(পর্ব ২৯)
অনেকদিন হলো বাড়ির সঙ্গে রিজুর সম্পর্ক অনেকটাই শিথিল। মাঝে মধ্যে দুই একবার ফোনে সে তার বাবার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেয়। বাবাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করে। কিন্তু তিনি যে তাকে ভুল বুঝে বসে আছেন। না আর ক’টা দিন যাক। তারপর রিজু ডোমকল গিয়ে তার বাবাকে দেখে আসবে।
পিতা পুত্রের সাময়িক বিচ্ছেদে এখন মিতা যেন অনেক শান্ত । রিজুর উদাস মনে ও ভালোবাসার সোহাগ দিতে চায়। এসব রিজুর একদম ভালো লাগেনা। একাকি থাকতে চায় ও। কেমন একটা নৈরাশ্যের বেড়াজালে রিজু আটকে যায়। তার কাছে জীবনটা যেন অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিণতি দেখে মিতা রসিকতা করে বলে, কী গো, আর ডোমকল যাবে না? যাও! বাপকে দেখে এসো! তোমার জন্য সবাই পথ চেয়ে বসে আছে।যাও…..!
মিতার টিপ্পনী শুনে রিজুর খুব রাগ হয়। মনে কষ্ট পায় কিন্তু মিতাকে জানতে দেয়না। রিজু চায়না মিতা তাকে নিয়ে ঠাট্টার নতুন রসদ পাক। তাই মিতার নিষ্ঠুর রসিকতায় উত্তর দেয়না। চুপচাপ থাকে। ডায়েরিটা নিয়ে বসে। ফেলে আসা দিনগুলোর অনেক গোপন কথা স্মরণ করে। প্রতিটি পাতায় চোখ রাখে। অজান্তে চোখে জল আসে। শালিনীর কথা মনে পড়ে। রিজু জানেনা শালিনী কেমন আছে! রিজুর আজ ভীষণ ইচ্ছে করে শালিনীর খবর নিতে। দীর্ঘ পঁচিশটি বছর শালিনীর সঙ্গে তার দেখা নেই, নেই কোনো কথা। জানেনা ও কেমন আছে। আজ শালিনীর সঙ্গে একটু কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু কীভাবে বলবে? ওর ফোন নাম্বার জানা নেই। তাহলে ভানু পিসিমাকে একটা ফোন করা যাক। পিসিমার সঙ্গেও দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখানে সেখানে ফোন করে পিসিমার ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোনে ধরে।
…….. হ্যালো! হ্যালো পিসিমা?
…….. ওপার থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় ভেসে আসে, কে বাবা?
……. আমি রিজু! রিজু পিসিমা।
……. রিজু?
……হ্যাঁ পিসিমা, রিজু। বহরমপুর থেকে বলছি। আপনার রিজু! আপনার বড়ো ছেলে রিজু।
ওপার থেকে কোনো কথা আসে না। শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পায় রিজু।
…… হ্যালো পিসিমা! কথা বলুন।
……… হ্যাঁ বাবা, বলছি।
একটা কান্না জড়ানো কন্ঠ ভেসে আসে। রিজু বুঝতে পারে পিসিমা কাঁদছেন। কোনো কথা বলতে পারছেন না। কানে ফোনটা ধরে থাকে রিজু।
…… হ্যালো পিসিমা! আপনি কাঁদছেন? আপনি কাঁদছেন কেন পিসিমা?
…… না বাবা কাঁদছি কৈ? তোমার ফোন পেয়ে আমার আনন্দে অশ্রুধারা বইছে বাবা। এতগুলো বছর পর এই হতভাগীকে মনে পড়েছে তোমার? এতদিন ফোন করোনি কেন রিজু? আমাকে তুমি কী করে ভুলে থাকতে পারলে? তুমি কেমন আছো বাবা?
…….. আমি ভালো নেই পিসিমা! আপনার কথা খুব করে মনে পড়ছে! মনে হচ্ছে এক্ষুনি ছুটে যায় আপনার কাছে। পিসিমা! শালিনীর কথা এতো মনে পড়ছে কেন? ও কেমন আছে পিসিমা? কোথায় আছে ও ?
……. ওর কথা জেনে তুমি কি করবে বাবা? এতদিন যখন জানতে চাওনি তখন আজকে জেনে আর কী লাভ?
…… লোক লজ্জা, চক্ষু লজ্জা, সংসারের অশান্তির ভয়ে আমি আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারিনি! আমি আর পারছিনা পিসিমা! আমাকে ক্ষমা করুন! শালিনীর খবর নিয়ে একটু স্বস্থি পেতে চাই। ও কেমন আছে পিসিমা?
…….ওই হতভাগীর কথা তুমি শুনে কী করবে? ওর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমরা বিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়নি। তোমার জন্য হতভাগী সংসার করতে পারেনি। তোমাকে না পাওয়ার শোকে ও প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছে বাবা।
……. পিসিমা!
অনেক গুলো বছর পর পিসিমার সাথে কথা বলতে গিয়ে রিজুর গলাটা কেঁপে যায়। ওপার থেকে তিনি বুঝতে পারেন। বলেন, তুমি পুরুষ মানুষ, কান্না তোমাকে মানায় না রিজু। তোমার চোখে জল আসুক আমি তা চাইনি কোনদিন।
…… আমাকে কাঁদতে দিন। আমি কাঁদতে চাই। আমার ভিতরের যন্ত্রণা কান্না হয়ে ঝরে পড়ুক পিসিমা!
……. না বাবা, তুমি কাঁদবে কেন? কাঁদবো তো আমি, কাঁদবে আমার হতভাগী শালিনী।
…… শালিনী কোথায় আছে পিসিমা?
…….. সে তুমি জেনে কী করবে? শুধু শুধু তোমার ভরা সংসারে আগুন লাগবে। আমি সেটা চাইনা।
……. পিসিমা!
…… হ্যাঁ বাবা, তুমি ভালো থেকো। মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে এলো। অজু করতে যাবো এখন।ছাড়ছি।
….. আচ্ছা পিসিমা। আমি আবার ফোন করবো।
……… খোঁজ খবর রেখো বাবা। পারলে একবার দেখা দিয়ে যেও।
ফোন রেখে দেয় ভানু। রিজুও অজু করে নামাজে দাঁড়ায়। দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে। বলে, “পরিস্থিতির চাপে আমি আমার প্রাণপ্রিয় শালিনীকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার জন্যই শালিনী আজ অসহায়! ও সংসার করতে পারেনি। এর জন্য আমিই দায়ী, আমিই অপরাধী আল্লাহ। আমি কী করবো তুমি বলে দাও! আমাকে শাস্তি দাও! আমি শাস্তি চাই! যেখানে শালিনী কষ্টে আছে সেখানে আমাকে আরও , আরও কষ্ট দাও প্রভু! আমাকে তুমি শেষ করে দাও!”
মোনাজাত শেষে জায়নামাজ গুটিয়ে রাখে রিজু। মিতা চা আনে।কাপে চা ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করে, তোমাকে আজ এমন দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি কিছু ভাবছো? তোমার কি মন খারাপ?
……. না, এমনি। মনটা ভালো নেই। পিসিমাকে ফোন করেছিলাম আজ।
………পিসিমা? মানে শালিনীর মা?
……..হ্যাঁ।
……… জানো মিতা, শালিনী খুব কষ্টে আছে! খুব কষ্টে!
…… আবার তুমি শালিনীর কথা বলছো? ও কষ্টে থাক না থাক তাতে তোমার কী আসে যায়?
…..আসে যায় মিতা। ওরও তো সংসার পাতার স্বপ্ন ছিল। সব শেষ হয়ে গেছে ওর।
……. কেন আসে যায়? বিয়ে যখন করেছিল তখন ও সংসার করেনি কেন?
…….. বিয়ে হয়েছিল তুমি জানো?
…….. হ্যাঁ জানি তো। মৌরিয়ার কাছ থেকে শুনেছি।
…….. ও….! আমাকে তো কোনদিন বলোনি।
……. আমি চাইনি ওর কোনো কথা তোমার কানে যাক, তুমি কষ্ট পাও। বিয়ের একবছরের মধ্যে শালিনী স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি আসে। আমি এতটুকুই জানি।
……. তুমি এতো কিছু জানো অথচ আমাকে কোনদিন বলোনি।
…… না, বলিনি। বলতে চাইনি। এখনও চাইনা। তুমি ওর কথা আর মনে নিওনা।
…….. না মিতা,তা কেমন করে হয়।যে মেয়েটি আমার জন্য স্বামীর ঘর করতে পারেনি তার প্রতি আমার কোনো দায়বদ্ধতা থাকবেনা?
…… না থাকবে না। শালিনীর কথা বলে তুমি সংসারে অশান্তি লাগিও না বলে দিচ্ছি।
…… অশান্তি বলছো কেন? শালিনী যে কত অশান্তির আগুনে জ্বলছে তুমি সেটা উপলব্ধি করতে পারছো?
……….আমার কি প্রয়োজন?
……..যারা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা কখনও অন্যের দুঃখ কষ্টকে উপলদ্ধি করতে পারেনা মিতা।
….. ওর দুঃখ কষ্টের জন্য তো আমি দায়ী নই। ও স্বামীর ঘর করলেই পারতো। অনেকের জীবনেই প্রেম আসে তবুও তারা সংসার করে। ও করেনি সেটা ওর দোষ। তার জন্য তুমি দায়বদ্ধ থাকবে কেন?
……. ওটা বুঝবে না তুমি। তুমি বুঝবে না আমি কিভাবে বিবেকের দংশনে প্রতিনিয়ত পরাজিত হই।
….. তুমিই যখন বোঝো তখন তোমার যা খুশী তাই করো। কিন্তু আমি বলে দিচ্ছি আমার সংসারে যেন আগুন না লাগে।
……. তুমি যখন ছিলেনা তখন শালিনীই আমার স্বপ্ন ছিল। ওই ছিল আমার জীবনের অনুপ্রেরণা। ওর জন্যই আমি বড়ো হতে পেরেছি ।সেই দুঃসময়ে শালিনীই আমার পাশে থেকে উৎসাহ যুগিয়েছে। তুমি তখন কোথায় ছিলে?
….. তোমার সঙ্গে তর্ক করতে আমার ভালো লাগছে না রিজু। তুমি চুপ করো।
রিজু চুপ করে যায়। মিতার সঙ্গে এসব কথা বলা অর্থহীন। ও বুঝবে না। মেয়েরা এই জায়গায় খুবই স্বার্থপর।