উপসম্পাদকীয়

বিকল্প রাজনীতির সন্ধানে

শরদিন্দু উদ্দীপন, টিডিএন বাংলা: সম্প্রতি নির্বাচনে বাংলার কম্যুনিস্ট দলগুলির শোচনীয় পরাজয় নিয়ে নানা মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলার দলিত-বহুজন মানুষের ভোট মূলত তৃণমূল এবং বিজেপিতে ভাগ হয়ে যাবার ফলে অনেকেই কংগ্রেস এবং কম্যুনিস্ট পার্টিগুলিকে আর প্রাসঙ্গিক মনে করছেন না। বিশ্বাস করতে পারছেন না যে কংগ্রেস সহ বামপন্থী দলগুলি কোন ভাবেই প্রবল পরাক্রান্ত মনুবাদী দল বিজেপিকে প্রতিহত করতে পারে অথবা কোন ধরণের নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। বাংলার আদিবাসী-মূলনিবাসী মানুষদের প্রবল সমর্থনের জোরেই যে এক দীর্ঘ সময় ধরে কংগ্রেস এবং কম্যুনিস্টরা বাংলার শাসন ক্ষমতা উপভোগ করছিল, এই চরম সত্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন অনেক তাত্ত্বিক মানুষ। এ হেন কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলিকে বাদ দিয়ে বাংলার মানুষ কেন তৃণমূলকে শাসকের ভূমিকায় এবং বিজেপিকে বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চাইল এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণে অনেকেই জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে এক বিকল্পের সন্ধান শুরু করেছেন এবং এই বিকল্পের সন্ধানে মমতা ব্যানার্জিকে অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের থেকে এগিয়ে রেখেছেন।
বাংলা থেকে প্রধানমন্ত্রী হবেন এমন স্বপ্নজাল বিছানো শুরু হয়ে গেছে। খবরের কাগজে এবং সোস্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই হানা দিয়ে গেছে উৎসাহের ঝড়। কৃষক নেতারা দল বেঁধে এসে মমতা ব্যানার্জির সাথে বৈঠক করে আগামী লোকসভা নির্বাচনে মোদিকে উৎখাত করাবার আবেদন রেখে গেছেন। উৎসাহের ঘূর্ণাবর্ত এমন এক বাতাবরণ তৈরি হয়েছে যে ইতিমধ্যেই বিজেপির ঘরের পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করেছে। সারদা, নারদা, রোজভ্যালির নোংরা আবর্জনা বিজেপির পবিত্র জলে পরিত্যাগ করে শ্বেতশুভ্র বসনে ফিরে আসতে শুরু করেছেন মুকুল রায়েরা। “আমি সৎ’এর মা, অসৎ’এরও মা” এমন পরম মমতায় তাঁদের কোলে তুলে নিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। দল বাড়ছে, বলও বাড়ছে। আশার পায়রা আকাশে উড়তে আর কোন বাঁধা নেই।
আসলে সৎ এবং অসৎ’এর এই অনিত্যতার নেপথ্যে যে একটি প্রবলতর রাজনৈতিক খেলা রয়েছে এই সত্য আবিষ্কারের মত মেধা দলিত, আদিবাসী এবং মুসলিমদের নেই। তাঁরা ধরতেই পারছেন না যে রাজনৈতিক ক্ষমতাই হল মূল চালিকাশক্তি। সংখ্যা বলে বলশালী হয়েও এই বিশাল সংখ্যক মানুষ ক্ষমতার অলিন্দ থেকে বাইরে পড়ে আছে। কংগ্রেস থেকে বামফ্রন্ট এবং বামফ্রন্ট থেকে তৃনমূল পর্যন্ত বাংলায় যে সরকারগুলি গঠিত হয়েছে সেখানে আদিবাসী-মূলনিবাসীদের মুসলিমদের অবস্থান একটুও পাল্টায়নি। দলের পরিকাঠামো এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক দলগুলি একই নীতি গ্রহণ করেছে। যে নীতি মনুবাদের দ্বারা পুষ্ট। ব্রাহ্মণবাদের দ্বারা প্রভাবিত। মূলনিবাসী-বহুজন মানুষদের এরা এসসি সেল, এসটি সেল এবং সংখ্যালঘু সেলে আবদ্ধ করে রেখেছে। আর মূল বাড়িটি দখল করে বসে আছেন আছে মুষ্টিমেয় সবর্ণ সমাজের মানুষ। ফলে সাইন বোর্ড পাল্টে গেলেও শাসন ক্ষমতা দখল করে রেখেছে ব্রাহ্মণবাদী রেজিমেন্ট। আদিবাসী-মূলনিবাসী, মুসলিম সমাজ এই ভানুমতীর খেলটাকেই ধরতে পারছেন না।
কংগ্রেস পার্টির জনবিরোধী নীতি থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যই বাংলার দলিত-বহুজন মানুষ কমিউনিস্টদের আপন করে নিয়েছিলেন। মনে করেছিলেন যে মার্ক্সবাদই দলিত সর্বহারা আন্দোলনের একমাত্র পথ। বুঝতে পারেননি যে জমিদার প্রভূদের সন্তানেরাই ডিক্লাসিফিকেশন থিওরি গ্রহণ করে প্রলেতারিয়েতদের নেতা হিসেবে একেবারে পলিটব্যুরোর সদস্য থেকে পঞ্চায়েত পর্যন্ত সমস্ত আসনে জাঁকিয়ে বসবে! বুঝতে পারেনি যে এরা লাল পতাকা হাতে মার্কটুইনের সাথে গোয়েবলসের পাঞ্চ মিশিয়ে মনুবাদের প্রয়োগকেই প্রাধান্য দেবে! তাই বিকল্পের সন্ধান করতে গিয়ে অনেক বন্ধুরা যে “দলিত কম্যুনিস্ট পার্টি” গঠনের পরামর্শ দিচ্ছেন তা সার্কাজমের বিষয় হয়ে মানুষের রঙ্গরসিকতার সঙ্গী হতে পারে বাস্তবে একেবারেই সম্ভব নয়।
ভারতের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দলিত-বহুজন মানুষেরাই যে সর্বহারা এই সামান্য উপলব্ধিতেই উপনীত হতে পারেননি কমিউনিস্ট নেতারা। বাবা সাহেব ডঃবিআর আম্বেদকর তাঁর বহিষ্কৃত ভারত এবং মূকনায়কে দলিত শব্দের সংজ্ঞা নিরূপণ করে বলেছিলেন, “যার যুগ যুগ ধরে উচ্চবর্ণের দ্বারা সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে নির্যাতিত তারাই দলিত”। এই ধারণার সাথে ভারতীয় কমিউনিস্টদের কোন সম্পর্ক নেই। এরা দলের পরিকাঠামো এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে মনুবাদী রাজনৈতিক দলগুলির নীতি গ্রহণ করে সাম্যবাদকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এঁদের সংখ্যালঘু সেল, এসসি এসটি সেল এক একটি কারা কক্ষের মত। দলিত-বহুজন মানুষ এই কক্ষে জায়গা পেলেও মূল বাড়িটির ভাগিদারীতে নেই।
১৯৯০ সালে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ভারতের বহুজন সমাজের কঙ্কালসার দেহটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। ছদ্মবেশী শাসকদের মুখোশ খুলে যায়। আক্রোশ আর অসন্তোষের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ভাগিদারী আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়। বহুজন মানুষের কাছে আপন হয়ে ওঠে গৌতম বুদ্ধ, জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রীবাঈ ফুলে, রামস্বামী পেরিয়ার এবং বাবা সাহেব ডঃ বিআর আম্বেদকরের দর্শন। দলিত-বহুজনের সামনে ভাস্বর হয়ে ওঠে সম্রাট অশোকের কল্যাণকারী নীতি “বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়”।
মার্ক্সবাদীরা বস্তুবাদের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের বহুজন মনিষীদের গুরুত্ব দিতে একেবারেই রাজি ছিলেন না। ভারতের বহুজন মনিষীদের যুগান্তকারী সংস্কার আন্দোলন কোনদিন মার্ক্সবাদীদের আলোচনা এবং আন্দোলনের বিষয় হয়ে ওঠেনি। এমনকি বাবা সাহেব ডঃ বিআর আম্বেদকর তাঁর আর্থ-সামাজিক ভাবনার মধ্যে যে নবনির্মাণের দিশা রেখে গেছেন তাঁর সাথেও একাত্ম হতে পারেননি মার্ক্সবাদীরা। এরা জার্মানি, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভিয়েতনাম, কাম্পুচিয়ার তত্ত্বকে ভারতের মাটিতে প্রথিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেছেন। ভারতের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে কমিউনিজমের প্রয়োগ করার চেষ্টাও করেননি।
কমিউনিস্টদের ডগমাটিক আদর্শের ফাঁক দিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মনুবাদ। ধর্মের নামে জিগির তুলে ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে তাঁরা। সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিষ বাষ্পে বাড়ছে অসহিষ্ণুতার উত্তাপ। জল-জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ হতে বসেছে আদিবাসী মানুষ। সংরক্ষণকে একেবারে অকেজো করে দেওয়া হচ্ছে। বিপুল পরিমাণে কর্মীছাটাই করে সরকারি দপ্তরগুলিকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী কৃষি নীতির ফাঁসে শৃঙ্খলিত করা হচ্ছে ভারতের কৃষকদের। আর “বিদেশী আইন” ট্রাইবুনাল, সিএএ-২০১৯, এনপিআর, ডি ভোটার প্রভৃতির সমন্বয়ে ভারতের সকল মানুষের শিয়রে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে এনআরসির খাঁড়া। এই করালগ্রাসী শক্তিকে নির্বাচনে নির্বিষ করে দেওয়ার বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দেখতে চেয়েছিলেন বাংলার মানুষ। একেবারে জগাখিচুড়ি আদর্শের কারণেই কংগ্রেস, কমিউনিস্ট এবং আইএসএফ এই বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। অগত্যা তৃণমূলকেই বিপুল সংখ্যায় সমর্থন দিয়ে আটকে দিয়েছেন বিজেপির দখলদারী।
বাংলার আদিবাসী-মূলনিবাসী বহুজন মানুষের মধ্যেই রয়েছে শক্তির মূলাধার। সংখ্যা অনুপাতে এই ২৩.৫% এসসি, ৫.৮% এসটি এবং ৪১% ওবিসি (সংখ্যালঘু সহ) মানুষেরাই বিশালতম জনাধার। এই মূলনিবাসী শক্তি চিরকালই ব্রাহ্মণবাদী আগ্রাসী শক্তির বিপরীতে অবস্থান করে। এই শক্তি সংবিধানের ন্যায়, সাম্য, স্বাধীনতা এবং ভ্রাতৃত্ব অনুসরণ করে প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ, সম্রাট অশোক, জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রী ফুলে, ফতিমা, রামস্বামী পেরিয়ার, হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ, সিধু, কানু, বীরসা, বেগম রোকেয়া সর্বোপরি বাবা সাহেব ডঃ বিআর আম্বেদকরের আদর্শকে সামনে রেখে সমগ্র ভারতে প্রবল শক্তি নিয়ে উঠে আসছে বহুজন আন্দোলন। ভীমাকোরেগাঁও থেকে শাহিনবাগে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বর। প্রতিরোধ আর প্রতিবাদে গর্জে উঠছে মানুষ। মনুবাদী শৃঙ্খল ভাঙ্গতে, ভারতের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং সংবিধান রক্ষা করতে সাধারণ মানুষের অভ্যুত্থানে আতংকিত হয়ে পড়ছে মনুবাদী শিবির। জনগণের অভ্যুত্থানে তাঁরা এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত যে রাস্তা খুড়ে, পেরেক পুঁতে মানুষের পদধ্বনি আটকাতে চাইছে! মানুষের কন্ঠরুদ্ধ রুদ্ধ করা জন্য আইন প্রণয়ন করছে। নিশ্চিত পতনের আগে শক্ত করতে চাইছে নিয়মের বাঁধন!
হ্যা, মনুবাদের বিরুদ্ধে এটাই বিকল্প পথ। সারা ভারত জুড়ে উঠে আসছে এই বেগবানধারা। ভারতের আদিবাসী-মূলনিবাসী বহুজন মানুষের সাথে বাংলার প্রগতিশীল বামপন্থী মানুষেরা যুক্ত হলে এই শক্তিই দুর্জয় শক্তি হিসেবে পরিণত হবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটাই হবে আদর্শ জনগণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ধারা।

(লেখক: সমাজকর্মী,মতামত লেখকের নিজস্ব। ঠিকানা: গড়িয়া, কোলকাতা-৮৪,
মোবাইল: 7439877587)

Related Articles

Back to top button
error: