গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো”-(পর্ব-৩)

গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো”

গল্পকার:-মোস্তফা কামাল

(পর্ব-৩)

বাড়িতে মায়ের শাসন কোনো অংশেই বাবার থেকে কম ছিল না। কিন্তু একটা সুবিধা ছিল। মা বাড়ির বাইরে বের হতেন না। পর্দার আড়ালে থাকতেন। মায়ের প্রতি বাবার ছিল কড়া হুঁশিয়ারি। ফলে বাড়ির মধ্যেই মায়ের রাজত্ব চলতো। রিজু বাইরে ছিল স্বাধীন,মুক্ত বিহঙ্গ। বাবা বাড়িতে না থাকলে নিজের খেয়ালে মেতে উঠতো। মায়ের প্রতি রাগ হলে তার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য মিথ্যা নালিশ করতে গিয়ে বাবার হাতেই রিজুকে মার খেতে হতো।

যেদিন গ্রামের মধ্যে লরি বাস ঢুকে গ্রামকে গ্রাম ধুলোময় করে দিয়ে চলে যেতো সেদিন রিজুর খুব আনন্দ হতো। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে লরির পেছনে বাদুড় ঝোলা হয়ে ঝুলতে ঝুলতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যেতো। চলন্ত লরির পেছন থেকে নামতে গিয়ে দুমদাম আছাড় খেয়ে পড়তো।যে যত বেশিদূর ঝুলতে পেরেছে তার কৃতিত্ব বেশি হতো।বুকটা ফুলে যেতো। ভূতের মতো চেহারা নিয়ে বাড়ি ফিরে অভ্যাস মতো মায়ের হাতে মা’র খেতো।

রিজু দেখতো গ্রামের অনেকেই শালবন থেকে বুনো হাঁসের ডিম কুড়িয়ে এনে লম্বা হাসি দিতো। যারা ডিম কুড়াতে যেতো তারা শালবনে বৈকালের দিকে গিয়ে ঝোপের আড়ালে বসে থাকতো। সন্ধ্যায় বুনো হাঁসের দল উড়ে এসে যখন তাদের বাসায় বসতো তখনই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে ছুটে গেলে তাদের বাসার সন্ধান পাওয়া যেতো। সেখানেই মিলতো বুনো হাঁসের ডিম। কখনো বা হাঁসের ছানা। রিজু কতদিন একা একা গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে কিন্তু বুনো হাঁসের দেখা মেলেনি। খুব দুঃখ হতো তার। খালি হাতে বাড়ি ফিরতে কষ্ট হতো।

বর্তনাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় রিজুদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার। বিশাল মাঠের আলপথ ধরে তাকে খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। খালি পায়ে হাঁটতে খুব কষ্ট পেতো। স্কুল যাওয়ার পথেই রিজুর নানিমার বাড়ি। অনেক সময় স্কুল না গিয়ে নানিমাদের আম বাগানে খেলা করতো। ঢিল মেরে আম পাড়তো।অবশেষে নানাজীর লাঠির তাড়া খেয়ে পালিয়ে যেতো।এসব মুহূর্তগুলো রিজুর কাছে সবটাই ছিল খুব আনন্দের।

ধূলোবালি মেখে খেলাধুলাতে রিজুর খুব নেশা ছিল। স্কুলে না গিয়ে কাঁচের টিপ্পি, ডাংগুলি, বদন খেলায় মশগুল থাকতো। পাড়ার সমবয়সীদের সাথে আবার কখনো মামাতো ভাইদের সাথে সে খেলতো। ওদের কাছে হেরে যেত তবুও আনন্দ হতো। ছুটির সময় হলে বাড়ি ফিরে আসতো।কখনো কখনো পিঠ বাঁচাতে মিথ্যার পাহাড় বানিয়ে রাখতো। পরে যখন বাবা জানতে পারতেন তখন তার নিষ্ঠুর হাতের নির্মম প্রহারে রিজুর কষ্ট দেখে স্রষ্টা নিশ্চয়ই বাবার উপর রাগ করতেন।

প্যান্ট শার্ট পরা তখন রিজুর কাছে স্বপ্ন মনে হতো।ভাদুরিয়াপাড়ার লুডু খলিফা বা গ্রামের মনিরুল মামা রিজুর পায়জামা বানিয়ে দিতেন। কাপড় কম পড়লে পায়জামার উপর অংশে বিভিন্ন রঙের ছাঁট কাপড় জুড়ে দিতেন। ঐ পায়জামা পরে একপ্রকার তামাশার পাত্র হয়ে রিজু স্কুল যেত । খুব লজ্জা পেত। এতে বাবার কোনদিন খারাপ লাগেনি। হেনার বিয়ের পর নজরুলকে প্যান্ট দেবার সময় রিজুকে বাবা একটা প্যান্ট দিয়েছিলেন। তখন ও দশম শ্রেণীর ছাত্র। জীবনের প্রথম প্যান্ট পরার সুযোগ পেয়েছিল। উফ্ সে কী আনন্দ তার!!

প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়ার পর অনেক সময়ই খালি পায়ে ছয় সাত কিলোমিটার হেঁটেই রিজুকে স্কুল যেতে হতো। কখনো সখনো বাবার সাইকেল চেপে যেত। ভালো লাগতো। তাতে বাবার কষ্ট হতো তাই বেশিরভাগ সময়ই রিজু হেঁটে যাওয়া আসা করতো। বই বহনের ব্যাগ ছিলনা। চটি একজোড়া থাকলেও ছেঁড়ার উপায় ছিল না। ওটাকেই নানা রকমভাবে জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হতো। তাতে পায়ের তালুর দিকটা ক্ষয়ে গিয়ে ছিঁড়ে যেতো। একটা চটির শোলে কতবার ফিতা পাল্টাতে হয়েছে তার হিসাব নেই। টুয়েলভে পড়ার সময়ও একটা চামড়ার জুতো পায়নি রিজু। এতে মনে মনে খুব কষ্ট হতো তার। অবস্থার পরিবর্তন হলেও ছেলের সেই কষ্টের কথা বাবা মিজানুর সাহেব কোনদিন বুঝতে চাননি।

রিজু এখন নাইনে পড়ে। সাদিখাঁন দিয়াড় বিদ্যানিকেতনে। প্রায় পাঁচ ছয় কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতে আসতে খুব কষ্ট হয়। পাঁচ ছয় কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে ভাদুরিয়াপাড়াতে গিয়ে বাস ধরে। রিজুর ছোট মামার ঐ সময় বিয়ে হয়েছিল। তার শ্বশুরের দেওয়া সাইকেলটা চেয়ে নিয়ে মাঝে মাঝে স্কুল যায়। সাইকেল পেলে ভীষণ আনন্দ হয়।না পেলে মনে খুব কষ্ট লাগে। বাবাকে বলে সাইকেল কিনে দেবার জন্য। এই জন্য বাবা মাঝে মাঝে তামাশা করতেন। খুব গায়ে বাধতো রিজুর। এলাকার প্রবীণ মানুষ ছিলেন ইরফান মণ্ডল। গ্রামের ওয়াক্তিয়া মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন। মসজিদের সর্দার। রিজুও যেত। ওকে ‘নানাজী’ সম্বোধন করে ডাকতো। তামাশা করে ঠোঁটে মুচকি হেসে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বাবা বলতেন, “সর্দার সাহেব, রিজু সাইকেল চাইছে, সাইকেল কি দেবো ওকে? ইরফান নানাজী রিজুর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হেসে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতেন, “না না মৌলবি সাহেব, রিজুকে সাইকেল এখন দিতে হবে না, ও এখনো ছোট আছে।আর একটু বড়ো হলে দেবেন।”

এটা অবশ্যই বাবার শেখানো কথা। আসলে রিজুকে বোঝাতে চাইতেন যে ইরফান মণ্ডল যেহেতু সর্দার সেহেতু তার অনুমতি দরকার। ইরফান নানাজী অনুমতি দিতেন না। ফলে বাবাও দিতেন না। সবটাই বাবার না দেবার কৌশল ছিল। তবুও রিজুর সব রাগ ইরফান নানাজী’র উপর পড়তো। এইজন্যই ইরফান নানাজীকে রিজু একদমই সহ্য করতে পারতো না । পরবর্তীতে এগারো ক্লাসে পড়ার সময় মতি মামার ভাঙ্গা অ্যাভোন সাইকেলটা তিনশো টাকায় কিনেছিল।তার বেশিরভাগটাই ছিল রিজুর জমানো টাকার।

ছেলে রিজুকে বাবা নিশ্চয়ই ভীষণ ভালোবাসতেন কিন্তু রিজুর কচি মন বাবার সেই ভালবাসা বুঝতে পারতো না। তার মনে পড়ে না যে, সে কোনদিন তার বাবার সঙ্গে খেলা করেছে। বাবা কোনদিন তাকে ঘাড়ে তুলে আদর করেছে। পিঠে হাত বুলিয়েছে। কিন্তু বাবার রেগে যাওয়ার বহিঃপ্রকাশ রিজু অনেক সময় দেখতো। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলা করলে রিজুর কপালে নিষ্ঠুর প্রহার ছাড়া আদর জুটতোনা কখনো। ভালবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে কোনদিনই বাবা বলেননি কোনটি উচিত, কোনটা অনুচিত। বা কেন উচিত কেন অনুচিত। মনে হতো আল্লাহ বোধ হয় সন্তানের প্রতি এদের অন্তরে দয়া মায়া কিছুই দেননি। স্কুল থেকে সাত আট কিলোমিটার হেঁটে যাওয়া আসার পর ক্লান্তিতে সন্ধ্যায় পড়তে বসে ঘুম পেলে মা বাবা দুজনেই ভীষণ রেগে যেতেন। শিলাবৃষ্টির মতো চলতো দুমদাম চড় থাপ্পড়। মা কখনো কখনো বাবাকেও ছাড়িয়ে যেতেন। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে জাগিয়ে রাখতে দুজনেই প্রতিযোগিতা করতেন। রিজুর নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে না পারলে মা রিজুর ঠ্যাং দুটো ধরে টানতে টানতে বারান্দা থেকে নিচে উঠোনের মাটিতে ফেলে দিতেন। ঘুমের ঘোরে বুকটা ধড়ফড় করতো রিজুর। হঠাৎ এভাবে ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতো, মা যমদূতের ন্যায় ভীষণ রকমের মেজাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রিজু মনে মনে আল্লাহকে দোষারোপ করতো। “কেন আল্লাহ তুমি এই বাড়িতে আমাকে পাঠিয়েছো! পাশের বাড়ির ছেলে মেয়েরা কত ঘুমায়, ওদের বাবা মা কিচ্ছু বলেন না! ওদের বাবা মা কতো ভালো!”

পড়াতে রিজুর একদম মন বসতোনা। বইগুলি তার ভীষণ শত্রু ছিল।অতিরিক্ত শাসনেও স্কুল যেতে মন চাইতোনা। বাবা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের বলে আসতেন ছেলেকে কঠিন শাসন করার জন্য। শিক্ষকরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতেন।একটু সুযোগ পেলেই কাঁচা কঞ্চি দিয়ে রিজুর সমস্ত শরীর ব্যথায় ভরিয়ে দিত। রিজু ভয়ে বাড়িতে বলতো না।বললে বাড়িতেও জুটতো উত্তম মধ্যম। । এদিকে স্কুল না এলেও রেহাই পেত না। তাই স্কুল যাবার পথে স্কুল না গিয়ে এক একদিন নানাজীদের আম বাগানে খেলা করে বাড়ি ফিরতো। একদিন খেলতে খেলতে বিকাল হয়ে যাওয়ায় বাগানে বইগুলো পুঁতে রেখেছিল। রিজু ভেবেছিল রাতটা নানিমার বাড়ি থেকে পরদিন তুলে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু কপালে যে কষ্ট আছে। রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় বইগুলো ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি না ফেরার জন্য সাত সকালে বাবা নানিমার বাড়ি হাজির। রিজু ঐ সময় মহানন্দে কাঁচের টিপ্পি খেলছিল। হঠাৎই পেছন থেকে কে যেন কানধরে হিড় হিড় করে টানতে শুরু করলো ।ফিরে দেখে যমদূতের মেজাজে বাবা। সামলে ওঠার আগেই চড় কিল থাপ্পড় কোনটাই বাদ গেলনা। রিজুর এই দুরাবস্থা দেখে সেদিন সবাই হাসাহাসি করেছিল। মামাতো ভাইগুলো ঐ সুযোগে বলে দিল, ”ফুপ্যা, রিজু বই গুইল্যাকে বাগানে পুঁইত্যা রাখ্খীসে। উ কাল স্কুলে যায়নি।”

এই কথা শুনে বাবা আরও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। মনের সমস্ত রাগ মেটালেন রিজুর নিরীহ শরীরে। আজও মনে পড়ে সেই ঘটনা গুলো।।কী লজ্জা কী লজ্জা!!! মনে হয় সেদিন এভাবে অপমান না করলেই কী বাবার হতোনা! রিজু কষ্ট পায়।

রাগ ও দুঃখ নিয়ে পড়াশোনা করতে রিজুর একদম ভালো লাগতো না। তাই মাঝে মাঝে ফেল করতো।বিনিময়ে প্রচুর পুরস্কার তার পিঠে জড়ো হতো। ফলে বাবা মায়ের প্রতি একটা রাগ বা কষ্ট গলার কাছে এসে আটকে থাকতো। বাবা মায়ের এমন কঠিন শাসন রিজুর কাছে অত্যাচার মনে হতো। শিশুদের মন বোঝার ইচ্ছা ওদের হয়তো ছিল না। যদি থাকতো তাহলে সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের আচরণ এতো নিষ্ঠুর হতো না।

রিজুরা পাঁচ ভাই পাঁচ বোন।ঐসময় সবার সংসার এখটু বড়োই হতো। তাছাড়া মিজানুর সাহেব মৌলবি মানুষ,জন্ম নিয়ন্ত্রণে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। আল্লাহ মুখ দিয়েছেন,তিনিই খাবার দেবেন; এই বিশ্বাস তাকে একাধিক সন্তানের জনক করেছে।

রিজু সবার বড়ো। সুতরাং দায়িত্বও বেশি। দায়িত্ব বোধ থেকে রিজুকেও কখনো কখনো অভিভাবকের ভূমিকা নেয়।তার সব চেয়ে মনে পড়ে বোন মনা’র কথা। ওর গায়ের রংটা একটু কালো। বুদ্ধি সুদ্ধিও একটু কম। খুব ছোটবেলায় মনা জানালা ধরে একাকী ‘ককি’ ‘ককি’ ‘ককি’ করে চিৎকার করতো। মাঝে মধ্যে কোথাও কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যেত। ও পাড়ায় ঘুরতে খুব ভালবাসতো। বাড়ির বাইরে গিয়ে কোনো কারণে দেরি হলে ভাবতো বাড়ি গেলেই হয়তো বাবা মা খুব মারবেন।এই ভয়েই সে বাড়ি ঢুকতো না।রাত হয়ে গেলে খোঁজাখুঁজি শুরু হতো। বাড়ির পেছনে অথবা ঝোঁপের আড়াল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসে নিষ্ঠুর ও নির্দয় ভাবে শাসন চলতো। বাবা মনার গলায় পা দিয়ে চেপে ধরে শাস্তি দিতেন।ও ছটফট করতে করতে বলতো, ” আমাকে ছ্যাড়ি দেন গো আব্বা,ও মা আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে গো! ছ্যাইড়ি দিতে বুলেন গো মা। আমাকে ক্ষমা ক্যইরে দেন গো!আমি আর বাড়ির বাহিরে যাব না। আপনারা যা ব্যুলবেন তাই শুইনবো গো!!”

— এতে বাবার মন গলতো কী না জানি না, তবে অদৃশ্য থেকে নিশ্চই স্রষ্টা রাগ করতেন। মাঝে মাঝে শাসনটা এতটাই তীব্র হতো যে বাবার প্রহারের তালে তালে মনা অস্থির হয়ে নাচতো আর কাঁদতো। কখনো কখনো ঐ ছোট্ট মেয়েটিকে চিৎ করে পেড়ে নাকে-চোখে-মুখে সরিষার তেল ঢেলেও শাস্তি দেওয়া হতো। দেখাদেখি রিজুও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ওর উপর অনেক অত্যাচার করতো। এখন রিজুর নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। মনে হয় কেন ভালো ভাবে বুঝিয়ে বলেনি ওকে! কেন মনে হয়নি ও তার আদরের ছোট বোন! ভালোবেসে শাসন না করে কেন নিষ্ঠুর ভাবে করেছে! খুব আফসোস হয় এখন!!এই নিষ্ঠুরতা রিজু তার বাবা মায়ের কাছ থেকেই শিখেছিল।এই কথাগুলো মনে হলে রিজু নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে, “বোনটি আমার,এ নিষ্ঠুরতার জন্য আমাকে তুই ক্ষমা করিস।”

মনার ছোট ছিল মৌরিয়া।ও একটুতেই কেঁদে ফেলতো। খুব ছিঁচকাঁদুনে ছিল। মাথায় ছোট। রং ফর্সা। রিজু খুব ভালোবাসতো ওকে। সবসময় ভাই ভাই করে পেছন পেছন ঘুরতো। একটু কোলে তুলে কপালে চুমু দিয়ে ছেড়ে দিতেই ও খুব খুশি হতো।কেউ সামান্য আঘাত করলেই “ও আল্লা! আল্লা.. গো!….ও আল্লা গো! আল্লাহ!”- বলে ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে কেঁদে গড়াগড়ি খেতো। ওকে যে আঘাত করেছে তাকে মিথ্যা মিথ্যা ধমক দিলেই ও খুব খুশি হতো। কান্না থেমে যেতো মৌরিয়ার।

মাসুম রিজুর ছোট ভাই।ও মৌরিয়ারও ছোট। ওকে বাবা খুব ভালোবাসতেন। তিন মেয়ের পর ছেলে মাসুম। তার ক্ষীণ স্বাস্থ্যের জন্য মজা করে তাকে ‘হেল্থ অফিসার’ বলে ডাকতেন। একটু দমকা হাওয়া লাগলে মাসুমের পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল।বুকের হাঁড় গোনা যেতো।ছোট থেকেই মাসুম ও আবির খুব গোঁয়ার ছিল। আবির ছিল মাসুমের ছোট।রেগে গেলে হাতের কাছে যা থাকতো তাই ছুড়ে মারতো।মাসুম যখন পেটে ছিল তখন থেকেই মা নানান অসুখে জেরবার হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলতেন, “পেটে ধরার সময় থেকেই ওর জ্বালা সহ্য করছি, জানিনা ওই ছেলে ভবিষ্যতে আমাকে কতটা শান্তি দেবে।”

বাড়িতে সবার ছোট ছোট আরও দুই বোন মলিনা ও সিফা ছিল খুব শান্ত। হেনা ছিল বাড়ির বড়ো মেয়ে। রিজুর ছোট।ওরা দুজন পিঠাপিঠি ভাইবোন। হেনা মায়ের সঙ্গে সংসারের সবকাজ করতো। পিঠাপিঠি হওয়ায় রিজুর সঙ্গে হেনার একদম বনিবনা হতো না।

এই ছোট্ট ছোট্ট ভাই বোনদের নিয়ে রিজু খেলা করতো। কখনো নদীর ধারে, কখনো জমিতে যেতো। বর্ষায় গড়িয়ে যাওয়া জলে জাল পেতে মাছ ধরতো। আবার সময় পেলে মায়ের কাজে সহযোগিতা করতো। ঢেঁকিতে পাহাড় দিয়ে দিত।যাতা ঘুরিয়ে মাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতো। প্রায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে মাথায় করে গম পেষাই করে নিয়ে এসে মাকে দিতো।অতদূর থেকে মাথায় করে নিয়ে যেতে আসতে রিজুর খুব কষ্ট হতো।জ্বালানির অভাব পূরণ করতে সরকারি বনভূমি শালবাগান থেকে শুকনো কাঠ কেটে মাথায় করে আনতো। মা খুশি হতেন। মায়ের খুশি দেখে রিজুর ভালো লাগতো। পাশেই শিয়ালমারি নদিতে খুব ভোরে ছোট মামার সাথে মাছ ধরতে যেত। বাবাও কখনো কখনো ছোট্ট রিজুকে সাথে করে সিটকি নিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। যেদিকে মাছ বেশি উঠতো সেইদিকে অনেক মানুষ থাকতো। বাবা থাকতেন একেবারেই একা একা, যেদিকে মাছ কম উঠতো। সুতরাং অন্যদের তুলনায় খুব অল্প মাছ নিয়ে বাপ বেটা হাসিমুখে বাড়ি ফিরতো।

রিজুর বাবার একটা রেডিও ছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবা অন করতেই শোনা যেতো “আকাশ বানী কলকাতা। খবর পড়ছি বরুণ মজুমদার। এখনকার বিশেষ বিশেষ খবর হলো……………..। এখনকার মতো খবর শেষ হলো। এখন শুরু হচ্ছে অনুরোধের আসর।”…… অমনি বাবা পুট করে রেডিও বন্ধ করে আলমারিতে তুলে রাখতেন। কারণ এখন গান হবে। গান শোনা পাপ।ওসব শয়তানের ব্যাপার।তাই তিনি কোনদিন গান শোনেননি। রিজু প্রথমদিকে অবাক হয়ে যন্ত্রটি দেখতো।ভাবতো এই ছোট বাক্সের মধ্য থেকে কী করে কথা হয়?যারা কথা বলছে তারা কি এই ছোট বাক্সের মধ্যে আছে? ভাবতে ভাবতে কোন গভীরে ডুবে যেত। বাবা বাড়িতে না থাকলে রেডিওটি নিচে নামিয়ে রিজু গান শুনতো। আনন্দ হতো। একটু জোরে সাউন্ড হলে মা তেড়ে আসতেন। চোখ রাঙিয়ে ধমকে দিয়ে বন্ধ করতে বলতেন।ভয় দেখাতেন।বলতেন দাঁড়া, “তোর আব্বা আসুক,সব বলে দিবো।”

মারের ভয়ে রেডিও বন্ধ করে কাজে মন দিতো রিজু। বাড়িতে দুটো গরু আছে তার খাবারের ব্যবস্থা করতো। এদিকে প্রতিবেশী, রাস্তার লোকগুলো সবসময়ই যেন ওৎ পেতে থাকতো। তাদের কানে গানের আওয়াজ গেলেই মা বলার আগেই বাবার কানে পৌঁছে যেত। তিনি বাড়িতে ঢুকেই হাতের কাছে যা পেতেন তাই নিয়ে তেড়ে এসে রিজুকে পিটাই করতেন। বলতেন, “এতো বড়ো সাহস, জানোয়ার কোথাকার! আমার বাড়িতে গান বাজে?”

মাকে লক্ষ্য করে বকে দেন, ”নেহার,তুমি কী করছিলে, দ্যাখোনি কেন? পাড়ার লোকজন ধরে ধরে আমাকে বলছে,মৌলবি সাহেব, আপনার বাড়িতে গান বাজে!এসব শুনে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে।”

ঐ সময় মা বাবাকে পুরোপুরি অক্সিজেন দিতেন। মায়ের কথা শুনে রিজুর পিঠে লাঠির বাড়িটা কয়েকগুণ বেড়ে যেত।মারের চোটে রিজু ছটফট করতো।

নামাজের ব্যাপারে বাড়ির খুব কড়াকড়ি ছিল।ভোর চারটার দিকে বাবার ডাকাডাকি শুরু হতো। উঠতে দেরি হলে দরজায় জোরে ধাক্কা পড়তো। শব্দের তাণ্ডবে রাতের নিস্তব্ধতা কেটে যেত। মনে হতো এই বুঝি দরজা ভেঙে গেল। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দরজা খুলে দিলে বাবা শান্ত হতেন। মসজিদে যেতেই হবে। রিজুর কাছে এশার নামাজ আর ফজরের নামাজ পড়া খুব কঠিন কাজ ছিল। বিশেষ করে শীতকালে। শীতের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত পোষাক ছিল না তার।ছিল শুধুমাত্র একটা আলখাল্লা জীর্ণ চাদর। শীতে এটাই একমাত্র ভরসা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে যেতো সমস্ত শরীর। তবুও মসজিদ যাওয়াই চাই।ঐ জীর্ণ শীর্ণ চাদর জড়িয়ে মসজিদ গেলে রিজুকে একদম শীর্ণ অশীতিপর বৃদ্ধের মতো দেখাতো।এ নিয়ে বাবা তামাশা করতে ছাড়তেন না।সবার সামনে মজা করে বলতেন, “দেখুন দেখুন মুসল্লিগন(নামাজ পড়তে যারা আসতেন), আমাদের মুরুব্বী( বয়স্ক ব্যক্তি) সাহেব এসেছেন।”

পিতার মুখে তার সন্তানকে উপহাস করাতে অন্যান্য মুসল্লিরা মুচকি হাসতেন। রিজু ভীষণ লজ্জা পেত। মসজিদ না গেলে রাগে গর্ গর্ করতে করতে মসজিদ থেকে ফিরে বাবা হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়ে ইচ্ছা মতো মেরে মনের ঝাল মিটিয়ে নিতেন। রিজু নামাজ পড়ে এসেও প্রচণ্ড ভয়ে ভয়ে ঘুমাতো । কোনো কারণে ঘুমের মধ্যে বাবা ডাক দিলে ধড়ফড় করে উঠে তার নিষ্ঠুর হাত থেকে রক্ষা পেতে বিনা অজুতেই নামাজে দাঁড়িয়ে যেত। এনিয়ে হাসাহাসিও হতো। বড়ো হওয়ার ফলে মাঝে মধ্যে স্বপ্নদোষ ঘটলেও বাবার হাত থেকে নিস্তার ছিল না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই ঐ অবস্থাতেই ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতো। ইতস্তত করলেও রেহাই পেত না।বাবা কোনো কিছু বুঝতে চাইতেন না। মারের ভয়ে নাপাক অবস্থায় মসজিদ গিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিত সে।এই অবুঝ পিতার কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণের জন্য আল্লাহর কাছে নালিশ করতো।খুব রাগ হতো। শরীরের সমস্ত রগ টান হয়ে যেতো। তার মনে হতো একটা জোর প্রতিবাদ করে। কিন্তু পারতো না। বাবা কষ্ট পাবেন ভেবে চুপচাপ সব হজম করতো। আবার ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক সময় দুষ্টুমিও করতো। তবে রিজুর মতো দুষ্টু ছেলেদের সঠিক পথে আনার জন্য ইচ্ছেমত অন্ধ ‘শাসন-গর্জন-প্রহার’ এটা সঠিক পথ ছিলনা। ভালবেসে বুঝিয়ে বললে অনেক প্রভাব বিস্তার করে শিশু মনে।বাবা যেহেতু শিক্ষক ছিলেন, মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন সেই হেতু তার শাসনে ভালবাসার ছোঁয়া থাকাটা খুব দরকার ছিল। কিন্তু বরাবরই এটার বড়ই অভাব লক্ষ্য করেছে রিজু।