গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-১৫)

(পর্ব ১৫)

কলিং বেলটা বেজে ওঠে। রিজু মাস্টার তাড়াতাড়ি স্বভাবিক হয়ে নেন। যেন কিছুই হয়নি। দরজা খুলে দেখেন বেলাল সাহেব। তিনি স্কুল এলাকার সমাজসেবী। গেস্টরুমে বসতে বলে মিতাকে চা করতে বলেন রিজু মাস্টার।

বেলাল সাহেব : আচ্ছা মাস্টার মশাই, ব্যাপারটা যা শুনছি তা কতটা সত্য তা জানার জন্যই আপনার কাছে এলাম।

রিজু মাস্টার মাথা নিচু করেন। চোখে জল আসে তার। বাক রুদ্ধ হয়ে যায়! একটু থেমে বলেন, আমি বড় ভুল করে ফেলেছি বেলাল ভাই! মানুষের বিচার-বুদ্ধি না করে সব মানুষকে মানুষের আসনে স্থান দিয়ে এখন মাশুল গুনছি। মাস দুয়েক আগে এক অপরিচিত যুবক আমার সহকর্মী বকাউল্লা মাষ্টারের নাম করে এসে ঘর ভাড়া চাইলে বসবাসের জন্য নিচের ঘরটা ভাড়া দিই। পরে জানতে পারি, এরা সমাজের শত্রু। নারী পাচার সহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। পুলিসের ভয়ে আমার বাড়ীতে আত্মগােপন করে আছে এবং এখান থেকেই অপকর্মের নতুন ফাঁদ পেতেছে। এসব কথা জানতে পেরে তাদের (স্বামী-স্ত্রী) দুজনকে ঘর ছেড়ে দিতে বলি। ওরা ছাড়তে চাইনা। বাধ্য হয়ে জোরপূর্বক ওদের বের করে দিই। তারপরই ওদের হিংস্র মনােভাব প্রকাশ্যে আসে। ওরা প্ল্যান করে আমার নামে অপবাদ দেয়। কুৎসা রটায়। মান-সম্মানে আঘাত দিয়ে আমার কাছ থেকে টাকা আদায় করার যড়যন্ত্র করে। পরে পুলিসের জালে ওরা ধরা পড়ে । চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। কিন্তু মানুষ এসব নিয়ে যেসব মুখরােচক গল্প বানাচ্ছে তার জন্য আমার মুখ দেখানােই দায় হয়ে পড়েছে বেলাল ভাই।

………ও! তাই নাকি ? আমরা যা শুনছি তার সবটাই ভুল। স্রেফ মিথ্যা, অপবাদ!

………হ্যাঁ! সবটাই অপবাদ। বললো মিতা। আসলে কি জানেন বেলাল সাহেব,উনি অন্যায়ের সামনে কোনোদিনই মাথা নত করেননি।তােষামােদ, উমেদারি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারেন না। স্পষ্ট এবং সরাসরি কথা বলা ওর স্বভাব। সুতরাং যাদের স্বার্থে ঘা লাগতাে তারা আজ এই সুবর্ণ সুযােগ হাতছাড়া করবে কেন? ফলে তারা সত্য মিথ্যা যাচাই না করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে।

……… শুনুন মিতাদি, ব্যাপারটা আমাদের নিকট জলের মতই পরিষ্কার। এ ধরনের অপবাদ শুধু রিজু সাহেবের কেন, অনেকের
ভাগ্যেই জোটে। বুঝতে পারছি, চরিত্রে দোষারােপ করে রিজু সাহেবের প্রভাব প্রতিপত্তি খর্ব করার এ এক জঘন্য চক্রান্ত। সে যাই হােক, সময় একদিন এসব মিথ্যা প্রমাণ করবে। সেদিন ঐসব নিন্দুকের মুখে চুনকালি ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। রিজু সাহেব, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করুন ,বললেন বেলাল সাহেব।

………..সজল নেত্রে রিজু মাস্টার বলেন, দেখুন, আমি চিন্তা করছি মান-সম্মান নিয়ে। আর কি তা ফিরে পাব? মানুষ তাে সত্য মিথ্যা প্রথমে যাচাই করে না।

……..বিপদ যখন আপনার, ধৈর্য আপনাকেই ধরতে হবে। প্রকৃত শিক্ষিত এবং ভদ্র মানুষগুলাে কখনই এসব অপবাদে কান দেবেন না। যাদের মস্তিষ্ক বিকৃত, যাদের চরিত্রে দুর্বলতা আছে একমাত্র তারাই এ নিয়ে মুখরােচক আলােচনা করতে পারে। ভেঙে পড়বেন না, মনকে শক্ত করুন। একদিন প্রকৃত সত্য মানুষ বুঝতে পারবেই। থামেন বেলাল সাহেব।

………..একটা টানা নিঃশ্বাস ছেড়ে রিজু মাস্টার বলেন, সেই আশায় তাে বেঁচে আছি!

বেলাল সাহেবের সঙ্গী মইদুল সাহেব কিছু বলার জন্য এতক্ষণ উসখুস করছিলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন ,আমরা আপনার পাশে আছি। অনেক জায়গায় প্রতিবাদও করেছি। আমাদের পাড়ায় ঢুকে বকাউল্লা মাস্টার আর আইদুল সেখ আপনার ব্যাপার নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিল । আমি ওদের চরম অপমান করেছি সেদিন। তবে ওদের কথার মধ্যে বুঝতে পারলাম কিসের যেন রাগ আছে আপনার উপর।

………রাগ আমার উপর ? আমি তাে ওদের কোনো ক্ষতি করিনি।

বেলাল সাহেব: আপনি আবার ভুল করছেন। সতিই আপনি মানুষ চিনতে ভুল করেন।

লজ্জায় মাথাটা নত করলেন রিজু মাস্টার।

মইদুল সাহেব বলেন, আমরা জানি আইদুল খুব মিথ্যা কথা বলে। অপরের ছিদ্র অন্বেষণ করাই ওর স্বভাব। অথচ ওর যে কত ছিদ্র রয়েছে….। শুধু ওর বলবাে কেন, বকাউল্লা মাস্টারের উষ্টি-গুষ্টিও আমরা চিনি। ওদের তাে একটা নাম-ই আছে–গাঁজাখােরের গােষ্ঠী। আসলে আনকালচার্ড ফ্যামিলির ছেলে তাে। মাস্টার হলে কী হবে, দোষ রয়েই গেছে।

রিজু মাস্টার উত্তেজিত হয়ে বললেন, মইদুল ভাই, চুপ করুন। বাদ দিন পরচর্চা। ওসব শুনতে আমার ভাল লাগে না। পরের দোষত্রুটি নিয়ে আলােচনা করতে আমার ঘৃণা হয়। বিবেকে বাধে। হয়তাে আইদুলের আক্কেল লােপ পেয়েছে। আর বকাউল্লা তাে তার নামেই পরিচয়। ওরা সবই বলতে পারে। এরা অন্যের মান-সম্মান নিয়ে খেলা করার সময় নিজেদের মান-সম্মানকেও ধূলায় মিশিয়ে দিতে কুন্ঠিত হয় না। এরা আর যাই হােক মানুষ হতে পারে না।

………তুমি চুপ কর। অত উত্তেজিত হইও না। মানুষ চেনো। সবাইকে তুমি ভাব ভালো মানুষ। কিন্তু এখন বুঝতে পারছ তাে সবাই তােমার মত নয়। সকলের উপকার করার জন্য তােমার প্রাণ ছটফট করে। অথচ যার যখনই উপকার করেছ সেই তােমার ক্ষতি করেছে। এ থেকে তােমার শিক্ষা নেওয়া উচিত। দুষ্টু লােকের কখনই উপকার তো দুরের কথা সহানুভূতিটুকুও তুমি আর দেখিও না। নিজে একটু স্বার্থপর হওয়ার চেষ্টা করো। থামে মিতা।

রিজু মাস্টার চুপ করে শােনেন মিতার কথাগুলো। এখন বেশ ভালো লাগে ওর কথা। আগে ওর কথা একদম ভালো লাগতো না। ওকে অসহ্য লাগতো। এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে ছােটখাট অশান্তিও কম হয়নি। আর আজ মনে হয় মিতাই ঠিক। মিতা বুদ্ধিমতী। সে নিজেই একটা আস্ত নির্বোধ। ধিক্কার জানায় নিজেকে।

মিতা বলেই চলে, কিছুদিন আগে প্রতিবেশী ইসমাইলের অভাব অভিযােগের কথা শুনে তাকে ব্যাঙ্ক লোন করে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলে ব্যবসা করে খেতে। পরে কী পেলে তুমি ? টাকা পরিশােধ করা তাে দূরের কথা, তােমাকেই সে ব্ল্যাকমেল করে টাকাগুলো মেরে দিলো। অথচ তার অভাব-অনটনের কথা শুনে দুদিন খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলে। মইদুল সাহেবের দিকে চেয়ে মিতা বলে, মইদুল ভাই! আপনি এক্ষুনি যে আইদুল লােকটির কথা বল্লেন, একদিন তার স্ত্রীর অসুখ করেছে বলে চিকিৎসা করার নাম করে টাকা ধার নিয়েছিল। আজ কয়েক বছর হল সে টাকাই ফেরত দেয়নি। ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় জীবন বাজি রেখে ওর ছোট ভগ্নীপতি ও বোনের বিপদে ও পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃতজ্ঞতা বোধ বলতে এদের কিছুই নেই! ওদের সম্বন্ধে কি আমাদের কিছুই জানা নেই ভাবে? এইসব অকৃতজ্ঞ লােকের কথা মুখে আনতেও আমার ঘৃণা হয়।

বেলাল সাহেব ও মইদুল সাহেব উঠে দাঁড়ান। সদর দরজা পর্যন্ত রিজু মাস্টার তাদের এগিয়ে দেন।

আজ পৃথিবীর সব পরিচিত মানুষগুলােকে তার অপরিচিত বলে মনে হয়। তিনি চারদিকে অন্ধকার দেখেন। কিছুই আর ভাবতে পারেন না। আলুথালু নয়নে মিতার দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি বলতে পারো মিতা, কোন অপরাধে আমার আজ এ অবস্থা? মানুষকে বিশ্বাস করা, ভালোবাসা কি অন্যায় ? মানুষকে মানুষ বলে ভাবা কি অপরাধ ? ভালোবাসা, বিশ্বাস শব্দগুলি কি অর্থহীন ?

মিতা কোনো কথা বলেনা। রিজুর দিকে চেয়ে থাকে। বাইরের দমকা হাওয়ায় মিতার অবিন্যস্ত চুলগুলি উড়তে থাকে। দুহাত দিয়ে খোঁপা বেঁধে নিয়ে বলে, তােমার বিপদের দিনে না আসুক কেউ, আমাদের আল্লাহ আছেন। তুমি ওজু করে নামায পড়ে নাও। আল্লার নিকট কাঁদো। তিনিই আমাদের উদ্ধার করবেন।

রিজু মাস্টার অজু করে নামাজে দাঁড়ান। নামায শেষে দুহাত তুলে মােনাজাত করে উপরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বিড় বিড় করে কী যেন সব বলেন! হয়তাে বলেন, আল্লাহ তুমি কোনোদিন ক্ষমা করাে না ওদের!

নামাজ শেষে নিজেকে একটু হালকা মনে হয় তার। গুমােট ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে প্রকৃতির মুক্ত বায়ুতে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেন। বিশুদ্ধ বাতাস তার শরীরে এক নতুন অনুভূতি জাগায়। ভালো লাগে তার। মিতা বলে, চলাে, আমরা ক’দিনের জন্য দূরে কোথাও ঘুরে আসি। রিজু বলে, তাই চলো।