সম্প্রীতির নজির, ক্যান্সারে মৃত নিখিলের দেহ সৎকার করল বহরমপুরের তিন ছাত্র মিন্টু-হুমায়ুন-নুরজামান

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, বহরমপুর: ওরা ওদের সম্পর্কে কেউ হয়না। ওরা তিন জনই ছাত্র। তাই ভুলে যায় নি মানবিকতা। আর সেই দায়িত্ত্ব কর্তব্য থেকেই একজন অসহায় মূমূর্ষ মৃত ব্যক্তির দেহ সৎকার করে শেষ পর্যন্ত পরিবারের পাশে থেকে সম্প্রীতির নজির গড়ল ওরা।

বহরমপুর গোরাবাজারের নিখিল সরকার দেহ সৎকারে এগিয়ে এলেন বহরমপুরের তিন পড়ুয়া। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে কেনাকাটা, শ্মশান নিয়ে গিয়ে দাহ করা সব কাজটাই করল ওই তিন ছাত্র। সায়েদ আনোয়ার মিন্টু, নুরুজ্জামান মন্ডল ও হুমায়ন কবির তিনজনই বহরমপুরে মেসে থেকে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন থেকে ক্যান্সারে ভুগছিলেন নিখিল সরকার। সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পুবের কলম এ ‘পচন ধরা পায়ের চিকিৎসার অর্থ নেই নিখিলের’ শিরোনামে একটি খবরও প্রকাশিত হয়েছিল গত ৩০ শে জুন। খবরের জেরে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি তার পাশেও দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মারা যান তিনি। এই অবস্থায় পুরুষহীন পরিবারে অসহায় হয়ে পড়েন স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে।

কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না স্ত্রী নমিতা সরকার। ফোন করেন সায়েদ আনোয়ার মিন্টুকে। দুই বন্ধু নুরুজ্জামান ও হুমায়ুনকে নিয়ে নিখিলের বাড়িতে বৃষ্টি মাথায় ছুটে আসেন মিন্টু। দেখেন নিথর দেহ পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বহরমপুর মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। মৃত ঘোষণা করে ডাক্তার।

করিমপুর গোয়াসের বাসিন্দা সায়েদ আনোয়ার মিন্টু বলছেন, ‘নিখিল কাকুর দেহ সৎকারের জন্য আমরা তিন বন্ধু বুধবার রাতেই সব কাজ সম্পন্ন করে শ্মশানে নিয়ে যায়। হঠাৎই কাকুর এক দাদা এসে বললেন, বেঁচে আছে নিখিল। আবারও গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসা হল হাসপাতালে। ডাক্তাররা আবারও জানালো মারা গেছেন কাকু। পর দিন সারাটা দিন কেটে গেল ময়নাতদন্তে। আবারও আমাদেরকেই গাড়ি ভাড়া করতে হল। কিন্তু কাকুর ওই দাদারা আর এলেন না শ্মশান ঘাটে। ওনাদের খামখেয়ালিপনার জন্যই শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে বৃহস্পতিবার রাত হয়ে গেল। সারাদিন খাওয়া ছিল না, মেসে ফিরেই খেলাম।’

স্ত্রী নমিতা সরকার জানান, ভগবান কে তো চোখে দেখিনি। কিন্তু মিন্টুর মধ্যে দিয়ে যেন সাক্ষাৎ ঈশ্বরকে দেখলাম। ও নিজের বাড়ির লোকের মতই ওর কাকাকে দেখাশুনা করত। ওষুধ, খাবার প্রায়ই দিয়ে যেত। স্বামীর শেষকৃত্যেও শেষ পর্যন্ত যা যা দরকার সব করল। বেকার ছাত্র হয়ে ওরা তিনজন যা করল ভোলার নয়।

মিন্টু আরও জানাচ্ছে, বন্ধুরা মিলে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে চাঁদা তুলে প্রায়ই নিখিল কাকুর বাড়িতে চাল, ডাল, ওষুধ, টাকা দিয়ে আসতাম। কিন্তু কাকুকে আর বাঁচাতে পারলাম না। বাঁচার অনেক চেষ্টা করেছিলেন উনি। চিকিৎসার অভাবে এভাবে তিনি চলে যাবেন ভাবিনি।

শিকারপুর ফুলবাড়ীর বাসিন্দা হুমায়ন কবির বলছেন, সব কাজটাই করেছি মানবিকতা থেকে। সৎকারের নিয়মও আমরা কিছুই জানতাম না। কাকিমার কথা মতই আমরা যা যা করার করেছি।

নুরজামান মন্ডলের বাড়িও করিমপুরের গোয়াসে। তিনি বলছেন, ‘ছাত্র হিসেবে একটি অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারলাম এর চেয়ে গর্বের আর কি হতে পারে। আর এই চেতনাই সব ছাত্রদের মধ্যে থাকা উচিত।’

নিখিল বাবুর মেয়ে শ্রেয়শ্রী সরকার এবার গোরাবাজার শিল্প মন্দির গার্লস হাই স্কুল থেকে ৮৬ শতাংশ নম্বর নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছে। বাবার ইচ্ছে ছিল মেয়েকে পড়াশুনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার। বাবার মৃত্যুতে স্বভাবতই ভেঙে পড়েছে শ্রেয়শ্রী। কথা বলার মানসিকতায় ছিল না। মেয়ের পড়াশুনার কি হবে? কিভাবেই বা সংসারটা চলবে জানেনা নিখিলের রোজগারহীন পরিবার।

সূত্র: পুবের কলম