গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-9)

গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো”
গল্পকার:-মোস্তফা কামাল
(পর্ব-9)

রিজুকে নিয়ে স্বপ্ন সবার। রিজুরও। বাড়ির বড়ো ছেলের বিয়েতে কতো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধব আসবে। অনুষ্ঠান হবে। সবাই আশীর্বাদ করবেন। হায়!! তা হলো কোথায়? এসব স্বপ্ন গুলো আজ আলো আঁধারির বুকে সমাধিস্থ হয়েছে। দুঃখ-যন্ত্রণার পাহাড় বুকে নিয়ে ভবিষ্যতের উজ্জ্বলময় আশায় সে নতুন জীবনের দিকে পা বাড়িয়েছে।

বাস দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে। বারবার মনে পড়ে তার মায়ের ভারাক্রান্ত মুখ। বিদায় নেওয়ার সময় মা একটিবারের জন্যও মুখ তুলে তাকাননি। তাহলে কি মা তাকে দোয়া আশীর্বাদ করেন নি? মা হয়তো তখন মনে মনে আল্লাহকে দোষারোপ করছিলেন। তাঁর চোখের কোণে নিশ্চয়ই জল জমে উঠেছিল। তাকে গোপন করার জন্যই হয়তো মা এমনটি করলেন। এসব ভাবতে ভাবতে রিজুর মনটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তার উপর এতো দূর রাস্তার ধকল। সাগরপাড়া থেকে ঘোড়ায় টানা গাড়ি চেপে হবু শ্বশুর বাড়ি। গোটা রাস্তা আইনুল হল্লা করতে করতে গেলো। ও খুব রসিক। মাঝে মধ্যে এমন আচরণ করে যে না হেসে থাকা যায় না। রিজুও মুখ চেপে হেসেছিলো। তার ভারাক্রান্ত মনটাকে অনেকটাই হাল্কা করে দিয়েছিল আইনুল।

আড়ম্বরহীন কনের বাড়িতে ইফতার সেরে বিয়ের যাবতীয় আয়োজন শুরু হলো। বিয়ের আসরে হঠাৎই কিছু কথা রিজুর কানে পৌঁছালো। মাইনুদ্দিন মামা খুব রসিক লোক। রিজুর হবু শ্বশুর মশাই সম্পর্কে তার বেহায় হচ্ছেন। তিনি নাকি তাকে ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন রিজুকে একটা মোটর বাইক কিনে দেওয়ার কথা। কিন্তু মেয়ের বাবা রসিকতা বুঝতে না পেরে ঐ আসরেই ভদ্রতার সীমালংঘন করেন। কর্কশ কন্ঠে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। মিজানুর সাহেব কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। রিজুর মনে হলো, তার সরলমনা বাবাকে সেদিন মিষ্টি ভাষায় যেভাবে বুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছিলেন ইনি সেই ব্যক্তি হতে পারেননা। তার আচরণ আজ একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে। বিয়ের আসরে মেয়ের বাবার এই আচরণে রিজু অপমানিত বোধ করলো। হতাশায় ভারাক্রান্ত হলো সে। মনকে সান্ত্বনা দিলো। তার চাওয়া পাওয়া নিজের বাবা-ই তো পূরণ করতে পারেননি আর এই লোকটিই বা করবেন কেন? কোন স্বার্থে করবেন? রিজু তার কে? ভাষার সৌজন্যবোধ এই মানুষটির যে নেই তা বুঝতে বাকি থাকলো না। এখন দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই করার নেই! যদি সমস্যায় পড়ে বিয়ে না করতো তাহলে এতবড়ো স্পর্ধা মেয়ের বাবা কখনোই দেখাতে পারতেন না। রিজু বললো, “গাড়ি লাগবেনা, বিয়ে পড়ানো শেষ করুন।”

নিজেকে তার খুব ছোট মনে হলো।ছোটোই তো! না হলে নিজেকে বিক্রি করে ছোটলোকের মতো কেউ এভাবে বিয়ে করে? বিয়ে তো হয় আনন্দের, কিন্তু এই বিয়ে তো আনন্দের নয়! রিজুর কাছে এই বিয়ে গভীর বিষাদের! বড়ো আক্ষেপ তার! কেউ তাকে বোঝেনি,এই মানুষটিও বুঝবে না। বড়শি তার মুখে গেঁথে গেছে। বেরিয়ে আসার পথ নেই। একেই বলে সুযোগের সদ্ব্যবহার। সে আজ অসহায়! রিজু বোঝে, তার শ্বশুর হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই এই মানুষটির। বিয়ের আসরেই সে মনে মনে স্থির করে, কখনোই এই মানুষটি তার আব্বা হতে পারে না। কোনদিনই “আব্বা” বলে ডাকতে পারবেনা উনাকে। মেয়ের বাবার উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে মিজানুর সাহেব করজোড়ে বললেন, “বেয়ায় মশাই, আপনার এই আচরণে আমি ভীষণ লজ্জিত! দয়া করে আপনি চুপ করুন, আমিই গাড়ি কিনে দেবো রিজুকে। মাইনুদ্দিন ভাই আপনার সঙ্গে একটু রসিকতা করেছেন মাত্র।” মেয়ের বাবা শান্ত হোন।

রিজু ভাবে আজকে যদি তার বাবার টাকা থাকতো তাহলে কি নিজেকে বিসর্জন দিয়ে এভাবে বিয়ে করতে হতো ? একটা অযোগ্য জায়গায় এসে নিজের যোগ্যতা হারাতে হতো? শুধু টাকা পয়সা থাকলেই সবকিছু কেনা যায় না। বাবার কথা রাখতে টাকার জন্য রিজু নিজেকে বিক্রি করেছে কিন্তু তার মন বিক্রি করেনি। তার মন কেনার ক্ষমতা এই মানুষটির নেই। মন কিনতে টাকা লাগেনা, লাগে একটি স্বচ্ছ হৃদয়। তার শ্বশুরকে সে মনের মতো মানুষ হিসেবে পাবে না শুরুতেই নিশ্চিত হলো। বিয়ে পড়ানো শেষ হলো। শুরু হলো রিজুর জীবনের নতুন অধ্যায়। নতুন খেলা। যে খেলায় শালিনীর চোখের জল কোনোদিন মুছবেনা। রিজু জানে,শালিনীর অভিশাপে সে তিল তিল করে শেষ হবে। জীবনের এই বাঘ-বন্দি খেলায় সে সবসময় পরাজিত হবে।

বিয়ের কয়েক মাস পর রিজু চাকরিতে যোগদান করে। নিজের সংসার চালানোর জন্য বেতনের কিছু রেখে বাকিটা তার বাবার হাতে তুলে দেয়। বাবা খুব খুশি হোন। রিজুও খুশি হয়। তার মনে হয়, এভাবেই যদি সে পরম পিতৃদেবকে সারাজীবন খুশি করতে পারে তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি বোধ হয় সেই হবে।

রিজুর সহধর্মিণী মিতা। চাকরির টাকা দেওয়ার জন্য ওর বাবা ওকে কোনো অলঙ্কার দেননি। অলঙ্কারহীন স্ত্রীর অনেক আবদার স্বামীর কাছে। রিজু মিতাকে তার ইচ্ছের কথা জানায়। বলে,”মিতা, তোমার শখ আহ্লাদ আমি সব পূরণ করবো কিন্তু ছোট ছোট ভাই বোনেরা যে বড়ো আশা নিয়ে চেয়ে আছে আমার দিকে। আগে ওদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে যে আমাকে।”

মিতা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।বলে, “তোমার প্রতিশ্রুতি আগে পালন করো, তারপর না হয় আমার কথা ভেবো। আমি তোমায় কিচ্ছু বলবো না। তুমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছো এটাই আমার অনেক বড়ো পাওয়া। তুমি আমাকে একটু ভালোবেসো তাহলেই আমার সব পাওয়া হবে।”

রিজু সাহস পায়। কিন্তু রিজু তো ওকে মনে প্রাণে ভালবাসতে পারবেনা! মিতার উপর মায়া হয়। ভালবাসার পরিবর্তে করুণা হয়। ভালবাসার অভিনয় করে ভালো রাখার চেষ্টা করে। কখনো কখনো তার অভিনয় মিতার চোখে ধরা পড়ে যায়। ও খুব কষ্ট পায়। ভাগ্যকে দোষারোপ করে মিতা চোখের জল ফেলে।

সেই কলেজে পড়ার সময় থেকে ছোট ছোট ভাই বোনেরা তাদের বড়ো ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে। তাদের বড়ো ভাই বড়ো হবে, অনেক বড়ো। তখন তাদের সব অভাব দূর হবে। মিজানুর সাহেব ওদের সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, “তোমাদের ভাই চাকরি পেলে তোমাদের কোনো অভাব থাকবে না। যা চাইবে তাই পাবে।” নিষ্পাপ মুখগুলো তাদের পিতার কথা বিশ্বাস করে ধৈর্য্য ধরে থেকেছে এতদিন। এখন তাদের বড়ো ভাই চাকরি করছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে এবার এই আশায় বুক বেঁধে আছে ওরা।

চাকরি পাওয়ার পর রিজু একে একে সবার চাহিদা পূরণের জন্য উদ্যোগী হয়। বিনা পণে বিয়ে দেওয়ার ফলে মেয়েরা তাদের বাবার কাছ থেকে পছন্দের দাম পায়নি। আড়ম্বরহীন, অলঙ্কারহীন অবস্থায় তাদের বিয়ে হয়েছে। তাদের নূন্যতম একটা সোনার অলঙ্কার তিনি কোনো মেয়েকে দেননি। স্বামীদের থেকেও মেয়েরা বঞ্চিত হয়েছে। এতগুলো বছর সংসার করলেও স্ত্রী নেহারকেও তিনি দেননি। বড়ো সংসারের অভাব অনটনের জন্য দিতে পারেন নি। রিজু মনে মনে স্থির করে, শত কষ্ট হলেও সে তার মাকে এবং পাঁচ বোনকে সোনার হার বানিয়ে দেবে।

ওদের মুখে হাসি ফোটাতে বৃথা চেষ্টা করে রিজু। প্রথমেই সে তার মাকে একটা সোনার হার বানিয়ে দেয়। পরে একে একে সবাইকে। অল্প বেতন পাওয়ার পর এগুলো দিতে কষ্ট হলেও রিজু ভীষণ আনন্দ পায়। ওদের এসব দিতে গিয়ে তার বাবাকে প্রতিমাসে দিতে পারে না। একই সঙ্গে দুই দিকে দেওয়া সম্ভবও নয়। মিজানুর সাহেব হয়তো মনে মনে ছেলের প্রতি দুঃখ পান। আফসোস করে বলেন, ”টাকাগুলো তুমি পানিতে ফেলছো রিজু।”

রিজু বুঝতে পারে না কী করে সে টাকাগুলো পানিতে ফেলছে। সে তো ছেলে হয়ে বাবার কর্তব্য পালন করছে। বাড়ির বড়ো ভাই হিসেবে ভাই বোনদের মুখে হাসি ফোটানো তারও কর্তব্য। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পর তাদের প্রত্যাশা এতো বেশি ছিল যে তা রিজু পূরণ করতে পারে না। আসলে শুকনো মরুভূমিতে কয়েক ফোটা বৃষ্টি তাদের মনকে তৃপ্ত করতে পারেনি। না পূরণ করতে পেরে রিজুও অতৃপ্ত থাকে।

বাবার মুখেই রিজু শুনেছিলো, নিজের তৈরি ঘর বাড়ি ছেড়ে একপ্রকার খালি হাতে একসময় তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। বাপ-মা ও ছোট ছোট দুটো ভাইকে এইভাবে ছেড়ে আসাটা তখন অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। অনেকের মতে মিজানুর সাহেবের চাকরি ছিল বলেই তিনি বাড়ি ছাড়তে পেরেছিলেন। ছেড়ে এলেও ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়ে তিনি ওদের মানুষ করেছিলেন। নিজের উপার্জিত অর্থে কিঞ্চিৎ জমি কিনে নিজের নামে না করে তিন ভায়ের নামে করে কর্তব্যের পরিচয় রাখতে চেয়েছিলেন। তবুও তিনি তার বাবা মায়ের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছিলেন একথা তাদের মুখে কখনও শোনা যায় নি। এমনকি যারা উত্তরসূরি বেঁচে আছেন তারাও মিজানুর সাহেবের ঋণ স্বীকার করেন না।

রিজুর মনে হয়, আসলে মানুষের চাহিদার কোনো শেষ থাকে না। কিন্তু তার দাদু দাদিমার ছিল শুধু দুবেলা পেটপুরে ভাতের চাহিদা। তবুও তার বাবা তাদের মন জয় করতে পারেন নি। মিজানুর সাহেবের প্রতি ইসার ছিল একবুক অভিমান। কাঁদতে কাঁদতে ইসা বলতেন, ” মুজা, তুখে কত কষ্ট ক্যইরি লিখা পঢ়া শিখিয়্যাছিনু রে! তুই আমাকে ভাত দিবার ভয়ে পালিয়ি গেলি! তোর ছ্যেলিরাও তুখে ভাত দিবেনা রে মুজা! আল্লাহ ইয়ার বিচার ক্যোইরবে রে!”

বলতে বলতে ইসার কাশি উঠতো। কান্না আর কাশি মিলে মিশে তার দম বন্ধ হয়ে আসতো। রিজুর দাদিমা সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, “একই কথা বারেবারে ব্যুইল্যা তুমার কী লাভ হয় শুনি? তুমি কি খ্যাতে প্যচ্ছোনা?”

ইসা বলতেন, “তুই আমার মনের জ্বালা বুঝবিন্যারে বড়ো বউ! বুঝবিন্যা! উয়ার জন্যি আমি কতো কষ্টই না কইরিছি রে! ইয়ার মূল্য ইভাবেই পানু আমি!”

শিক্ষিত মানুষের চাহিদা অশিক্ষিতের চেয়ে সবসময় বেশি হয়। অশিক্ষিত মানুষ খুব সহজেই অল্পতেই তুষ্ট থাকে। শিক্ষিত বাবা যখন অশিক্ষিত বাবার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তখন শিক্ষিত ছেলে শিক্ষিত বাবার চাহিদা পূরণ করতে পারবে কী করে? রিজুও পারেনা শিক্ষিত বাবার চাহিদা পূরণ করতে।