গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো” গল্পকার:-মোস্তফা কামাল (পর্ব-৬)

গল্পের নাম:- “রিজু বাঁচতে চেয়েছিলো”
গল্পকার:-মোস্তফা কামাল
(পর্ব-)

এখন রিজুর থাকার জায়গা পরিবর্তন হয়েছে।এসআইও অফিস থেকে ইলিয়ট ছাত্রাবাস।ওটা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের থাকার জন্য।ওরা মৌলানা। ওদের অনেকেই ছাত্রাবাসে সিট নিয়ে রাখেন কিন্তু থাকেন না।বেড ফাঁকা পড়ে থাকে।ঐ ফাঁকে কিছু মৌলনা ছাত্র কিছু টাকার বিনিময়ে বেডে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার একজন মৌলানা ছাত্রকে দু’শো টাকা দিয়ে রিজু থাকার সুযোগ পায়। ওখানেই রিজুর এক শিক্ষকের ছেলে থাকে। ও একেবারেই বাউন্ডুলে হয়ে গেছে। পরপর তিন বছর একই ক্লাসে। খারাপ বন্ধু,মদ আর মেয়েদের পাল্লায় পড়ে ও শেষের পথে। স্যার একদিন হোস্টেলে এলে রিজুর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি তার ছেলেকে নিয়ে দুঃখের কথা শোনান। বলেন, জানিস রিজু, প্রতি মাসে ছেলেকে দুই হাজার করে টাকা দিই।ওর এতটুকু অসুবিধা হতে দিইনি। টাকার অভাব বুঝতে দিইনি। অথচ আজ পর্যন্ত বিএ পাশ করতে পারলোনা । কী করি বলতো!! রিজু স্যারকে সব খুলে বললো । বললো ওকে কলকাতা ছাড়ান স্যার। না হলে আরও সর্বনাশ হয়ে যাবে। স্যার সব কথা শুনে বললেন, “ওর এতো অধঃপতন!! আমি তো জানতাম না।”

স্যারের চোখের কোণ সিক্ত হয়ে উঠে। রিজু কষ্ট পায়। তার অধঃপতন হলে তার বাবাও তো এভাবেই কষ্ট পাবেন। বাবা তাকে গড়ে মাসে তিনশো টাকা দেন। আর স্যার তার ছেলেকে দেন দুই হাজার টাকা!!! রিজু অবাক হয়েছিল। যদি বাবা এতো করে টাকা দিতেন তাহলে পড়াশোনা আরো ভালো হতো।শরীরটাও ভালো থাকতো। স্যার বললেন, ”শোন রিজু, কলকাতা মানুষ তৈরি করে আবার কলকাতা-ই মানুষকে ধ্বংস করে। কলকাতায় সব পথ খোলা। যে যেমনটি বেছে নিতে পারে। আমার ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে রে। রিজু, তুই আমার বড়ো উপকার করলি আজ।”

স্যার কলকাতা থেকে তার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে বিহারের ভাগলপুরে নতুন করে ভর্তি করালেন। এতে ছেলের সব রাগ পড়েছিল রিজুর উপর। ওর দুষ্টু বন্ধুদের নিয়ে রিজুকে হোস্টেলে মারতে গিয়েছিল। সেই থেকে স্যারের ছেলের সাথে রিজুর কোনো যোগাযোগ নেই। রিজু শুনেছে ও এখন বসন্তপুর কলেজের অধ্যাপক।

পাশেই বেকার গভঃ ছাত্রাবাস। এখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে পড়াশোনা করতেন।এক বন্ধুর সহযোগিতায় রিজু এখানে থাকার সুযোগ পেল। ইলিয়ট ছাত্রাবাসে বছর খানেক ছিল। ছাত্রাবাসের মৌলানা সাহেবদের আচরণ ভালো লাগতো না। সবার আচরণ খারাপ এমন নয়। খুব কম সংখ্যক মৌলবি সাহেব আছেন যারা ফেরেস্তা তুল্য। কিন্তু বেশিরভাগটাই আদর্শহীন। তাদের চলা ফেরা ইসলামের রীতি নীতির সঙ্গে মেলেনা। কারো কারো মুখের ভাষা বর্তনাবাদের চাষাদের থেকেও খারাপ। পড়া লেখার ধার ধারেনা। পরীক্ষার সময় দেদার টুকলি। অথচ এদের লম্বা দাড়ি, টুপি পায়জামা পাঞ্জাবী দেখে কতোই না রিজুদের গ্রামের মানুষ শ্রদ্ধা করে। এরাই দেশে গিয়ে ফতোয়া জারি করবে। বড়ো বড়ো বুলি আওড়াবে।স্টেজ গরম করবে। হাদিস কোরআন বেঁচে খাবে। অন্যদের নির্দেশ দেবে কিন্তু নিজেরা পালন করবে না। এরা অনেকেই ভীষণ একগুঁয়ে। এদের অনেকের বাস্তবোচিত জ্ঞান একটু কম হওয়ায় এরা বোঝে কম,বোঝায় বেশি। এরা নিজেদের ত্রুটি স্বীকার করতে চান না। এইসব কারণে এই ধরনের মৌলবি সাহেবদের অনেকেই ভালো চোখে আর দেখেন না। রিজু মনে করে, আজকের মুসলমান সমাজের এই দুর্দশার জন্য এই সমস্ত মৌলবি সাহেবদের অনৈসলামিক আচরণ অনেকাংশেই দায়ী।

রিজুর বেকার ছাত্রাবাসে থাকতে ভালো লাগতো। পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ। দশ বারো ঘন্টা পড়তো। শরীরে খুব চাপ পড়তো। একসময় ভালো খাবারের অভাবে শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়লো। ফলমূল খেতে খুব ইচ্ছে করতো তার। টাকার অভাবে কোনদিন একটা ফল কিনে খেয়েছে বলে রিজুর মনে পড়ে না। পড়াশোনার চাপ শরীর নিতে পারলোনা। জন্ডিসে আক্রান্ত হলো। তার সমস্ত শরীর হলুদ হয়ে গেল।অতি কষ্টে বাড়ি চলে আসে সে। সুস্থ করার জন্য রিজুর বাবা মা খুব যত্ন আত্তি করলেন। একমাস পর তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। একটু সুস্থ হতে রিজুকে নিয়ে বাবা কলকাতা এলেন। ছেলের জন্য সম্ভবত এই প্রথম। কলেজের অধ্যক্ষর সাথে কথা বললেন। তিনি রিজুকে সান্ত্বনা দিলেন। দুর্বল শরীর নিয়ে রিজু পরীক্ষা দিলো। ভালো রেজাল্ট হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে এমএ-তে ভর্তি হলো। বেকার ছাত্রাবাস ছেড়ে শিয়ালদহে কারমাইকেল গভঃ ছাত্রাবাসে এসে নতুন অধ্যায় শুরু করলো । ততদিনে পিসিদের বাড়ি যাওয়া আসা অনেক কমে গেছে। কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে আছে ওরা। মনের মধ্যে স্থায়ীভাবে আসন করে নিয়েছে শালিনী।আসন করে নিয়েছে শালিনীর ভালোবাসা আর পিসির স্নেহাশীষ।

কারমাইকেল ছাত্রাবাসের পরিবেশ খুব সুন্দর। প্রথম প্রথম পড়াশোনায় তেমন চাপ নেই। একাকি ঘরে শুয়ে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতো রিজু। বাড়ির স্মৃতি চারণ করতো। তখন মৌরিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে আছে মলিনা,সিফা ও ছোট চার ভাই। মাসুম তখন একটু বড়ো হয়েছে।ছোট তিনজন আবির, মেহবুব আর মাহি। খুব ছোট। ওরা বেশিরভাগ সময়ই ন্যাঙটা হয়ে থাকতো।মাহি সবার ছোট। খুব শান্ত। তোতলা তোতলা কথা। সবসময়ই ধূলো বালি কাঁদা মাখার পর তাদের মায়ের হাতের চড় থাপ্পড় খেয়ে শান্ত হতো। রিজু বাড়ি এলে ওরা খুব আনন্দ পেতো। বড়ো ভাইকে দেখতে না পেলে আবির তোতলা গলায় দুই ভাইকে জিজ্ঞাসা করতো, “বলতো ভাই কুনথে গেলথে!”

মাহি: ভাই দোমকুল গেলথে।

মেহবুব: তুই জানিথ ভাই কুনথে গেলথে!

………মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আবির বলতো, “ইঁহ্..ইঁ..হ। ভাই কোলকাত্তায় গেলথে…..।”

একসময় ওরা রিজুর কথা ভুলে আবার আপনমনে খেলায় মেতে উঠতো। মলিনা ও সিফা খুব শান্ত থাকতো। ওদের কথা কারমাইকেলের ছোট্ট কুঠুরিতে বসে রিজুর খুব মনে পড়তো। ভাবতে ভাবতে কখনো চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে আসতো। মনে হতো এখন যদি ওদের কাছে পেতো তাহলে জড়িয়ে ধরে খুব করে আদর করতো। কপালে চুমু দিয়ে প্রানটা জুড়াতো। কিন্তু না।সে যে অনেক দূরে!

খুব করে মনে পড়ে সিফা আর মলিনার কথা। বাড়ির কাছেই জমিতে কিছু আবাদ করলে ওরা বেশির ভাগ সময় রিজুর সঙ্গেই থাকতো। ওদের কচি হাতের নরম ছোঁয়ায় ফসল গুলো যেন প্রাণ ফিরে পেতো। কচি ধানের নরম শীষ গুলো মাথা তুলে দাঁড়াতো। সারাক্ষণ রিজুকে দুই বোন সাধ্যমতো সহযোগিতা করতো। রিজু একবার তরমুজের আবাদ করেছিলো। ওদের কী আনন্দ! একটা পাকা তরমুজ তুলে দিলে নিমেষেই ওরা শেষ করে ফেলতো। ভালো ফলমূল খাওয়ার সুযোগ সেভাবে ওরা কোনদিনও পায়নি। কোনদিন ভালো মানের পোষাকও পায়নি। ছেঁড়া পুরাতন ময়লা পোষাক ছিল ওদের সম্বল। কষ্ট হতো , কিন্তু রিজুর কিছু করার ছিল না। রিজুও তো একই গোয়ালের গরু। মনে মনে রিজু বলতো, “আমি বড়ো হলে তোদের সব চাহিদা পূরণ করে দেবো।”

রিজু এখন বড়ো হয়েছে। চাকরি পেয়েছে কিন্তু ওদের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। রিজু স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে। খুব স্বার্থপর!

অবসর সময়ে মাঝে মধ্যে সংসারের জন্য হালকা চাষাবাদে রিজু মন দিতো। বাড়ির পাশের জমিতে বেগুন লঙ্কা আবাদ করতো। খুব সকালে বেগুন ও লঙ্কা নিয়ে ডোমকল বাজারে বিক্রি করতে যেতো। যা পয়সা পেতো বাবার হাতে দিয়ে রিজু খুশি হতো। আবার কাক ভোরে মায়ের হাতে বোনা গামছা ডোমকল বাজারে পাইকারি দরে বিক্রি করে আসতো।

প্রতিবেশীরা রিজুদের খুব হিংসা করতো। এক প্রতিবেশী মাঝে মধ্যে তাদের দুটো মোষ গভীর রাতে তরমুজের জমিতে ছেড়ে দিত। নষ্ট করে ফেলতো ফসল। বাড়ির পূর্ব দিকে বড়ো রিজুর বড়ো মামার জমিতে এনার সাথে ভাগে তরমুজ লাগিয়েছিল। রাতের বেলায় মাঝে মধ্যে জমিতে থেকে পাহারা দিতো। একদিন কোনো কারণে জমিতে যাওয়া হয়নি। পরদিন সকালে গিয়ে দেখে একটা তরমুজ আস্ত নেই। তরবারি দিয়ে সবগুলো ফালা ফালা করে কাটা। রিজুকেই হয়তো কে বা কারা খুন করতে গিয়েছিল। না পেয়ে ফসলের উপর অত্যাচার করেছে। রিজু সাবধান হলো।

শিয়ালমারী নদীতে তখন অনেক জল। প্রতিবছর বন্যা হতো। দুই কুল ছাপিয়ে যেতো। রিজু নদীতে মাছ ধরতো। নদীই ছিল তার বন্ধু। নদীর মতোই ছিল তার মন। তাইতো নদীর বুকে খেলা করতে রিজুর খুব ভালো লাগতো। বড়শিতে কেঁচো ও ব্যাঙ গেঁথে মাছ ধরতো। আবার কখনো জাল ফেলে, নদী ঘিরে মাছ ধরে আনতো। পাট ছাড়াতে মুনিষ লাগলে বাবার সাথে নদী থেকে পাটকাঠি তুলে রোদে শুকিয়ে বোঝা বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসতো। ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। কালশিটে দাগ পড়ে যেতো।

একটু মোটা বুদ্ধির সাথে দুষ্টুমিতে রিজু ছিলো সবার সেরা। বন্যার সময় নদীতে কলার গাছ কেটে ভেলা ভাসিয়ে খেলা করতো। ছোট্ট ভেলাতে মৌরিয়া,মলিনা ও মাসুমকে নিয়ে প্রবল শ্রোতে বয়ে চলা নদীর মধ্যখানে গিয়ে দোলা দিতো। খুব আনন্দ হতো। ছোট্ট শিশুমনে কোনো ভীতি ছিল না ওদের। একদিন দোলা দিতে গিয়ে হঠাৎই ভেলা উল্টে যায়। ওরা তিনজন খুব ছোট। কেউ সাঁতার জানতো না। ভেলা থেকে ছিটকে জলে ডুবে হাবুডুবু খেতে শুরু করে। ওদের বাঁচার কথা ছিল না। অকাল মৃত্যুর মুখ থেকে ওরা সেদিন কীভাবে যে বেঁচে ফিরেছিল আল্লাহ-ই জানেন। মনে হলে এখনো রিজুর শরীর কেঁপে উঠে। ক্ষমা করতে পারেনা নিজেকে।

ঘোড়ার গাড়িতে করে ভগীরথপুর থেকে রিজু ও তার বাবা অনেক আমের চারা ডোমকল পর্যন্ত এনেছিল। গ্রামের কাঁচা রাস্তাঘাটে এক হাটু কাদা। হেটে যাওয়া যেতো না। মাইনুদ্দিন মামার একটা নৌকা ছিল। ওটা নিয়ে রিজু আর সফিকুল ডোমকল ব্রিজের নিচে থেকে রাতের অন্ধকারে নৌকা করে বাড়ি এনেছিল। মেহেরের জমিতে সেই আমের গাছগুলো লাগানো আছে। পরে জলঙ্গী থেকে সাইকেল করে আরও একটা আমের চারা এনে রাস্তার ধারে লিচু গাছের পাশে গাছটি লাগিয়েছিল। এখন গাছগুলো বড়ো হয়েছে কিন্তু রিজু তাদের থেকে অনেক দূরে। বাবা চেয়েছিলেন আম কাঁঠালের জন্য তার সন্তানদের যেন অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে না হয়। তার সে আশা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। কিন্তু যে আশা নিয়ে বাড়ির বড়ো ছেলেকে পড়িয়েছেন সেটি পূরণ হয়নি। আলাদা সংসার হাওয়ায় রিজুও তার পিতার পাশে পরিপূর্ণ ভাবে দাঁড়াতে পারেনি। এটা রিজুর বড়ো ব্যর্থতা।

কচি কচি সন্তানেরা তাদের সমস্যা জানিয়ে কিছু চাইলে বাবা বলতেন,
“তোমরা দেখতে পাচ্ছো না তোমাদের বড়ো ভাইকে পড়াচ্ছি। অনেক খরচ। তোমরা একটু ধৈর্য ধরো। ও মানুষ হয়ে এলে তোমরা সব পাবে। তোমাদের সব আশা পূরণ হবে!”

বাবার মুখে আশার কথা শুনে ওরা চুপ করে যায়।আশায় বুক বাঁধে।বুকে প্রত্যাশার পাহাড় জমে।দিন গুনে, কবে ওদের বড়ো ভাইয়া লেখা পড়া শেষ করে চাকরি করবেন!ওদের আশা পূরণ করবেন!

লুকা অর্থাৎ লোকমান ভাই। রিজুর মামাতো ভাই। সে এখন না ফেরার দেশে। তার সঙ্গে রিজু সরকারি বনভূমিতে অর্থাৎ শালবনে গরু ছাগল চরাতে যেতো। গাছের ডালে ডালে বেড়ানো রিজুর স্বভাব। শালবাগানের সব চেয়ে বড়ো গাছটাতে উঠলে আশে পাশের অনেক গ্রাম দেখা যায়। দেখতে দারুণ লাগে। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য দেখে রিজুর শরীরে শিহরন বয়ে যায়।মুক্ত আকাশ তাকে খুব করে টানে। মনে হয় নীল আকাশটা নিচে নেমে এসে রিজুকে ইশারা দেয়। সে কল্পনার জগতে প্রবেশ করে। তাই বারবার স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে উঁচু গাছ দেখলেই নিজেকে সামলাতে পারতো না।

বাড়ির সামনে একটা কদম গাছ ছিল। গাছের ডালে মাচা করে সেখানে শুয়ে বসে দুরের গ্রামগুলো দেখতো। এই সব কীর্তি কলাপ দেখে লোকে হাসাহাসি করে । এভাবেই এক নেশার টানে শালবাগানে গরু ছেড়ে দিয়ে উঁচু গাছ দেখলেই শূন্য আকাশ দেখার লোভ সামলাতে পারে না। বনের সব থেকে উঁচু অর্জুন গাছের মাথায় উঠে অনেক দূরের গ্রাম গুলো দেখে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করে। একদিন মনের আনন্দে গান করতে করতে এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফালাফি করতেই ডাল ভেঙে পড়ে যায় সে। ডালে ডালে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে একটা ডালে আটকিয়ে যায়। লুকা ভাই ছুটে আসে। গাছ থেকে নামিয়ে আনে। এতো উঁচু থেকে পড়েছিল যে বাঁচার কথা ছিল না তার। বাম পায়ের উপরের অংশে ডাল ঢুকে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। রিজু খুব কেঁদেছিল। তার কান্না দেখে বাবার কষ্ট পাওয়ার পরিবর্তে খুব রাগ হয়েছিল। তিনি কান্না থামানোর জন্য রিজুর মুখে কান্ধালের (বাঁশের অগ্রভাগ সহ কঞ্চির অংশবিশেষ) অগ্রভাগ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ জখম জায়গায় নির্মম ভাবে বিষহরি তেল ঢেলে রাগ মিটিয়ে ছেলেকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনটি সেলাই করতে হয়েছিলো। ঐ ব্যথা রিজুর নেই কিন্তু তার বাবার সেদিনের ব্যবহার রিজুকে আজও ব্যথিত করে। তার কষ্ট কেন বোঝেনা তার বাবা এই ভেবে রিজু কষ্ট পায়!

সংসারের জন্য রিজু পরিশ্রম যে করেনি এমনটি নয়। খুব সকালে উঠে গরুর জন্য মাঠ থেকে ঘাস কেটে এনে চারা করে গরুকে খেতে দিতো। উপর দিয়াড়ের জমি থেকে পাট কাটা, মসুরি তোলা,গম কাটা, মাথায় করে বাড়িতে বহন করে আনা সবটাই করতো।রোদে গমের গাছ শুকিয়ে,গম ঝেড়ে ঘরে তোলা থেকে সব। একদিন রিজু আর এনা মসুরি তুলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বহন করে নিয়ে আসার ক্ষমতা ছিল না। লুকা ভাই লাঙ্গল চষে ফিরছিল। রিজুদের ঐ অবস্থা দেখে সে এগিয়ে এলো।বড়ো বড়ো বোঝা বেঁধে ওর মাথায় তুলে দিলে পনেরো কাঠা জমির সব মসুরি বয়ে দিয়েছিল। সেই ভাইটি অকালে ঝরে গেল। সব মনে পড়ে। কিন্তু বাবা এসব কষ্টের কতটুকু মূল্য দিয়েছে রিজুর মনে নেই। রিজু ভাবে , “ছোটবেলায় আব্বাও খুব কষ্ট করেছেন তাই হয়তো তার কষ্টটা আব্বার মনকে বিচলিত করেনা।”

ভুল করলে বাবা-মায়ের মারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রিজু খুব মিথ্যা বলতো। কিন্তু কথা সাজানোর অদক্ষতার কারণে ধরা পড়ে যেতো। ধরা পড়লে বাবা ও মা তাদের হাতের সুড়সুড়ি মিটিয়ে নিতেন। মিথ্যা বলার জন্য এভাবেই বারবার রিজুকে মূল্য চুকাতে হয়েছে ।

ওদের একটা সাদা রঙের গাই গরু ছিল। খুব দুষ্টু। একটু ছাড়া পেলে ধরা মুশকিল ছিল। বাড়ির পশ্চিম দিকে নদীর ধারে ছেড়ে দিয়েছিল রিজু। বারবার দুষ্টুমি করাতে রেগে গিয়ে হাতের হেসোটা ছুড়ে দিয়েছিলো গরুর দিকে। দুর্ভাগ্যবশত গায়ে লেগে কেটে গিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। রিজু ভয় পেলো। এমনিতেই খুব মারে বাবা মা। এবার শেষ করে ফেলবে। বাঁচার জন্য রিজু ফন্দি আটলো। মিছা মিছি অজ্ঞান হয়ে পাশেই আমগাছের তলায় শুয়ে পড়লো। রিজু কান খাঁড়া করে আছে। কিছুক্ষণ পর যমদূতের চিৎকার শুনতে পেলো। নিজেকে শক্ত করলো ও। এটাই বাঁচার একমাত্র পথ। পাড়ার লোক জুটে গেছে ততক্ষনে। রিজুর খোঁজ শুরু হলো। কেউ একজন দেখে ফেলে চিৎকার করে উঠল, “ওই তো রিজু গাছের তলায় শুয়ে।”

চিৎকার ক্রমশঃ রিজুর কাছে চলে এলো। আরও শক্ত পোক্ত করে নিল নিজেকে। যদি বাঁচতে চাস তাহলে অভিনয়ের যেন কোনো ফাঁক না থাকে। সবাই এসে একসাথে ডাকাডাকি করতে লাগলো। সাড়া না দেওয়ায় কে যেন ধাক্কা ধাক্কি শুরু করলো। ওরা দেখে রিজুর সমস্ত শরীর শক্ত। নিঃশ্বাস বন্ধ। নাক চেপে ধরে, দাঁতের ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকানোর অনেকের অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হলো।।কে যেন বললো, ”রিজু মোইরি গ্যেলছে নাকি।হাত পা গুলা যে খুব শক্ত। নিঃশ্বাস পইড়ছেনা।”

মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

…………”ওগো তোমরা দেখো গো আমার রিজুর কী হলো! ও রিজু, রিজু!কী হয়েছে তোর? চোখ খোল রিজু!”

কাজ হয়েছে। তবুও সাড়া দিলে চলবে না। ওদিকে গরুর ব্যাপারটা গৌণ হয়ে গেছে। রিজুকে বাঁচাতে সবাই ব্যস্ত। নানান জনের নানান কথা শুনতে পাচ্ছে সে। কেউ বলছে “রিজু অজ্ঞান হো-ঈ গেইলছে”, কেউ বা বলছে “রিজুকে বুঝিন জ্বিনে ধ্যইরিছে।” কয়েকজন মিলে তাকে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে এলো। পাড়ার সব লোক ততক্ষণে বাড়ির উঠোনে।কেউ হাতের তালু গরম করছে কেউ বা পায়ের। কেউ মাথায় জল ঢালছে। একেক জন একেক রকম মন্তব্য করে। মা অঝোরে কেঁদে চলেছেন। সেদিনই রিজু বুঝেছিল মা তাকে কতটা ভালোবাসেন। কিন্তু ভালবাসার এই রূপ কোনদিন দেখেনি সে। এটা তার বড়ো প্রাপ্তি হলো।

ছোট দাদু মোতাহার মণ্ডল জ্বিনে ধরা রুগি ভালো করেন বলে গ্রামের লোকজনের বিশ্বাস। তিনি নাকি জ্বিন দেখতে পান। জ্বিনের সঙ্গে দাদুর খুব ভাব। কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি হাজির।দাদু সব শুনে চারদিকে চোখ বুলিয়ে বিজ্ঞের মতো মন্তব্য করলেন,——-“রিজুকে মেঈ জ্বিনে ধ্যইরছে। এইডা খুব খারাপ জ্বিন। এইখিনে ম্যেলা জ্বিন আমি দেখতে পাছি। তুমরা সবাই সাবধানে থাইকো।একপুয়া স্যরষার ত্যাল গরম কইরি তাড়াতাড়ি লিয়্যা আসো তো।”

নিমের পাতা সহ ডাল এনে দিল কেউ। দাদু রিজুকে নিমের ডাল দিয়ে ঝাড়তে লাগলেন। একটু পরেই নাকে মুখে গরম সর্ষের তেল ঢালবে। ওরে বাবারে খুব কষ্ট হবে!! কী করা যায়!কী করা যায়! এবার যে ধরা পড়ে যেতে হবে! নাহ্! বিষয়টি আর দীর্ঘায়িত করা যাবে না। দাদু সমস্ত শরীরে দুবার নিম ডালের বাড়ি দিয়ে বললেন, “তুমি কোথা থেকে এসেছ এখানে? চোখ খোলো।”

দ্বিতীয় বার ধমকের সুরে বলতেই রিজু একটু একটু করে চোখ খুলে দিলো।
——— বললো “আমি কোথায়?”

রিজুকে দেখার জন্য বাড়ির উঠোনে লোক গিজগিজ করছে। রিজু মনে মনে ভাবলো, অভিনয়টা ভালোই করেছে সে। কোনো ত্রুটি নেই। ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়ার ভান করলো। না হলে যে সর্ষের তেল ঢালবে। একটু একটু করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো।

দাদু বললেন, ”ত্যাল ঢালার আর কুনু দরকার নাই। আমি আসাতে জ্বিন পালি গেলছে।”

রিজু মনে মনে হাসলো। দাদুর সবটাই বুজরুকি। মানুষ ঠকানো। কিন্তু সে তো এ যাত্রায় বাঁচলো। এই রহস্যের কিনারা আজও অনেকেই করতে পারেনি। মা যখন পেরেছিলেন তখন মায়ের রাগ আর ছিল না।