটা ঠিক নয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ধনঞ্জয় ওয়াই চন্দ্রচূড় উল্লেখ করেন, ‘নাগরিকদের হয়রানি করার জন্য তাঁদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কোনও আইনকে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ক্রিমিনাল ল, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী পদক্ষেপ ভিনমত পোষনকারীদের বিরুদ্ধে ও নাগরিকদের হয়রানি করার জন্য অপব্যবহার করা উচিৎ নয়। অর্ণব গোস্বামী বনাম রাজ্য সরকারের মামলায় আমি দেখেছি আমাদের আদালত নাগরিকের স্বাধীনতার অধিকার থেকে যাতে বঞ্চিত না হয় সেটাকে গুরুত্ব দিয়েছে।’

জাস্টিস চন্দ্রচূড় আরও জানিয়েছেন, “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হওয়ার সুবাদে বৈচিত্রময় সংস্কৃতি, বিভিন্ন সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে ভারত। মানবাধিকারের প্রতি গভীর সম্মান ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ করে ভারতীয় সংবিধান।”

প্রসঙ্গত জাস্টিস চন্দ্রচূড় এমন সময়ে তাঁর মন্তব্য করছেন যখন ৮৪ বছর বয়সী স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুকে ঘিরে নানা ক্ষোভের দানা বেঁধেছে । এলগার পরিষদ মামলায় গত বছর গ্রেফতার হয়ে সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে বন্দি ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু হয়েছে গত সপ্তাহেই। একাধিক বার তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে গিয়েছিল আদালতে। এই মৃত্যু নিয়ে বিদেশেও কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার এবং ভারতীয় বিচারব্যবস্থা। সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই সন্ত্রাস দমন আইনে প্রতিবাদীদের অন্যায় ভাবে বন্দি করে রাখছে সরকার। এমনকি বহু ক্ষেত্রে আদালতেও সুবিচার মিলছে না বলেও সরব হয়েছেন অনেকে। স্ট্যানের মৃত্যুকে ‘রাষ্ট্রের হাতে খুন’ বলে উত্তাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আলোড়ন পড়েছে আমেরিকা-সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে চন্দ্রচূড়ের এমন মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে সন্ত্রাস-বিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে সুর চড়িয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এ প্রসঙ্গে একাধিক প্রতিবাদীকেই বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে (ইউএপিএ) আটক করে রাখার নজির রয়েছে মোদী সরকারের। তার মধ্যে অল্প কয়েক জনই আদালতে দীর্ঘ মামলার পরে মুক্ত হয়ে বাইরে এসেছেন। এঁদেরই একজন অসমের কৃষক নেতা অখিল গগৈ। মোদী সরকারের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় তাঁকে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে আটক করে কেন্দ্র সরকার। দেড় বছর বন্দি থাকার পরে সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেই ইউএপিএ-র অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন তিনি। এই প্রসঙ্গেই কাশ্মীরের এক ব্যক্তির উদাহরণও তুলছেন অনেকে। জঙ্গি দমন আইনে আটক হওয়ার ১১ বছর পরে আদালতে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পেরেছেন তিনি। সম্প্রতি মুক্তিও পেয়েছেন জেল থেকে। সমালোচকদের বক্তব্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিছক সন্দেহের বশে এমনকি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও জঙ্গি দমন আইন বা বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে গ্রেফতার করা হচ্ছে প্রতিবাদীদের। জেলে কয়েক জনের মৃত্যুও হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পরোক্ষে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন বিচারপতি চন্দ্রচূড়। সরাসরি অভিযোগ না করলেও সন্ত্রাস বিরোধী আইনের যে অপব্যবহার হচ্ছে, তা ইঙ্গিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।