গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-৭)

গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো”
গল্পকার:-মোস্তফা কামাল
(পর্ব-৭)

বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাস শুরু হয়েছে। বোধ হয় রিজুই প্রথম ব্যক্তি যে বর্তনাবাদের অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগুলার ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করছে। একটা আত্ম অহমিকায় তার অতীতের ব্যথা বেদনা ক্ষণিকের জন্য দূর হতো। গ্রামের মানুষজন তার কোলকাতায় পড়তে আসাটা ভালভাবে নিতে পারতো না। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ঈর্ষা কাজ করতো। তারা ভেবেছিল, “রিজু এবার গোল্লায় যাবে। মৌলবি সাহেবের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই একটা ভণ্ড ছেলেকে কোলকাতা পাঠিয়েছে।”

গ্রামের বিভিন্ন মাচানে, আড্ডাখানায় রিজুদের কথাই বেশি আলোচিত হয়। ওরাই সমালোচনা করে রিজুর চলার সঠিক পথটা দেখিয়ে দেয়। ওরা মজা নেয়। রিজু নেয় শিক্ষা। সবার কিছু না কিছু দোষ থাকতে পারে কিন্তু রিজুর কোনো দোষ থাকতে নেই। মৌলবি সাহেবের ছেলে হওয়ার জন্য সবসময়ই ওরা খুঁত ধরতে ওৎ পেতে থাকে। কিছু ভুল করলে শুনতে হয়, “তুই বোলে মোলবীর ব্যাটা,ওতো হারামি ক্যানে। দাঁড়া তোর বাপকে বুলছি।”

একটু দোষত্রুটি পেলেই সমালোচনার ঝড় উঠে। রিজুর কান পাতা দায় হয়। রাস্তায় বের হলেই নানান টিপ্পনী কানে পৌঁছায়। রিজুকে ভালো মানুষ হওয়ার জেদ ওরাই বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ওদের কাছে সে আজ ঋণী।

কলকাতায় এসব দেখার কেউ নেই। রিজু স্বাধীন। মুক্ত বিহঙ্গ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে একসাথে ক্লাস করা, আড্ডা দেওয়ার মাধ্যমে সময় চলে যায়। রিজুর নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। বাবা মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা বেড়ে যায়। সবসময়ই ভাবে বড়ো হতে হবে। অনেক বড়ো। বাবা-মা ও ভাই-বোনদের মনের আশা পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের সমালোচকদের মুখেও ঝামাটা ঘষে দেওয়া হবে। বাবা বলতেন,- “রিজু, তুমি লেখা পড়া করে মানুষ হও।ওটিই হবে ওদের উপযুক্ত জবাব।”

অল্পদিনের মধ্যেই ইউনিভার্সিটির স্যারদের সঙ্গে একটু একটু করে সম্পর্ক তৈরি হয় রিজুর। জোটে নতুন নতুন বন্ধু বান্ধবী। ছেলে মেয়েদের একসাথে ক্লাস হওয়ায় একই বেঞ্চে একসাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে হয়। এসব দৃশ্য গ্রামের লোকজন দেখলে নিশ্চিত রিজু গ্রামে ঢুকতে পারতো না। বাবার অবশিষ্ট সম্মান সব ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতো ওরা। শামীম,রাজু, স্নেহাশীষ,নিলয়,সামিমা, সালেহা প্রায় একসাথে থাকতো। ওদের সাথে পড়াশোনায় কম্পিটিশন হতো। ওরা এখন সবাই কলকাতার নামকরা কলেজের অধ্যাপক।

রিজুর মনে হতো সামিমার চোখের চাহনি যেন অন্য কিছু একটা বলতে চায়তো। রিজু গুরুত্ব দিতোনা। কারণ সে তো ভালবাসে শালিনীকে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে সে তার বাবা-মায়ের সহমতে তাকেই বিয়ে করবে । রিজু কথা দিয়েছিল শালিনীর মাকে।

বড়ো দিনের ছুটিতে রিজু বাড়ি এসেছে। পিওন চিঠি দিয়ে গেল। একটা ইন্টারভিউ আছে শিক্ষকতার।ভেড়ামারা হাই স্কুলে। বুকের ভিতরটা ধুকবুক করতে লাগলো। তাহলে কি আল্লাহ মুখ তুলেছেন! রিজুদের অভাব কি এবার দূর হবে! ভাই বোনদের মুখে হাসি ফুটবে! আনন্দে ঘুম আসেনা রিজুর। অনেক স্বপ্ন আঁকিবুঁকি করে মনের মধ্যে। ভাবে চাকরিটা হয়ে গেলে শালিনীকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে। পিসির স্নেহ ভালবাসার মূল্য দেবো।

রিজু ইন্টারভিউ দিলো। চাকরির যোগ্য বিবেচিত হলো, কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো। একসপ্তাহের মধ্যে তিরিশ হাজার টাকা লাগবে স্কুলকে।ঐ টাকা দিয়ে নাকি স্কুল বিল্ডিং তৈরি হবে। রিজু বুঝতে পারে এগুলো অজুহাত। এই টাকা ওদের মধ্যে বখরা হবে। আবার ‌না দিলেও চাকরিটা হবে না। বাবা টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ালেন। এর ওর কাছে হাত পেতেও এতটাকা অল্প সময়ে জোগাড় করতে পারলেন না। তিনি এতটাকা একসাথে কোনদিন দেখেননি। কী করে দেখবেন! স্বল্প বেতনে সংসারের অভাব ঘুচতো না কোনদিন। কিন্তু চাকরিটা যে করতেই হবে রিজুকে। বাবা তখন পাগল প্রায়। রাতে ঘুম নেই চোখে। একটাই চিন্তা কী করে এতগুলো টাকা জোগাড় করবেন। বিপদগ্রস্ত রিজুকে কোনো ভাবে যদি সহযোগিতা করতে পারে এই আশায় সে তার বাবাকে পিসির কাছে যেতে অনুরোধ করে। সন্তানের সুখের জন্য তিনি এখন সব জায়গায় যেতে রাজি। চক্ষু লজ্জা ত্যাগ করে শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের কাছে হাত পেতেছিলেন। এই নির্মম প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি পিসি । সাধ্যও ছিল না তাদের। পিসি বলেছিলেন, “দাদা, আমার রিজুর জন্য যদি শরীরের সমস্ত রক্ত লাগে আপনি নির্দ্বিধায় এক্ষুনি নিয়ে নিন। কিন্তু এতো অল্পসময়ে আমার মতো গরীব মানুষ কোথায় পাবো এতোগুলো টাকা! আমাকে কিছুদিন সময় দিন দাদা! যেভাবেই হোক আমি চেষ্টা করবো! প্রয়োজনে বাড়িটা বিক্রি করে আমি রিজুর পাশে দাঁড়াবো।”

বাবা পিসিকে সময় দিতে পারেন নি। তিনি হতাশ হয়ে শুষ্ক মুখে ফিরে আসেন।পিসির সামর্থ্য নেই জেনেও বাবাকে ওখানে পাঠানো ঠিক হয়নি রিজুর। এই অপরাধ বোধ রিজুকে কুরে কুরে খায়। ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে সে। নির্লজ্জতার চরমতম সীমা লঙ্ঘন করেছে।

অনেক ছুটাছুটি করেও বাবা টাকা জোগাড় করতে পারলেন না। রাতে শুয়েও চিন্তায় তিনি ঘুমাতে পারছেন না। সারারাত ছটফট করে রাত কাটান। রিজুর কষ্ট হয়। ভাবে এমন চাকরির দরকার নেই। ও এখন পড়াশোনা করবে। কিন্তু গ্রামে প্রচার হয়ে গেছে রিজুর চাকরি হচ্ছে।নিন্দুকেরা বিশ্বাস করেনি। উপহাস করেছে। চাকরিটা না হলে ওদের কথাই সত্যি হবে। গ্রামে মুখ দেখাতে পারবে না। রিজুকে তাই চাকরি করতেই হবে। বাবাও তাই চান। যে ভাবেই হোক না কেন। অনেক চেষ্টা করেও যখন হলোনা তখন তিনি জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করলেন। তাতেও নাগাল পাওয়া গেল না। পিতার কষ্ট দেখতে না পেরে কলকাতায় চলে গেল রিজু।

রিজুকে কলেজের একজন স্যার খুব ভালোবাসতেন। তিনি চাকরির পেছনে না ছুটে পড়াশোনা করতে পরামর্শ দিলেন। বললেন, ”তুমি তো ভালো ছাত্র। তোমার একটা ভবিষ্যৎ আছে। স্কুলে মাস্টারি কেন করবে? অধ্যাপক হতে হবে তোমাকে। অধ্যাপক হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা তোমার মধ্যে রয়েছে।”

সেদিন স্যারকে মৃদু ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে স্যারের কথা রাখতে পারেনি রিজু।

রিজু বন্ধুদের সব খুলে বললো।ওর পড়াশোনায় ইতি পড়তে চলেছে । ওরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কারণ ছাত্র হিসেবে সে খুব খারাপ নয়। ছোটখাটো চাকরি সে করবে এই বিশ্বাস ওদের ছিল না।

সামিমা কাঁদছে। ও হুগলির মেয়ে। সুন্দরী। চুপচাপ পাশে বসে আছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। দুই গাল বেয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝরছে। টেবিলে রাখা ডায়েরির পাতাটি ভিজে গেছে কিছুটা। মাথা তুলে একবার চোখ দুটো মুছে বললো, ”তুই চলে যাবি! তোর চাকরিটা কি খুব দরকার? এম.এ টাতো কমপ্লিট কর। তুই তো ভালো ছাত্র। ছেড়ে দে না চাকরিটা! আমার বিশ্বাস তুই অনেক ভালো চাকরি পাবি।” এই বলে রিজুর ডান হাতটা ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “তুই বুঝতে পারছিস না আমার মনের অবস্থা! আমি বাড়িতে আব্বা-মাকে তোর কথা বলেছি। তোকে নিয়ে যাবো বলেছি। এখন বল আমি আব্বা মা’কে কী বলবো? আমার স্বপ্নটাকে তুই এভাবে শেষ করে দিতে পারিস না রিজু!!”

……..করুণ ভাবে রিজুর দিকে চেয়ে থাকে সামিমা।

রিজু ওর দিকে তাকাতে পারেনা। বন্ধুরা অনেক বোঝালো রিজুকে। কিন্তু সে তো তখন সামিমাকে ভালবাসেনি। ভালবাসার জায়গাটা দখল করে আছে অন্য একজন। তাছাড়া চাকরিটা হাতছাড়া হলে গ্রামের লোকজন যে হাসাহাসি করবে। সুতরাং চাকরিটা করতেই হবে তাকে। মনকে শক্ত করলো ও।সিক্ত চোখে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিলো। সামিমা ঘুরেও আর রিজুর দিকে তাকালো না। টেবিলে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগলো। রিজু ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে বললো, ”তুই আমাকে ভালোবাসিস আগে যদি জানাতিস তাহলে আজকে তোকে এভাবে কাঁদতে হতো না। ভালো থাকিস। ভুলে যাস সব।”

রিজু সব পিছুটান ঝেড়ে ফেলে কোলকাতা ছাড়লো।

সামিমা এখন অনেক বড়ো চাকরি করে। বর্তমানে কোলকাতার একটা কলেজের বাংলার বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপিকা। ভাবতে ভালো লাগে রিজুর। একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়!

এদিকে অতি কষ্টে জোগাড় করা কিঞ্চিত টাকা নিয়ে স্কুল গেলো রিজু। ভাবলো অনুরোধ করে একটু সময় চেয়ে নেবে স্কুল কমিটির থেকে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ওরা টাকা হাতে ধরলো না। বরং জানিয়ে দিল তিরিশ হাজার নয়, সত্তর হাজার টাকা লাগবে এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

রিজুর মাথা এবার বনবন করে ঘুরছে। বাবার মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। দুর সম্পর্কের মির্জাপুরের বসির মামা সঙ্গে ছিলেন। তিনিও খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

যেখানে তিরিশ হাজার টাকা-ই জোগাড় করতে পারা যাচ্ছেনা তার উপর সত্তর হাজার টাকা!! না বাবা, এ চাকরি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়; রিজু বলে উঠলো। হঠাৎ ই বসির মামা বাবাকে টাকার ব্যবস্থা করার সহজ উপায় বাতলালেন। তিনি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। বললেন, “স্কুলের একজন শিক্ষকের ভাইঝি রয়েছে। বেশ সুন্দরী। ওরা বসির মামার আত্মীয়। খুব বড়লোক। ঐ মেয়ের সঙ্গে রিজুর বিয়ে দিলে টাকার সমস্যা মিটে যাবে। তখন আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না।”

ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনুগত ছাত্রের মতো বাবা মত দিলেন। রিজু চুপ থাকলো। নিজেকে অপরাধী মনে হলো তার। শালিনীর কী হবে? সে যে তার পথ চেয়ে রয়েছে। তার নিস্পাপ কচি মুখটা বারবার ভেসে ওঠে। পরক্ষনেই রিজু বেঁকিয়ে বসলো। বাবা হতাশ হলেন। একবুক দুরাশা নিয়ে পিতা পুত্র বাড়ি ফিরলো।